২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নদী ও নারী


বলা হয়ে থাকে ‘বাংলার রূপ তার মাটিতে তার বৃক্ষরাজিতে সর্বোপরি তার নদ-নদীতে।’ নদীর সঙ্গে আমাদের প্রাণের যোগ, যা অগাধ ও সুগভীর। তাই মনের অজান্তে বেরিয়ে আসে একটি প্রশ্ন : নদী তুমি কোথায় থেকে এসেছ? অথবা জীবনানন্দের ভাষায়, ‘নদী তুমি কোন কথা কও?’ পৃথিবীতে এমন কিছু সম্পর্ক রয়েছে যা কখনও শেষ হয় না। অবিরাম স্রোতের মতোই ছন্দময় সে সম্পর্ক। সে সম্পর্ক নদী ও নারীর সম্পর্ক। দুটিই দন্ত্যন দিয়ে শুরু, দীর্ঘ ই-কার দিয়ে শেষ। শুধু মাত্র শব্দেই মিল তা কিন্তু নয়। আরও মিল আছে। নদী তার মায়া-মমতা দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে বাংলাদেশকে। নারী প্রেম দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে সম্পর্ককে। দুটিই গতিময়। নদী এবং নারী ছাড়া কবিরা অচল। কবিরা অচল মানে সাহিত্যে অন্ধকার। কবির বাম হাত নদী ডান হাত নারী। সাহিত্যিকের কাছে দুটিই প্রেরণার। কারণ কবির কাছে ‘নদীও নারীর মত কথা কয়’। কবি জসীমউদ্দদীন তাঁর ‘ভগ্ন প্রেম’ কবিতায় লিখেছেন ‘প্রেমের তটিনী বড় বাঁকা সখি, বাঁকা এর পথ-ঘাট/এ দেশেতে সখি, জলের ডিঙ্গা ফেরে ডাঙ্গার বাঁট।’

মৃদু মুখরিত বিকেলে পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মিলনস্থলে ঝিরঝির হাওয়া বইছে। লোকজন ঘুরে ফিরে উপভোগ করছে পড়ন্ত এই গোধূলি বেলাকে। তারা প্রিয়জনের সঙ্গে সানন্দে কাটাচ্ছে দিবসের শেষ প্রহরটি। সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত পাখিগুলোও যেন মানুষের মতো করে গাছপালার বিস্তৃত ডালপালায় বেশ আড্ডা জমিয়েছে। নদীর ফেনিল ঢেউগুলো কিনারায় এসে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলছে অবিরাম। আমি মায়াবী এই পরিবেশের মাঝে আমার কষ্টের স্মৃতিগুলোকে বিলিয়ে দিতে চাই। স্বস্তি দিতে চাই দুঃখের যাঁতাকলে পিষ্ট এই আমাকে। কথাগুলো আমারই একটি গল্পের বর্ণনা। এখানে উল্লেখ করেছি আমাদের দেশকে কেন নদীমাতৃক বলা হয়, সেটা বুঝানোর জন্যে।

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। কথাটি আক্ষরিক অর্থেই নয় বরং সামগ্রিক অর্থেই সত্য। নদী এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আদিকাল থেকেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ নদীকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে অনেক অনেক রূপকথা, গল্প-কাহিনী, পৌরাণিক উপাখ্যান, কিংবদন্তি, ছড়া-গান-কাব্য। আর এর শুরু সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। নদীকে বাদ দিয়ে কোনো শিল্প-সাহিত্য রচিত হতে পারেনি আজ অবধি। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রের ভূমিকাই বেশি। তবে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদীগুলোর ভূমিকাও কম নয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নদীগুলো হলো কর্ণফুলী, চিত্রা, গোয়ালন্দ, মহানন্দা, ভৈরব, মধুমতী, পশুর, কপোতাক্ষ, কাঠালিয়া, শীতলক্ষ্যা, গোমতী, সুরমা, কুশিয়ারা, ডাকাতিয়া, ফেনী, আড়িয়ালখাঁ, ধনু, ঘোড়াউত্রা, করতোয়া-আত্রাই, তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা, গড়াই, কুমার, শাহবাজপুর, তেঁতুলিয়া, বলেশ্বর, কুঙ্গ, মালঞ্চ, রায়মঙ্গল, তিতাস, ইছামতি, ধলেশ্বরী, কালনী, কপোতাক্ষ। এ নদীগুলোর নাম যেমন সুন্দর দেখতে তার চেয়েও সুন্দর। শাখা-প্রশাখা মিলিয়ে প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে সর্বমোট ২৪,১৪০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসধারার প্রথম সার্থক সৃষ্টি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি। এছাড়া আরো কয়েকটি রচনার দেখা মেলে; যেমন : তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালিন্দী, অমিয়ভূষণ মজুমদারের গড় শ্রীখ-, কমলকুমার মজুমদারের অন্তর্জলী যাত্রাসহ আমার জানা বইগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে নিব পর্যায়ক্রমে। পদ্মানদীর মাঝির কুবেরের চোখে কপিলা, রঙ্গময়ী ও পদ্মা-স্বভাবা। তবু জলের কুবের মাঝ দরিয়ায় হৃদয়ের শুশ্রƒষা পায়। হুমায়ূন কবীরের পদ্মা ‘কীর্তিনাশা’।‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু হুমায়ূন কবীরের ‘নদী ও নারী’ সম্পর্কে লিখেছিলেন এ উপন্যাসের পদ্মা বর্ষায় প্রখর, শরতে সুন্দর, কালবৈশাখীর ঝড়ের সন্ধ্যায় ভয়াল, অপমৃত্যুর আধার, প্রাণের পালয়িত্রী। আবার সুদীর্ঘ অনাবৃষ্টির পরে হঠাৎ বর্ষণে বন্যা সর্বগ্রাসিনী। নদী ও নারী উপন্যাসের নর-নারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়নি কখনোই। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস’র মতোও নয় এই পদ্মা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে অন্বিষ্ট হয়েছে নদীতীরবর্তী ধীবরপল্লীর সামগ্রিক জীবনবৈশিষ্ট্য এবং সেই কুবের চরিত্রের জীবনোদ্যমের উৎস ও পরিণতির নানাবিধ বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপ এবং স্বরূপ। তবে ব্যক্তি কিংবা সমাজজীবনে সর্বত্রই পদ্মার ভূমিকা মোটেই পরোক্ষ নয়। একটি স্বতন্ত্র ও প্রধান চরিত্র হিসেবে পদ্মা উপন্যাসে সক্রিয়। পদ্মা যেমন ওই জনগোষ্ঠীর জীবিকার সহায়, তেমনি প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও উৎস। সে কারণে পদ্মা যেমন জেলে মাঝির জীবনকে আনন্দে-স্বাচ্ছন্দ্যে পূর্ণ করে তোলে, তেমনি তাদের জন্যে হয়ে উঠে অপরিসীম দুঃখেরও কারণ। এ উপন্যাসটি শুরুই হয়েছে পদ্মার রূপ বর্ণনার মধ্য দিয়ে। বর্ষার মাঝামাঝি ইলিশ ধরার মৌসুমে রাত্রিকালীন পদ্মার রূপ চিত্রণে লেখক সংকেতময় উপমাম-িত ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন। লেখকের দৃষ্টিতে, ‘নদীর বুকে শত-শত জেলে-নৌকার আলো অনির্বাণ জোনাকির মতো ঘুরে বেড়ায়।’ কাজী আফসার উদ্দীন আহমেদের উপন্যাস চর-ভাঙা চর-এ ধলেশ্বরী নদীর চরাঞ্চলের জনজীবন সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের গহিন গাঙ ছোট মাপের একটি উপন্যাস। সুন্দরবন অঞ্চলের মালোদের জীবনকাহিনী এখানে সংহত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এটা বাংলা সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন। বাংলাদেশের উপন্যাসে আবু ইসহাক দায়বদ্ধ শিল্পী। সূর্য-দীঘল বাড়ি প্রণেতা আবু ইসহাকের অনেক সচেতন এবং পরিশীলিত প্রকরণ-পরিচর্যার অঙ্গীভূত রচনা পদ্মার পলিদ্বীপ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সাহিত্যশিল্পে নদী বা নদীকেন্দ্রিক জীবন অনেক ক্ষেত্রেই প্রধান বিবেচনা হয়ে এসেছে। বাংলা উপন্যাসেও নদী বা এর অনুষঙ্গী পরিবেশ কাহিনী লেখকের চিন্তনের কেন্দ্রে স্থাপিত হয়ে শিল্পকর্মটিকে অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ করেছে। এ সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি, সৈয়দ ওয়ালীউল্লার কাঁদো নদী কাঁদো, অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, হুমায়ুন কবিরের নদী ও নারী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইছামতি, সত্যেন সেনের একূল ভাঙে ওকূল গড়ে ইত্যাদি।

একই নদী বা নদীকেন্দ্রিক জীবন হলেও এ সব উপন্যাসের উপস্থাপনায় রয়েছে বৈচিত্র্য। সমরেশ বসুর গঙ্গা উপন্যাসের গঙ্গা আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লার কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসের বাকাল উপস্থাপনা এক নয়। গঙ্গা যেখানে মানুষের সুখ-দুঃখ-বিরহ-মিলনকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে, বাকাল সেখানে সভ্যতা রুদ্ধ বা ধ্বংসকরণের বিরুদ্ধে অগ্রবর্তী হবার প্রতিক্রিয়ার প্রতীকে পরিণত। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইছামতী ও তিতাস দুটোই শান্ত ও স্নিগ্ধ নদী। কিন্তু ইছামতীতে যেখানে নদীকে কেন্দ্র করে অত্যাচারী নীলবণিক ও তাদের সহযোগী এদেশীয় অত্যাচারী অনুচর, দালাল ব্যবসায়ী এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র সেই সাথে পারস্পরিক সংঘাত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ফেনী এবং চিত্রা নদী সম্পর্কে দেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর একটি রচনায় লিখেছেন, ‘যেখানে আমার জন্ম, সেখানে নদী ছিলো। কিন্তু ওই বয়সে আমার সেই নদী দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এটা হলো ফেনী নদী। ফেনীতে আমার জন্ম; কিন্তু নদী আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে নড়াইলে। চিত্রা নদীর পাড়ে আমাদের বাসা ছিল। তখন চিত্রা নদীতে বিভিন্ন জাহাজ চলতো। জাহাজগুলো খুলনা থেকে চিত্রা নদী হয়ে মাগুরায় যেতো। তখন এ দৃশ্যগুলো খুব উপভোগ করতাম। আমরা ওই জাহাজে করে ফেনী থেকে চাঁদপুর, তারপর চাঁদপুর থেকে নড়াইলে গিয়েছি।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মহানায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার সাথে চিত্রা নদীর সম্পর্ক নাড়ির সম্পর্ক। মাশরাফির শৈশবের বেশিরভাগ সময় চিত্রা নদীতেই কাটিয়েছেন। চিত্রা নদীর সাথে তার এমনই সম্পর্ক ছিলো যে, তার নাহিদ মামা ভেবেছিলো ছেলেটা তার বাবার মতো খেলোয়াড় হতে পারে। তবে ফুটবল-ক্রিকেট নয়, হবে হয়তো সাঁতারু। দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘মাশরাফি’ গ্রন্থের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি-কৌশিক নদী তোলপাড় করায় শুধু সর্দার নয়, সম্ভবত নড়াইলের কিশোরকূলের সর্বকালের সেরা ছিল এই কৌশিক। চিত্রা নদীই তার ঘর, চিত্রা নদীই তার বাড়ি। ছোটবেলার বন্ধু রাজু বলছিলেন, আমরা সবাই নদীতে গোসল করতাম। কিন্তু ও আমাদের এক ঘন্টা আগে নদীতে নামতো। আর এক ঘণ্টা পরে উঠতো। ওর জ্বালায় এলাকার লোকজন নদীতে গোসল করতে যেতে পারত না। কারণ, যখনই আপনি নদীর পাড়ে যাবেন, দেখবেন দিব্যি সাঁতার কাটছে কৌশিক। কৌশিকের সে সাঁতার কাটা নিয়ে অনেক মিথও চালু আছে চিত্রা নদীর পাড়ে। বলা হয়, স্রোতের বিপরীতে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার সাঁতার কাটত ছেলেটা। স্রোতের ব্যাপারে নিজে নিজেই চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল সে। যারা স্রোতস্বিনী নদীতে সাঁতার কেটেছে তারা জানেন এখানে সরল রেখার নদী পার হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। স্রোত আপনার সাঁতারের দিক বদলে দিবেই। কৌশিক একটা কাজ করতো, দুপাশ দুদল বন্ধুকে বসিয়ে দিত; একেবারে সরলরেখা বরাবর।

নদী এবং নারী দুটিই সৌন্দর্যের প্রতীক। এটা হলো নদী ও নারীর প্রধান বৈশিষ্ট্য। নদী তার প্রবহমানতার মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। নারী তার ভালোবাসার মাধ্যমে পুরুষের ভারসাম্যহীনতা দূর করছে। নারী তার সৌন্দর্য দিয়ে পৃথিবী জয় করেছে। এক সময় বলা হতো ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। যদিও বর্তমানে এ শ্লোকের পক্ষের লোক সংখ্যায় লঘুতে পরিণত হয়েছে; তারপরও আমি বলবো পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই সত্য এই যে, সংসার জগৎ সুখ-শান্তি-ভালোবাসাময় হিসেবে গড়ে তুলতে একজন মমতাময়ী এবং প্রেমময়ীর ভূমিকাই বেশি। কারণ সকল সুখ-শান্তির পিছনে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য। আর সেই শক্তি মানবকুলের মধ্যে একমাত্র নারীর মধ্যেই বিরাজ করে। এ দেশে এ রকম অসংখ্য নজির আছে পথভ্রষ্ট পুরুষকে আলোর পথ দেখিয়ে সুন্দর জীবন-যাপনের সুযোগ করে দিয়েছে নারী। আবার এর ব্যতিক্রমও আছে। তাই তো নজরুল ইসলাম বলেছেন, নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো/এরা দেবী, এরা লোভী/ যত পূজা পায় এরা, তত চায় আরো/ এদের অতি লোভী মন/একজনে তৃপ্ত নয়-একা পেয়ে সুখী নয়/ যাচে বহু জন।

নদী ও নারী কে বেশি রহস্যময়ী? রবীন্দ্রের কাছে নারী কখনোই রহস্যময়ী ছিলো না। তার কাছে তারা সব সময়ই প্রেমময়ী। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী/ তুমি থাকো সিন্ধু পাড়ে, ওগো বিদেশিনী।’ তিনি আকাশে কান পাতিয়া সিন্ধুপাড়ের ভিক্টোরিয়ার গান শুনেছেন। বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতি আর নারী এবং তার শরীর যতবার এসেছে অন্য কোনো কিছু এতবার আসেনি। যেমন, যখন দেখতে পাই গৃহস্থের মেয়েরা ভিজে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বর্ষার ঠা-া দক্ষিণা হাওয়ায় বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে এবং পানি ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। রবীন্দ্র উপন্যাসে শরীর বিশেষ করে নারীর শরীর ছিলো অন্তসৌন্দর্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভাস, নজরুলেরও একই অবস্থা। শরৎচন্দ্রের শরীর-ভাবনা দেহসংস্কারের অবগুণ্ঠনে ঢাকা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরীর সম্পর্কিত নিরীক্ষা ও অনুধ্যান ফ্রয়েডীয় লিবিডো ও মার্কসীয় শ্রেণীদ্বন্দ্বের জটিলতা প্রকাশ। শরীর মাত্র নর-নারীর যৌনসম্পর্ক-প্রণয়-আবেগ-সৌন্দর্যচেতনার আধার অথবা পবিত্রতার বিগ্রহ। আর মার্কসীয় তত্ত্বালোকে শরীর হচ্ছে শ্রমের হাতিয়ার।

কুমিল্লার দৌলতপুরে নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের প্রেম হয়। যদিও এর পরিণতি হয় বিচ্ছেদ। গত রাত্রে আপনি কি বাঁশি বাজিয়েছিলেন? আমি শুনেছি। এইভাবে হলো তাঁদের পরিচয়ের সূত্রপাত। সেই পরিচয় প্রেমে গড়ালো। সৈয়দা আসার খানমের ডাক নাম ছিলো দুবি বা দুবরাজ। নজরুল তাঁর নাম পাল্টে রাখলেন নার্গিস। একদিন নজরুল বলেছিলেন, এমন ফুলের মতো যার সৌন্দর্য তার এই নাম কে রেখেছে? আজ থেকে তোমার নাম নার্গিস। সেই থেকে নার্গিস নামটা স্থায়ী হয়ে গেল সৈয়দার জীবনে। আর প্রেম ও বিরহে এই নাম অমর হয়ে রইল নজরুলের গানে ও কবিতায়। মাত্র দুই মাসের প্রেম ও এক দিনের পরিণয়ের স্মৃতি নিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃসহ অপেক্ষার রাত কাটে নার্গিসের। ১৭ বছর পর ১৯৩৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিয়ে হয় তার। বিয়ের সংবাদ শুনে নজরুল ‘পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয় পরানপ্রিয়’ গানটি লিখে পাঠিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে এ রকম অনেক বিখ্যাত নারী চরিত্র রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাদম্বরী, হৈমন্তী ও কৃষ্ণকলি আর জীবনানন্দের বনলতা সেনের কথা আমরা সবাই জানি। এ ছাড়া পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের আসমানী, শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মী ও পার্বতী বিখ্যাত চরিত্র। নজরুলের নার্গিস ও শিউলি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর রহিমা ও জমিলা এবং হুমায়ূন আহমেদের রূপা ও মিতু উল্লেখযোগ্য। কম-বেশি প্রায় সব কবিই নদীর দ্বারস্থ হয়েছেন। নদী হয়ে উঠে তাদের ভাবনার বিষয়, প্রিয় বিষয়। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত লেখাটি, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে। কিংবা ‘গগনে গরজে মেঘ এলো বরষা/কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা।’ মহাদেব সাহা তাঁর ‘শুকনো পাতার স্বপ্ন গাঁথা’ কাব্য গ্রন্থের ‘মানুষের শুদ্ধতার জন্য’ কবিতায় লেখেছেন, ‘একদিন শুদ্ধ হয়ে আসবে মানুষ/তার জন্য অপেক্ষা করে আছে নদী, আকাশের তারা/ আজ মানুষের হাতে বড়ো বেশি ময়লা লেগে আছে/ তার হাতে কিছুই আর পরিচ্ছন্ন থাকে না/ নদী দূষিত হয়ে পড়ে, সবুজ প্রান্তর মলিন হয়ে যায়/ভালোবাসা দিয়ে একদিন মানুষ সুন্দর করেছিলো পৃথিবী/ আজ ঘৃণা দিয়ে নোংরা করেছে সমস্ত জলাশয়।’ সবকিছুর ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে আজ আমাদের সমাজ রক্তাক্ত। কর্ণফুলীকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘ওগো ও কর্ণফুলী!/তোমার সলিলে পড়েছিলো কবে কার কানফুল খুলি/তোমার ¯্রােতের উজান ঠেলিয়া কোন্ তরুণী কে জানে/ সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতের সন্ধানে/ আনমনা তার খুলে গেল খোঁপা, কানফুল গেল খুলি/ সে ফুল যতনে পড়িয়া কর্ণে হলে কি কর্ণফুলী? নজরুল আরেক জায়গায় লিখেছেন, হে সিন্ধু! হে বন্ধু মোর, হে চির-বিরহী/ হে অতৃপ্ত! রহি রহি/ কোন বেদনায়/উদ্বেলিয়া উঠ তুমি কানায় কানায়।’ রবীন্দ্রনাথেরও মৃত্যু চিন্তা ছিলো। তিনি যখন থাকবেন না তখনও যে জিনিসগুলো তাঁর স্মৃতিতে থাকবে তার একটি হলো নদী সংশ্লিষ্ট খেয়া তরী এবং ঘাট। তাই কবি গেয়েছেন, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাঁটে/আমি বাইবো না, আমি বাইবো না মোর খেয়া তরী এই ঘাটে গো...।’ বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘আমিও তোমার মতো নিঃসন্তান হয়েছি এখন /তীর নেই, শস্য নেই, পল্লী কুটির, কানন/ শুধু ঢেউ, চাঞ্চল্য, ফুলে ওঠা দীর্ঘশ্বাস, আর সকল দিগন্ত জুড়ে ক্ষমাহীন ক্ষুধার বিস্তার।’ কবির সুমনের দরাজ কণ্ঠে এ গানটি যে শুনবে অন্তরাত্মা শীতল হয়ে যাবে। এক ভালোলাগায় অবশ হয়ে যাবে যে কেউ। ‘জন্মেছি আমি আগেও অনেক, মরেছি তোমার কোলে/মুক্তি পাইনি শুধু তোমাকে আবার দেখবো বলে/বার বার ফিরে এসেছি আমরা, এই পৃথিবীর টানে/কখনো ডাঙ্গর কখনো কোপায়, কপোতাক্ষের গানে/ডাঙ্গর হয়েছে কখনো কাবেরী, কখনো বা মিসিসিপি/কখনো রাইনু কখনো কঙ্গো, নদীদের স্বরলিপি।’ নদীকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা/ এই হাজার নদীর অববাহিকায়..../এখানে রমণীগুলো নদীর মত/নদীও নারীর মত কথা কয়।’

জীবনটা নদীর মতো, কখনো শান্ত কখনো উত্তাল আবার কখনো স্থির কখনো ঝড়। জন লিডগেট বলেছেন, ‘যে নদী গভীর বেশি, তার বয়ে যাওয়ার শব্দ কম।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘সমুদ্রের বিশেষ মহিমা এই যে, মানুষের কাজ সে করিয়া দেয়, কিন্তু দাসত্বের চিহ্ন সে গলায় পরে না।’ নদীকে নিয়ে এ রকম অসংখ্য দার্শনিক উক্তি করে গেছেন মনীষীরা। কারণ নদী যে আমাদের জীবনেরই একটা অংশ। নদী আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। অর্থ-বিত্ত-চিত্ত। হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে এই নদীগুলো। অথচ আমরা নদীরগুলোর সাথে কী আচরণ করছি? নদীগুলোকে আমরা মেরে ফেলছি। ওরা বুঝে না এই নদী বাঁচলে আমরাও বাঁচবো। নদীর উৎস পর্বত আর তার পরিণতি সমুদ্র। উৎস থেকে পরিণতি পর্যন্ত তার এই নিরন্তর পথ চলার মধ্যে রয়েছে শতসহস্র বাধাবিঘœ। অন্তরায় অতিক্রমের মধ্য দিয়েই তার এই বিরামহীন গতি। আর আমরা মানুষ হয়ে নদীর সে স্বাভাবিক গতিপথকে রুদ্ধ করতে উঠে পড়ে লেগেছি। যেমনটি করছি নারীদের প্রতি। নদীর এই গতিকে রুদ্ধ করতে আমরা আয়োজন করে বাঁধ দিচ্ছি। আলোচিত এই বাঁধগুলো হলো, টিপাইমুখ বাঁধ ও তিস্তা বাঁধ। লন্ডনের জেড বুকস থেকে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত প্যাটট্রিক ম্যাককুলির ‘সাইলেন্স রিভার্স : দ্য ইকোলজি এ্যান্ড পলিটিক্স অব লার্জ ড্যামস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায় বাঁধ ভূমিকম্পকে উসকে দেয়। আমাদের দিদিদের দিদিগিরিতে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ। আর এসব হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্ত পরবর্তী প্রজন্মকে ফেলে দিবে ধ্বংসস্তূপে।

নদীমাতৃক এই দেশে এখন নদীরাই বিপদে আছে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত অন্যান্য পরিবেশ সমস্যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, নদী ভাঙনসহ আরও অনেক। পরিবেশ দূষণকে এখনই ঠেকানো না গেলে সামনের দিনগুলোয় ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে নদী রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা যদি প্রত্যয়ী হয় তাহলে দেশের নদীগুলো রক্ষা করা সম্ভব। আরেকটা বিষয়ে একটু কথা বলে নেই। একটি বিষয়ে আমাদের দেশ ভুল পথে এগুচ্ছে। আর তা হলো উপার্জনের কেন্দ্রবিন্দু করা হচ্ছে ঢাকা নগরীকে। এর ফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। জমির দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে, হাউজিং কোম্পানিগুলো জলাশয় ভরাট করে এ্যাপার্টমেন্ট বানাচ্ছে। পুরো দেশটাকেই যেন এরা ভরাট করে ফেলবে। মানুষ কি শুধু বিল্ডিংয়েই বসবাস করবে?

সবশেষে রবি ঠাকুরকে দিয়েই শেষ করবো। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে ভাব করার একটা মস্ত সুবিধা এই যে, সে আনন্দ দেয় কিন্তু কিছু দাবি করে না’।