১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সুইস ব্যাংকে পাচার করা অর্থের তথ্য চাইবে বাংলাদেশ


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশী অর্থপাচারকারীদের বিষয়ে যাবতীয় তথ্য চাওয়া হবে। বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যতে যাতে আর এক টাকাও সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে পাচার হতে না পারে সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী অর্থপাচারকারী বাংলাদেশীদের নাম, দেশে-বিদেশে ঠিকানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম, গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ এবং ওই অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে। অর্থপাচার প্রতিরোধ সম্পর্কিত সব কার্যক্রম পরিচালনায় সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সুইজারল্যান্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যমান ‘এগ্রিমেন্ট অন ডাবল ট্যাক্সেশন এ্যাভোয়ডেন্স (ডিটিএ)’ চুক্তিতে সংশোধনী আনা হচ্ছে। আবার তথ্য জানতে শীঘ্রই এ দুই কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ্যাগ্রিমেন্ট অন এক্সচেঞ্জ অব ইনফর্মেশন (ইওআই) সংক্রান্ত চুক্তি করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, গত বছরের তুলনায় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৫ সাল শেষে বাংলাদেশের নামে রয়েছে ৫৫ কোটি ৮ লাখ ফ্রাঁ, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) বৃহস্পতিবার ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে এসব ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন দেশভিত্তিক অর্থ জমার তথ্য রয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০১৫ সাল শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা অর্থের পরিমাণ চার হাজার ৪০৬ কোটি (৮০ টাকায় এক ফ্রঁঁ) টাকা। গত ১০ বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের নামে ছিল ৫০ কোটি ৬০ লাখ সুইস ফ্রাঁ (চার হাজার ৪৮ কোটি টাকা), যা তার আগের বছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশীদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফাঁ, যা এখনকার বিনিময়হার অনুযায়ী প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ।

এ হিসাবে এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান এবং ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। তবে কোন বাংলাদেশী তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে টাকা জমা করে থাকলে তার হিসাব বা তথ্য এ প্রতিবেদনে নেই। এছাড়া স্বর্ণালঙ্কার, শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র জমা রাখলে তার আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে আমানতে যোগ হয় না।

জানা গেছে, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশীদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ভবিষ্যতে যাতে আর না বাড়ে সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থপাচারকারীদের শনাক্তকরণ ও শাস্তি প্রদানে কঠিন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, অর্থপাচার রোধে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। মানি লন্ডারিং আইন অনুযায়ী এদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এনবিআর, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সক্রিয় রয়েছে। আশা করছি সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে অর্থপাচারকারীদের নাম-ঠিকানা, অর্থের পরিমাণ শীঘ্রই জানা যাবে। এসব ব্যক্তি জাতীয় শত্রু। এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শুধু তাই নয়, অর্থপাচার রোধে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে।

এদিকে, অর্থপাচার রোধে উচ্চপর্যায়ে গঠিত কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এনবিআর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর, বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স (সিআইডি), লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধিরা আছেন। ইতোমধ্যে সুইস ব্যাংকে ভারতীয় হিসাবধারীদের তথ্য সরবরাহে সম্মত হয়েছে সুইজারল্যান্ড। ২০১৮ সাল নাগাদ দু’দেশের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কালো টাকার তথ্যবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। একই ভাবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশী হিসাবধারীদের তালিকা পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের আদলে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে একটি চুক্তি করার প্রক্রিয়া চলছে।

পাচারকারীদের নিরাপদ ভূমি সুইজারল্যান্ড ॥ সারাবিশ্ব থেকে যারা অর্থপাচার করেন তাদের জন্য নিরাপদ ভূমি সুইজারল্যান্ড। সুইস ব্যাংকগুলো গ্রাহকের তথ্যের বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ অর্থের বড় অংশই রাখা হয় সুইস ব্যাংকগুলোতে। তবে গত কয়েক বছর ধরে নানা ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোও এখন আগের মতো কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করছে না। বরং গচ্ছিত অর্থের তথ্যাদির বিষয় কিছুটা শিথিল করেছে। ফলে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ কমেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০১৫ সালে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ১ শতাংশ কমেছে বলে জানানো হয়। অথচ বেড়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের।

যদিও সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত সব টাকাই পাচার হওয়া অর্থ নয়। বিদেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশীর বৈধ অর্থ সুইজারল্যান্ডে তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা থাকে। তবে এর পরিমাণ কত তার কোন তথ্য প্রকাশ করা হয় না।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা আছে যুক্তরাজ্যের। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ৬৬তম, ভারত ৭০তম ও বাংলাদেশ ৮৮তম স্থানে। এশিয়ার বড় দুই অর্থনীতির দেশ চীন ও ভারত থেকেও ২০১৪ সালের তুলনায় গত বছর সুইস ব্যাংকে পাচার কমেছে। চীন থেকে ২০১৪ সালে পাচার হয়েছে ৮১০ কোটি ৮০ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক। গত বছর এর পরিমাণ নেমেছে ৭৩৫ কোটি ৭০ লাখে। ভারত থেকে গত বছর পাচার হয়েছে ১২০ কোটি ৬৭ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক। ২০১৪ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৭৭ কোটি ৬১ লাখ।

২১১টি দেশ ও ভূখ- নিয়ে এ তালিকা করা হয়েছে। যদিও সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকের মধ্যে মূলত ২০১২ সাল থেকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের অর্থ রাখার পরিমাণ বেড়ে চলেছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ড. মামুন রশীদ বলেন, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো তাদের আইনকানুন কঠোর করছে। আবার অনেক দেশ সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে অর্থপাচারকারীদের তথ্য আদান-প্রদানের চুক্তি করছে। এসব কারণে নিবাসী ও অনিবাসী বাংলাদেশীরা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে অর্থ রাখা কমিয়ে দিতে পারে। তারা নিরাপদে অর্থ রাখার জন্য অন্য কোন দেশ বেছে নিতে পারে। অর্থপাচার রোধে মান্ডি লন্ডারিং আইনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: