২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সীসার বিষে ধুঁকছে


সংবাদদাতা, বেড়া, পাবনা, ১ জুলাই ॥ পাবনার বেড়ায় অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরি করা বিষে ধুঁকছে এলাকার ২০ হাজার মানুষ। সীসা তৈরির অর্ধ শতাধিক চুল্লি থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে ১০ গ্রামের মানুষের জীবন। দেখা দিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। গত ৬ মাসে অর্ধশতাধিক গবাদিপশু মারা গেছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন রোগে। সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার নতুনভারেঙ্গা ইউনিয়নের মরিচাপাড়া, চরবক্তারপুর ও আগবাগশোয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ সীসা তৈরির কারখানা। এসব কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় বৃক্ষ যেমন ফলশূন্য হয়ে পড়েছে, তেমনি ফসল চাষেও দেখা দিয়েছে মারাত্মক বিপর্যয়।

এলাকাবাসী জানান, বছরপাঁচেক আগে উপজেলার বাগশোয়াপাড়া গ্রামের উত্তরপাশে যমুনাপাড়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে ব্যাটারি (যানবাহন ও ভারি কাজে ব্যবহৃত) পুড়িয়ে সীসা তৈরির কারখানা। লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে এ কারখানা ছড়িয়ে পড়েছে ৩টি গ্রামে। সীসা তৈরির জন্য এসব কারখানায় পুরনো ব্যাটারি ভেঙে এর ভেতরের এ্যাসিড মিশ্রিত ছাই ও গাদ তীব্র তাপ সৃষ্টিকারী চুল্লিতে পোড়ানো হয়। আর এই পোড়ানোর কাজটি সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে সারারাত ধরে চলে। এ সময় আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে ঝাঁজালো দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া। এতে দুর্বিষহ অবস্থায় রাত পার করতে হয় মরিচাপাড়া, চরবক্তারপুর ও আগবাগশোয়াসহ এর পার্শ্ববর্তী রাকশা, নেওলাইপাড়া, বাগশোয়াপাড়া, নতুনভারেঙ্গা, সোনাপদ্মা প্রভৃতি গ্রামের মানুষদের। এলাকাবাসী জানান, কারখানার চুল্লিগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণে আশপাশের জমির ফসল ও ঘাসের ওপর এক ধরনের সাদা আবরণ পড়ে যায়। কোন গরু এসব জমির ঘাস খেলে কিছুক্ষণের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারখানাসংলগ্ন জমির ঘাস খেয়ে গত ৬ মাসে অর্ধশতাধিক গরু মারা গেছে বলে এলাকাবাসী জানান। এলাকাবাসী আরও জানান, আগবাগশোয়া গ্রামে সীসা পোড়ানোর চুল্লি বেশি বলে ওই গ্রামে গত ৩ মাসে ৩০টি গরু মারা গেছে। সীসা তৈরির সঙ্গে জড়িতরা বেছে বেছে কিছু গরুর মালিককে ক্ষতিপূরণ দিলেও নিরীহদের কোন ক্ষতিপূরণ দেননি।

চরবক্তারপুর গ্রামের হোসেন আলী ও আব্দুল আওয়ালসহ অনেকে জানান, সীসা তৈরির কারখানার পার্শ্ববর্তী ধান ও গমের খেতে চারা গজালেও ধোঁয়ার কারণে কিছুদিনের মধ্যে সেগুলোর পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার রায় জানান, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের পুষ্টির জন্য সীসার কোন ভূমিকা তো নেই-ই বরং একে গণ্য করা হয় ‘প্রোপোপাজমিক বিষ’ হিসেবে। সীসাযুক্ত পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের দহনে নির্গত সীসার কারণে দূষিত হয় পরিবেশ। সীসার দূষণ ঘটতে পারে ধাতু নিষ্কাশন, সঞ্চয় ব্যাটারি, সীসার রঞ্জক এবং শিল্পবর্জ্য থেকেও। গাড়ির ইঞ্জিনে লেডযুক্ত তেল পোড়ানো হলে তা থেকে উৎপন্ন হয় লেড হ্যালাইড। এর বিষ মানুষ, পশুপাখি ও গাছপালার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সীসা তৈরির কারখানার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও মালিক আলম খাঁ ও সাদেকুল ইসলাম জানান, ব্যাটারিগুলো লোকালয়ে ভাঙা হলেও সীসা পোড়ানোর কাজ করা হয় লোকালয় থেকে অনেক দূরে যমুনার চরে। ফলে সীসা পোড়ানোর চুল্লিগুলো মানুষের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। তারা দাবি করেন সীসা কারখানার জন্য কোন গরু মারা যায়নি। এ ব্যাপারে বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামসুন নাহার সুমী বলেন, আমি নতুন এসেছি, তাই এ সংক্রান্ত কোন অভিযোগ পাইনি। তবে শীঘ্রই আমি ওই এলাকা পরিদর্শনে যাব। সীসা কারখানা পরিবেশের ক্ষতি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।