মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

দীপ জ্বেলে রাখা দীপালিদি

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৬
  • প্রবীর বিকাশ সরকার

মানুষের এক জীবনে কত ঘটনাই তো ঘটে, সব ঘটনা মনে দাগ কাটে না। কিছু ঘটনা চিরঞ্জীব গল্প হয়ে থাকে। আমার জীবনে তেমনি একটি গল্প।

আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ১৯৮০ সালের কথা। একবার চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে ট্রেনে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে পরিচয় ঘটে আকস্মিকভাবে। তাঁর নাম দিপালি দত্ত। বয়স ৪৫ এর কম বা বেশি। আটপৌরে সুন্দরী কিন্তু খুব আকর্ষণীয়া। দীর্ঘাঙ্গী এবং সুতনুকা। আমার সামনের আসনে বসেছিলেন একা সারাটা পথ জানালায় উদাসী মুখ রেখে। তাঁর পাশে একজন ভদ্রলোক বসেছিলেন, তিনি সারাক্ষণ ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলেন। মাঝে মাঝে ভদ্রমহিলার ঘাড়ে মাথা হেলিয়ে দিয়েছেন আবার সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সরিয়ে নিয়েছেন ‘সরি’ বলে। ভদ্রমহিলা কিছুই বলেননি। বিরক্তও বোধ করেননি। এটাই স্বাভাবিক। একজন ক্লান্ত যাত্রীর ক্ষেত্রে বলে আমার মনে হয়েছে। আমি সদ্য কেনা কলকাতার সাপ্তাহিক ‘দেশ’ ম্যাগাজিনে মশগুল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাদের দ’জনকেই দেখছিলাম। ভাবছিলাম তারা স্বামী-স্ত্রী হবেন অথবা পরিচিত হতে পারেন পরস্পরের।

শেষ বিকেলের দিকে ট্রেন এসে কুমিল্লা স্টেশনে থামল বিরাট হুইসেল বাজিয়ে। মনে হয় রেললাইনে মানুষ বা গরু কিংবা ছাগল কিছু ছিল। যা সচরাচর দেখা যায় এই দেশে। আমি আগেই দরজার কাছে চলে এসেছিলাম। কারণ গলা বাড়িয়ে দেখলাম প্রচুর যাত্রী প্ল্যাটফর্মে ভীড় করে আছে। ট্রেনের অপরিসর দরজা দিয়ে উঠতে-নামতে গাদাগাদি, ধাক্কাধাক্কি হবে প্রচণ্ড। যেটা খুবই বিরক্তিকর আমার কাছে। একবার পেছনে ফিরে দেখলাম দরজার কাছে ঠাসাভীড় আর চাপা গুঞ্জন।

একটা ধাক্কা খেয়ে ট্রেনের চাকা থামল। আমি দ্রুত নেমে পড়লাম। সিঁড়ি থেকে বেশ নিচে প্ল্যাটফর্ম। অমনি ভীড়ের মধ্যে সেঁটে গেলাম। এগুতে পারছি না। হঠাৎ মনে হল একটা কিছু পড়ার শব্দ হল! পেছন ফিরে দেখি সেই ভদ্রমহিলা সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করছেন, পেছন থেকে ঠেলছে অসহিষ্ণু যাত্রীরা। তখনই টনক নড়ে গেল আমার! আরে! ভদ্রমহিলা তো দৃষ্টিহীন! সর্বনাশ! তার ছড়িটা মনে হয় খসে পড়েছে হাত থেকে, মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে। আমি এক ঝটকায় ভীড় ভেঙ্গে দৌড়ে গেলাম দরজার কাছে চিৎকার করে বললাম, ‘আরে ভাই দাঁড়ান! একজন অন্ধ মানুষ নামছে আগে তাকে নামতে দিন!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা!

আমি ভীড় ঠেলে ভদ্রমহিলার হাত ধরে তাকে নামালাম। তার বিব্রত মুখটি একেবারে লাল হয়ে গেছে! মিহি ঘাম ভেসে উঠেছে মুখে। চোখের মণি দুটো দ্রুত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাত দিয়ে মাটিতে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না। ছড়িটা তো? ওটা মনে হয় গাড়ির নিচে চলে গেছে। আগে আসুন আমার সঙ্গে পরে খুঁজে দেব।’ ভদ্রমহিলা আমার ডানহাত সজোরে চেপে ধরলেন যাতে ছিটকে না যান।

প্ল্যাটফর্মের ভীড় ঠেলে তাকে নিয়ে এলাম কমন রেস্টরুমে। বসিয়ে বললাম, ‘আপনি বসুন এই চেয়ারে আমি আসছি ছড়িটা নিয়ে।’ ভদ্রমহিলা চেয়ারে বসে তারপর আমার হাত ছাড়লেন, বললেন, ‘বড় উপকার করলেন ভাই। এমনটি হবে জানতাম না!’

আমি বললাম, ‘আচ্ছা আপনার পাশে যে ভদ্রলোক বসেছিলেন তাকে.......?’

: না। তিনি আমার কেউ নন। আমি চিনি না।

: ও আচ্ছা। ঠিক আছে আপনি নড়বেন না কিন্তু আমি না আসা পর্য। আবার কী হয়!

: না। নড়ব না। বসে থাকব।

দেখলাম রেস্টরুমে আরও দু-তিন জন আছেন পুরুষ। তারা ঘুমুচ্ছেন মনে হয়, সন্ধেবেলায় ট্রেনে চড়বেন। ভদ্রগোছের তারা। নিরাপদ বলেই মনে হল।

তাঁকে রেস্টরুমে রেখে বেরোতেই ট্রেনটা গা ঝাড়া দিয়ে চলতে শুরু করল যেন মেদবহুল বয়স্ক একটা অজগর। আমি দ্রুত হেঁটে গিয়ে রেললাইন থেকে সাদা রঙের ছড়িটা তুলে নিলাম। সেটা নিয়ে ফিরে এসে তাঁর হাতে দিলাম। এতক্ষণে যেন তিনি ধরে প্রাণ ফিরে পেলেন। যা একজন দৃষ্টিহীন মানুষের প্রকৃত ভরসা। দেখলাম তিনি হ্যান্ডব্যাগ থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন হালকা করে। বুঝতে পারলাম তিনি অভিজাত ঘরের মহিলা। বললেন, ‘আপনার নামটা কি ভাই?’ একটা রিকশা ঠিক করে দেবেন পুরাতন চৌধুরীপাড়া যাবো দত্তবাড়ির সামনে।’

: পুরাতন চৌধুরীপাড়ার ওই দত্তবাড়ি! আরে পুরনো রাজবাড়ির মতো দোতলা বাড়িটি আপনাদের!

শুনে ভদ্রমহিলা ঘাড় নাড়লেন। আমি বললাম, ‘আমি তো পুরাতন চৌধুরীপাড়া প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলাম। প্রতিদিন আপনাদের বাড়ির সামনে দিয়েই তো যেতাম কই কখনো আপনাকে দেখিনি তো?

: আমি তো কলকাতায় পিসির বাড়িতে থেকে পড়াশুনো করেছি। প্রাইমারি পাশ করার পর ওখানে চলে গিয়েছিলাম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারে গবেষক ছিলামÑসে অনেক কথা। আপনার পরিচয় জানলাম না। আমার নাম দীপালি দত্ত।

আমি বললাম, আমার নাম প্রবীর সরকার। থাকি ধর্মসাগর পশ্চিম পাড়ে। বাবা পুলিশ কোর্টের জিআরও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, ইতিহাস বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষ।

: ও-ও প্রবীর! ইতিহাসের ছাত্র! কী আশ্চর্য!

দীপালি দত্ত ভীষণ চমকে উঠলেন! চেয়ার থেকে উঠেই দাঁড়ালেন! আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম! কোনো অন্যায় করলাম নাতো! অবিশ্বাস্য ঘটনা। আমি বাকরহিত!

দীপালি দত্ত খানিকটা চুপ করে থেকে বসলেন। তারপর কেমন যেন ভাঙাভাঙা স্বরে আস্তে করে বললেন, ‘প্রবীর! প্রবীর ভারী মিষ্টি নাম। অনেক দিন পর নামটি শুনলাম। আর ইতিহাস আমার খুব প্রিয় বিষয়। শুনে খুব ভালো লাগল প্রবীর। আচ্ছা, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িওতো ওই পাড়াতেই তাই না?’

: হে। তাঁর নাতি রাহুল আমার বন্ধু। আচ্ছা, সন্ধে হয়ে পড়ছে। শীতকাল তো। আসুন আপনাকে একটা রিকশাতে তুলে দিয়ে আমি এক বন্ধুর বাসা বাগিচাগাঁও হয়ে তারপর বাসায় ফিরব। বন্ধুর একটি চিঠি আছে ওর বাসায় পৌঁছে দিতে হবে তো।

দীপালি দত্ত উঠে দাঁড়িয়ে আমার কাঁধ চেপে ধরলেন বাঁ হাত দিয়ে। বড় কোমল সেই হাতের স্পর্শ। আমি শিহরিত হলাম অথচ একটু আগে তিনি কোমল হাতে আমার হাত চেপে ধরেছিলেন তখন কিছুই অনুভব করিনি! এখন এমন বোধ হল কেন জানি না। শুধু মনে হল, সত্যিই পূর্বজনমে আমরা ভাইবোন ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই দীপালি দত্ত আমার দিদি হয়ে গেলেন। দীপালিদি।

রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। তিনি ছড়ি দিয়ে মাটিতে মৃদুমৃদু বাড়ি দিয়ে আমার পাশাপাশি হাঁটতে থাকতে থাকলেন। স্টেশনের বাইরে এসে তাকে একটি রিকশায় তুলে দিলাম। আমি কিছু বলার আগেই বলে উঠলেন, ‘প্রবীর কী বলে তোমাকে ধন্যবাদ দেব ভাই। আচ্ছা, একটা অনুরোধ করব?’

আমার দুচোখ ছলো ছলো করে উঠল তার মুখে অনুরোধ শব্দটি শুনে। বললাম, ‘নিশ্চয়ই।’

: তুমি তো আমাদের বাড়িটি চিনেছ তাই না? আমি কিন্তু প্রতীক্ষায় থাকব তুমি কাল সকালেই আমাদের বাড়িতে আসবে। বাবা-মাকে তোমার কথা বলব। আসবে তো?’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সামান্য একটু সাহায্য করেছি আপনাকে এর বেশি কিছু তো নয়! আচ্ছা, আপনি যখন বলছেন দিদি তাহলে যাবো।’

দীপালিদি খুব সুন্দর করে হাসলেন। বললেন, ‘আসবে কিন্তু আমরা গল্প করব। আমি একা থাকি তো।’

পরের দিন সকাল দশটার দিকে আমি ধর্মসাগর পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম পুরাতন চৌধুরীপাড়ায়। দত্তবাড়ির সামনে দাঁড়ালাম। খুব স্মৃতিবহুল এই পাড়াটি। মন খুব বিষণœ হয়ে পড়ে। পুরনো দিনের জমিদার বাড়ির মতো নির্জন বাড়িটির সামনে বাগান, নানা জাতের ফুলের গাছ, নিমগাছ, কাঠমালতীর গাছ। পাখিরা ডাকছে। প্রজাপতি, ফড়িং উড়ছে। খুব চমৎকার বাড়িটি। কোনোদিন এই বাড়িটির ভেতরে ঢুকতে পারবো ভাবতেই পারিনি! লোহার ফটক খোলাই ছিল। সোজা হেঁটে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়তে একজন ভদ্রলোক খুলে দিলেন। মধ্যবয়সী। নমস্কার জানিয়ে বললাম, ‘আমি প্রবীর। দীপালিদি আসতে বলেছিলেন।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘আরে তুমি প্রবীর! বড় উপকার করেছ ভাই গতকাল। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। আমরা তোমার কথাই বলছিলাম সকালেও। এসো এসো ভেতরে এসো। আমার নাম কৌশিক দত্ত। আমি দীপালির বড়দা। ঢাকায় হাইকোর্টে আছি। বিজয় দিবসের ছুটিতে এসেছি।’

আমাকে বসতে দিয়ে একনাগারে কথাগুলো বললেন কৌশিকবাবু। খুব অমায়িক হাসিখুশি মানুষ মনে হল। আমার একজন দাদাকেও পেয়ে গেলাম দীপালিদির সুবাদে। আমার খুব ভালো লেগে গেল তাঁকে।

অনেক বড় বৈঠকখানা। পুরনো দিনের মোটা ভারী সাদা ভেলভেটের সোফা, ডিভান। নকশাদার কাচের আলমারি, শোকেস। দেয়ালে অনেক ছবি বাঁধানো। বাঘের চামড়া ঝুলানো আছে একটি দেখতে পেলাম। ছাদ থেকে তিনটি দামী কাচের ঝাড়বাতি দুলছে। একটি বড় বইয়ের আলমারি। মোটামোটা পুরনো বইয়ে ঠাসা। কাচের দীর্ঘ একাধিক টেবিল। দত্তরা জমিদার ছিল নাকি মনে মনে বললাম! ঘুরে ঘুরে ছবিগুলো যখন দেখছিলাম পুজোর প্রসাদের ফলফসারীর একটা শীতল জলজ সুগন্ধ এসে নাকে লাগলো ভেতর ঘর থেকে। হঠাৎ ছড়ির ঠকাঠক শব্দ শুনতে পেলাম। ঘুরে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম! একি মানুষ নাকি দেবী! দীপালিদিকে চিনতেই পারছিলাম না! অজন্তা রঙের পাটভাঙা সুতির শাড়ি পরনে। একই রঙের ব্লাউজ। মাথার কালো দীর্ঘ কুঁকড়ানো চুল পিঠময় ছড়ানো। কপালে টকটকে লাল রঙের টিপ। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয় হেমন্তের আগুনরঙা আকাশে সূর্য হাসছে।

সুরেলা কণ্ঠে বললেন, ‘প্রবীর কোথায় তুমি?’

‘এই তো দিদি।’ বলে এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে একটি সোফায় তাকে বসিয়ে দিলাম। তিনি ছড়িটা তার কোলের ওপর রাখলেন।

: জানো প্রবীর গতকাল বাড়িতে ফিরে আমরা তোমার কথাই আলাপ করছিলাম। হঠাৎ সাক্ষাৎ হলেও বিষয়টা কাকতলীয় নয় বলে বড়দা বলল। আমিও তাই মনে করছি। নিশ্চয়ই কোনো সম্পর্ক আছে! এটা সামান্য ঘটনা নয় কিন্তু!

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না দীপালিদির এই কথায়। কী এমন কাজ করলাম আমি যা সামান্য নয় বলছেন তিনি! মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতেই পারলাম না। জটিল মনে হতে লাগল। ধনীলোকদের নানা ধরনের হেঁয়ালিপনা থাকে জানি। এও তেমন বলে মনে হল। যাকগে, আসতে বলেছিলেন তাই এলাম।

গল্প করবেন বলেছেন গতকাল কিন্তু অত সময় আমার কোথায়? ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাস ছড়া, কবিতা পাঠের আসর হবে। বন্ধুদের সঙ্গে লাগাতার আড্ডা চলবে। মৃতসঞ্জীবনী পান করতে হবে। ডোপিং করব। নানা ব্যস্ততা!

দীপালিদি বললেন, ‘জানো, গতরাতে আমার একদম ঘুম হয়নি। কত স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় দিবস, প্রিয়জনের হারিয়ে যাওয়া কিছুতেই মাথার ভেতর থেকে বের করা যাচ্ছে না। ভুলে যাবার বিষয় নয়, তাই হয়তোবা ভুলে যাওয়া হয় না। বারংবার কোনো না কোনো ঘটনার অজুহাতে ফিরে ফিরে আসে।’

আমি ধোঁয়াশা-দৃষ্টিতে দেখতে লাগলাম দীপালিদির মুখ। সরস্বতীদেবীর মতো এত সুন্দর যার রূপ—-জমকালো চোখ কিন্তু নেই দেখার দৃষ্টিশক্তি—-ভেবে মনটা দারুণ বিষণœ হয়ে উঠতে লাগল। আচ্ছা, দীপালিদি কী চোখে কাজলও দেন? চোখের নিচে কাজলের টান সুস্পষ্ট। কাজল দেবার সময় আয়নার সামনে বসেন? না। তাতো হওয়ার কথা নয়। দৃষ্টিহীনের চোখ তো দর্পণেও দৃষ্টিহীন। আমি নরম কণ্ঠে বললাম, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তো আপনি কলকাতায় ছিলেন দিদি। বাড়ির সবাই কি চলে গিয়েছিলেন?’

: হে। আমরা চার ভাইবোন। বড়দা, মেজদা তারপর আমি। সবার ছোট বোন শেফালি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার দু-সপ্তাহ আগেই সবাই কলকাতার নাগপুরে পিসির বাড়িতে চলে এসেছিল। বড়দা ও মেঝদা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। মেজদার পায়ে গুলি লেগেছিল। সেটা নিয়ে অনেকদিন ভুগেছে দাদা। শেফালির বর ডাক্তার। ওরা আমেরিকায় থাকে। বছর তিনেক আগে গুলিটা বের করা হয়েছে আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে। মেজদা আর ফিরে আসেনি। আর.....আর একজন তো নিখোঁজই হয়ে গেল!

দীপালিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, ‘কোথায় যে হারিয়ে গেল মানুষটা! কেউ আজ পর্যন্ত একটা খোঁজ দিতে পারল না। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ফিরে আসতেন। ফিরে আসতেন।’

আমি বুঝলাম যে, খুব প্রিয়জন—আত্মীয় কেউ হবেন যিনি নিখোঁজ রয়েছেন। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। দিপালিদির একেবারে ব্যক্তিগত ব্যাপার।

সেদিন পুজোর প্রসাদ, চা-মিষ্টি খেয়ে ফিরে এলাম। দীপালিদি আবার আমার কাঁধ ধরে ছড়ি দিয়ে মাটিতে বাড়ি দিয়ে দিয়ে বাগান হয়ে ফটক পর্যন্ত এসে বিদায় দিলেন। এবং প্রতীজ্ঞা আদায় করে নিলেন প্রতি সপ্তাহে একদিন যেন অবশ্যই তার কাছে যাই, যতই ব্যস্ততা থাকুক! কথা দিতে হল কারণ তিনি আমার পূর্বজনমের বড়দি যে!

কিন্তু কীসের টানে জানি না প্রতি সপ্তাহে একদিন শুধু নয়, সপ্তাহে দু-তিনবারও গিয়েছি। অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী কালীমোহন দত্ত তাঁর স্ত্রী মায়াদেবী তথা মেসো ও মাসি দারুণ আপন করে নিয়েছিলেন আমাকে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতাম। মাসিমা প্রায়শ বলতেন, ‘তোর মাকে নিয়ে আসবি প্রবীর। তোর মা ভারি পূণ্যির কাজ করেছে তোর মতো এমন চরিত্রবান ছেলের জন্ম দিয়ে। তোর মাকে একবার দেখার খুব ইচ্ছে আমার।’

বছর খানেক এভাবে দীপালিদির বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে গল্পসল্প করতাম। কী যে আদরযতœ করতেন তিনি আমায়! বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলে আর দেখা হতো না। কুমিল্লায় থাকলে যেতামই। একদিন ছাদে যাবেন দোতলার সিঁড়ি দিয়ে পা মচকে গিয়েছিল প্রায়। তিনি আমার কাঁধ ধরে ছাদে এলেন। নিরিবিলি পরিবেশ। উঁচু রেলিং দেয়া। আশেপাশের বাড়িঘর পুকুর দেখা যায়। ছাদে বাগান করেছেন মাসিমা। বর্ষাকালের বিকেল ছিল। কিন্তু সেদিন রোদ উঠেছিল। বিকেলের রোদে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল দীপালিদিকে! আমি বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকলাম তাঁর দিকে। কী অপূর্ব অপার সৌন্দর্যের সরোবর নিয়ে উদ্ভাসিত এক নারী আমার সামনে বসে আছে অথচ সেই অপার রূপ ছুঁয়ে দেখার একজন প্রিয় মানুষ তাঁর নেই! ঈশ্বর তাকে রূপ দিলেন, জ্ঞান দিলেন, হৃদয়-মন সবই দিলেন কিন্তু কোন্ শাস্তিবলে তার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিলেন কে জানে! ঈশ্বর শুধু সদয় নন, নির্দয়ও হন।

সেদিন গোধূলিলগ্নে দীপালিদি কী ভেবে বললেন, ‘বৃষ্টিস্নাত আকাশ আজকে খুব নীল না প্রবীর? জানিস, গতকাল গভীর রাতে স্বপ্ন দেখলাম। দুঃস্বপ্ন! হঠাৎ করে ঝড় উঠল। আমাদের বাড়িটার দরজা-জানালা খুলে খুলে উড়ে গেল বাতাসে। তারপর ঝড় থামলে পরে আকাশ স্বচ্ছ হল, চাঁদ উঠল। এত বড় চাঁদ! এত আলো! কেন যেন মনে হল আমি দেখতে পাচ্ছি। সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি ওই তো বড়—পরিপূর্ণ চাঁদটা! কিন্তু ঘুম ভেঙে উঠে বুঝতে পারলাম, না সব ভুল। সব মায়া। ভুল স্বপ্ন দেখেছি। যে বিবর সেই বিবরেই আছি। চারদিকে কেবল নিকষ কালো অন্ধকার। অন্ধকার আর অন্ধকার। গবেষণাগারে যদি দুর্ঘটনাটা না ঘটত—-বছর চারেক ধরে অন্ধকার বিবরে কাটছে দিন। আর মুক্তিযুদ্ধটা যদি না হত! তবুও প্রতীক্ষায় আছি। প্রতীক্ষায় আছি। প্রতীক্ষায় থাকব!’

আমি দেখলাম দীপালিদি খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম আমি। কথা বের হচ্ছিল না আমার মুখ থেকে। কার জন্য দিদির প্রতীক্ষা? তিনি দু’হাত বাড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে কী খুঁজতে লাগলেন তারপর জোরালো কণ্ঠেই ডেকে উঠলেন, ‘প্রবীর! প্রবীর! কোথায় তুমি?’

আমি দ্রুত তাঁর হাত ধরে বললাম, ‘এই তো। এই তো দিদি তোমার সামনেই বসে আছি।’

দীপালিদি আমার হাত দুটি নিয়ে তার বুকের ওপর চেপে ধরলেন। কী নরম, কী পেলব বুকের মাংশ তাঁর! আমি বিস্ময়ের ঘোরে বোবা হয়ে গেলাম! একি করছেন দীপালিদি! তিনি আশ্বস্ত হয়ে আবেগকম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি ভাবলাম তুই চলে গিয়েছিস বুঝি! তোর খারাপ লাগছে নাতো?’

আমি হাত দুটি ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, ‘না দিদি। যাইনি। এখনো আছি।’

‘আচ্ছা।’ বলে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

কেন কে জানে দিদি এমন আচরণ করলেন সেদিন জানা নেই। আমার দুচোখ ভরে জল নেমে এলো। আমি কোমল কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি খুব একা তাই না দীপালিদি? তোমার কষ্ট আমি বুঝতে পারি।’

দীপালিদি কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ নীরবে কেটে গেল। তারপর হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, তোর কোনো বান্ধবী নেইরে প্রবীর?’

আমি লজ্জা পেলাম। কী বলি! তবু বললাম, ‘অনেক বন্ধু-বান্ধবী আছে দিদি, পাড়াতেই আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আছেই।’

: আচ্ছা, তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে আলাদা করে তোর ভালো লাগে? যাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে এমন কেউ নেই? জানিস তো ভালোবাসা ঈশ্বরের দুর্লভ আশীর্বাদ। সবার জীবনে তা পাওয়া যায় না।’

আমি আমতা-আমতা করে বললাম, ‘একটি মেয়েকে আমার বেশ লাগে। কিন্তু বলা হয়নি তাকে ভালোলাগে।’

মিষ্টিকণ্ঠে হাসলেন দীপালিদি, ‘তাই-ই হয়রে। ছেলেরা ভালোলাগে এই কথাটি বলতে লজ্জার সাগরে হাবুডুবু খায়। আর মেয়েরা গুমরে মরে মুখ ফুটে বলতে পারে না।’

একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘সেও পারেনি সহজে।’

আমার খুব কৌতূহল হল। এবার জিজ্ঞেস করে ফেললাম, ‘সে কে দিদি?’

দীপালিদি চমকে উঠলেন, ‘ও। না না। না মানে জানিস তার নামও ছিল তোর নামে নাম——প্রবীর! ভারি মিষ্টি নাম! ভারি মিষ্টি নাম। মহাভারতে এই নামে একজন রাজা ছিলেন তাই নারে?’ আমি ছোটদের মহাভারত পড়েছি কিন্তু প্রবীর নামে কোনো রাজা ছিলেন কিনা মনে করতে পারছিলাম না। উত্তরে বললাম, ‘কি জানি দিদি। ছিলেন মনে হয়।’

এরপর আর দীপালিদির সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ হয়নি কোনোদিন। পরে জেনেছিলাম দীপালিদির বড়দার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন প্রবীর সেনগুপ্ত নামে এক ভদ্রলোক। তাঁরা কলেজজীবন থেকেই বন্ধু ছিলেন। ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন প্রবীরবাবু। মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। ১৬ই ডিসেম্বর সবাই ফিরলেও প্রবীরবাবু ফিরে আসেননি। তাঁর সঙ্গে দীপালিদির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। স্বাধীনতার পর কত খোঁজা করা হল কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি তার।

দীপালিদিও দীপ জ্বেলে রেখেছেন প্রবীরবাবুর ফিরে আসার পথে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০১৬ সাল। এই দীর্ঘ ৩৬ বছর পর জানি না প্রবীরবাবু ফিরে এসেছেন কিনা! দীপালিদিও কোথায় আছেন জানি না।

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৬

০১/০৭/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: