২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গোটা রাজধানী যেন ঈদ বাজার


রহিম শেখ ॥ ঈদ উৎসবকে বরণ করতে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় সরগরম গোটা দেশ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। ঈদকেন্দ্রিক পোশাক-আশাক ও বিভিন্ন ধরনের উপহার-সামগ্রীর বাজার জমে উঠেছে। প্রতিটি মার্কেট ও ফুটপাথে লোকের ভিড়ই বলে দেয় বেচাকেনা কী পরিমাণ বেড়েছে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই ধর্মীয় উৎসব ঘিরে খাদ্যপণ্য, পোশাক, বিনোদন ও পরিবহন খাতে বিপুল পরিমাণের অর্থ যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারী চাকরিজীবী, দোকান কর্মচারী, পোশাক ও বস্ত্র খাতের শ্রমিকসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমজীবীদের বোনাসও এই কর্মকা-ে যোগ হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। ঈদ উপলক্ষে রেকর্ড গতিতে দেশের অর্থনীতিতে জমা হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিটেন্স। চলতি মাসের ৩০ দিনে দেশে রেমিটেন্স এসেছে ১১২ কোটি ডলার। ঈদের কেনাকাটায় এটিএম বুথে প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করছেন গ্রাহকরা। মোবাইলে দৈনিক লেনদেন হচ্ছে ৬১৬ কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চিরায়ত এ উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘন ঘন হাতবদল হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যেমন বাড়বে, তেমনি চাঙ্গা হয়ে উঠবে গোটা অর্থনীতি। রোজা ও ঈদের মাসব্যাপী পহেলা রোজা থেকে শুরু হয়েছে এসব কর্মকা-। আর তা চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত।

আজ ২৫ রমজান। ক’দিন বাদেই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। আজ থেকে শুরু হয়েছে টানা ৯ দিনের সরকারী ছুটি। এর সঙ্গে শুরু হয়েছে ঈদ উৎসবও। শেষ সময়ে কেনাকাটার জন্য ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে রাজধানীর মার্কেটগুলোতে। গোটা রাজধানী রূপ নিয়েছে ঈদ মার্কেটে। কেনাকাটা চলছে গভীর রাত পর্যন্ত। জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতেও জমজমাট ঈদের বাজার। পোশাকের সঙ্গে গৃহস্থালি জিনিসপত্রের বাজারে বেচাবিক্রি ভালো হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঈদ বাজার ঘিরে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন ছাড়িয়ে গেছে। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী কতটুকু ব্যবসা হচ্ছে এ নিয়ে রয়েছে ব্যবসায়ীদের ভিন্ন মত। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ জনকণ্ঠকে বলেন, এবার রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ঈদের ব্যবসা ভাল হচ্ছে। তবে পরিসংখ্যান দিয়ে বলা মুশকিল। তাছাড়া সরকারী কমর্কর্তা-কর্মচারীরা এবার বেতন-বোনাস বেশি পেয়েছেন। তাই কেনাকাটাও বেশি করেছেন বলে তিনি জানান। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম জনকণ্ঠকে বলেন, ঈদ অর্থনীতির প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। এটা খুবই ইতিবাচক দিক। ঈদ সামনে রেখে ক্রেতাদের খরচ বাড়ছে। আর ক্রেতাদের খরচ বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির ওপর এসে পড়বে, যা ঈদ মার্কেট ঘিরে হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরী বলেন, ঈদে সবচেয়ে বেশি টাকার প্রবাহ বাড়ে- এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। এ টাকার ব্যবহার পোশাক, ভোগ্যপণ্য, শৌখিনতা ও ভ্রমণসহ বিনোদনমুখী খাতেই বেশি হচ্ছে। কাজেই এটা একটা বড় ভূমিকা রাখে অর্থনীতিতে। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উৎসব অর্থনীতির আকার, ধরন ও ব্যাপ্তি আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। মানুষ এ উৎসবকে ঘিরে প্রচুর পরিমাণ অর্থ খরচ করে। এতে উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী প্রত্যেকে কিছু না কিছু লাভবান হচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ঈদের অর্থনীতি চাঙ্গা করেছে নগদ অর্থের প্রবাহ। এটিএম বুথ, ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে প্রচুর নগদ টাকার লেনদেন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ঈদকেন্দ্রিক ২৫ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়ে টাকার পরিমাণ বাড়িয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটায় এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। টানা ৯ দিন ঈদের ছুটিতে এই মাত্রা আরও বেশি পরিমাণে বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইস অব বাংলাদেশে (এনপিএসবি) বর্তমানে ৪২টি ব্যাংকের গ্রাহকরা অন্যের বুথ থেকে এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। প্রতিদিন গ্রাহকরা গড়ে ১৫ কোটি টাকা বেশি উত্তোলন করছেন, যা গত এপ্রিল মাসের গড় লেনদেনের তুলনায় দ্বিগুণ। ঈদ উপলক্ষে বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে ৬১৬ কোটি টাকার বেশি। দেশের আপনজনদের ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে অনেক বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। ইতোমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্সের টাকা যোগ হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে। চলতি জুন মাসে ১১২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। পুরো অর্থবছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে দেশে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোজার অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। এগুলো এখন খুচরা বাজারে বেচাকেনা হচ্ছে। রমজান মাসে সব ধরনের নিত্যপণ্য বিশেষ করে ভোজ্যতেল, ছোলা, চিনি, ডাল, খেজুর, পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে এসব পণ্যের আমদানিও বৃদ্ধি পায়। রোজায় ভোজ্যতেলের চাহিদা হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ টন, চিনি সোয়া ২ লাখ টন থেকে পৌনে তিন লাখ টন, ডাল ৬০ হাজার টন, ছোলা ৫০ হাজার টন, খেজুর ১৩ হাজার টন, পেঁয়াজ ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন, রসুনের চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার টন। এই ভোগ্যপণ্যের বাজার ঘিরে বিভিন্ন ধরনের কারসাজি হয়। শেষ পর্যন্ত এসব বন্ধ করতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এসব পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব টাকার পাশাপাশি ব্যাংক থেকে মোটা অংকের টাকার জোগান দেয়া হয়। এ ছাড়া ঈদ উৎসব পালন করতে রোজার শেষদিকে শহরের অধিকাংশ মানুষ যান গ্রামের বাড়িতে। এ সময় অতিমাত্রায় বেড়ে যায় পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহন এবং নৌযানের চলাচল। এতেও টাকার প্রবাহ বাড়ে। এ ছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে বিনোদনের জন্য দেশে-বিদেশে বেড়াতে যান অনেকে। ফলে পর্যটন খাতেও যোগ হয় বাড়তি টাকার প্রবাহ। সার্বিক এ কর্মকা-ের কারণে সাধারণত অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে অতিরিক্ত অর্থের প্রভাব বেড়ে যায়।

ঈদ-উল-ফিতরে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয় নতুন পোশাক ক্রয়ে। মার্কেটগুলোতে ছেলেমেয়ে আবালবৃদ্ধবনিতার চাহিদা অনুযায়ী পোশাক বেচাকেনা হচ্ছে। এ সময় অভ্যন্তরীণ পোশাকের চাহিদা বাড়ে ব্যাপক হারে। এর বাইরে আরও কয়েকটি খাতের কর্মকা-ে টাকার প্রবাহ বাড়বে। এ বছর সাড়ে ১২ লাখ সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী অষ্টম বেতন কাঠামোর আলোকে ঈদ বোনাস পাচ্ছেন। নতুন বোনাসের আওতায় রয়েছে তিন বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এ ছাড়া বেসরকারী অফিস, প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব কাঠামোতে বোনাস দিচ্ছে। এ ছাড়া পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রায় ৭০ লাখ কর্মীর বোনাসও যোগ হচ্ছে। যার পুরোটাই যোগ হচ্ছে ঈদ-অর্থনীতিতে। ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২০ লাখ দোকান, শপিং মল, বিপণিবিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে ৩ জন করে ৬০ লাখ কর্মচারী ও কর্মকর্তা কাজ করছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগরী দোকান মালিক সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল ইসলাম মন্টু জনকণ্ঠকে জানান, নিম্নে একজন কর্মীকে ৫ হাজার টাকা ও উপরে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেয়া হয়। গড়ে বোনাস ৮ হাজার টাকার হিসাবে এ ক্ষেত্রে ৪ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা বোনাস পাচ্ছেন এ খাতের শ্রমিকরা। যা পুরোটাই ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু ভাল প্রতিষ্ঠান গার্মেন্টস শ্রমিকদের ঈদ বোনাস দিয়ে দিয়েছেন। জানা গেছে, পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বেতন-বোনাস পেয়ে কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন। ঈদে কমপক্ষে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বোনাস যাচ্ছে শ্রমিকদের হাতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএ’র সাবেক এক নেতা বলেন, তার একটি ফ্যাক্টরিতে ঈদ বোনাস গুনতে হয় ৪ কোটি টাকা। তার মতে, কমপক্ষে ২০০ পোশাক শিল্প এবং তার চেয়ে বড় আরও দেড় শ’ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া মাঝারি ধরনের অসংখ্য তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। তার ধারণা, বোনাসের টাকা ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে কত টাকা বেতন-বোনাস দেয়া হয় বা প্রতি মাসে এ শিল্পের ৩৫ লাখ শ্রমিকের বেতন বাবদ ব্যয় কত এ হিসাব পাওয়া যায়নি। ঈদ বাজারের অর্থনীতি নিয়ে এ পর্যন্ত সূচারুভাবে কোন গবেষণা হয়নি, তাই সুস্পষ্ট কোন রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের আয়ের ৬২ শতাংশ ব্যয় করা হয় ভোগের পেছনে। অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে, গ্রামের লিংকেজ বেড়েছে। শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়েও গ্রাম চলছে। ফলে ঈদ মার্কেট ঘিরে গ্রামের অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: