১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিএনপির ১১ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ঝিমিয়ে পড়েছে


শরীফুল ইসলাম ॥ ঝিমিয়ে পড়েছে বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। ছাত্রদল ও শ্রমিক দল ছাড়া বাকি ৯টি সংগঠনের কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। কোন সংগঠনেরই এখন কোন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। তবে এসব সংগঠনকে কার্যকর করতে যত দ্রুত সম্ভব কমিটি পুনর্গঠন করতে বিএনপি হাইকমান্ড ভেতরে ভেতরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এ খবর জানার পর এসব সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন মাধ্যমে লন্ডনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন।

উল্লেখ্য, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের আগেই সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু পরে কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এসব সংগঠনগুলো আর পুনর্গঠন করতে পারেননি তিনি। পরে ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিলের পর ১১ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। ইতোমধ্যে তিনি এ নিয়ে ফাইল ওয়ার্কও করেছেন। পরবর্তীতে সরকারবিরোধী আন্দোলন হলে যারা যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারবেন এমন নেতাদেরই তিনি এসব সংগঠনের শীর্ষ পদের দায়িত্ব দিতে চান।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের কমিটি পুনর্গঠনের কাজে হাত দেন। এক পর্যায়ে কমিটিতে স্থান না পাওয়া বঞ্চিতদের আন্দোলনে পরস্পরের মধ্যে বিরোধ ছড়িয়ে পড়লে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কাজ থেমে যায়। পরে অবশ্য ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তবে কয়েক দফায় ছাত্রদলের কমিটিতে নতুন নতুন নেতাদের সম্পৃক্ত করে সাময়িক সামাল দেয়া সম্ভব হলেও শ্রমিক দলের পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়। এ কারণে ছাত্রদল ও শ্রমিক দলে এখন কার্যত অচলাবস্থা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি থাকায় অন্য ৯টি সংগঠনের অবস্থা আরও নাজুক।

বহু ঝুটঝামেলার পর ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর ১৫৩ সদস্যের ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সভাপতি রাজীব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। এ কমিটি গঠনের পর আগের মতোই বঞ্চিত ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জোরেশোরে আন্দোলন শুরু করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের কার্যালয় ও নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জ্বালাও-পোড়াও কর্মকা-সহ বিক্ষোভ করেন তারা। পরে ১৫৩ সদস্যের কমিটিকে বাড়িয়ে ৭৩৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ কমিটিতে অনেকেরই ছাত্রত্ব না থাকায় নিয়মিত ছাত্ররা এ নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তবে যত শীঘ্র সম্ভব এ কমিটি আবার পুনর্গঠন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দীর্ঘ এক দশক পর ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর পর আনোয়ার হোসাইনকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম খান নাসিমকে সাধারণ সম্পাদক ও জাকির হোসেনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ৩৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তবে এ কমিটি ঘোষণার পর নাজিম উদ্দিন খানকে সভাপতি ও আবুল খায়ের খাজাকে সাধারণ সম্পাদক করে শ্রমিক দলের ৩৫ সদস্যের পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়। এই পাল্টাপাল্টি কমিটির কারণে শ্রমিক দলের কার্যক্রম এখন নেই বললেই চলে।

২০১০ সালের ১ মার্চ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে সভাপতি এবং সাইফুল আলম নীরবকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে মামুন হাসানকে সভাপতি ও এস এম জাহাঙ্গীরকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা মহানগর উত্তর এবং হামিদুর রহমান হামিদকে সভাপতি ও রফিকুল আলম মজনুকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই সদস্য বিশিষ্ট ঢাকা মহানগর নগর দক্ষিণের কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া ২১১ সদস্য বিশিষ্ট যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করেন। বর্তমানে ২৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। যুবদলের কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ ছয় বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত নতুন কমিটি ঘোষণা করা না হওয়ায় পদপ্রত্যাশী অনেক নেতার মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। বিএনপির জতীয় কাউন্সিলের পর সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দলে যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় কাউন্সিলের পর এক পদে এক নেতার বিধান থাকায় মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আর যুবদলের সভাপতি থাকতে পারছেন না। তাই যুবদলে তিনি নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। আর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরবের নামে বেশ ক’টি মামলা থাকায় তিনি সবসময় নিজেকে আড়াল করে রাখেন। এ কারণে যুবদলের কার্যক্রম এখন নেই বললেই চলে।

গ্রুপিং-কোন্দলের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা দল। সংগঠনের একটি গ্রুপ অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনকে কৌশলে সরিয়ে দিয়ে ইসতিয়াক আজিজ উলফাতকে সভাপতির দায়িত্বে বসালেও অধ্যক্ষ সোহরাব এখনও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি দাবি করেন। এ পরিস্থিতিতে সংগঠনটিতে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। তবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া শীঘ্রই মুক্তিযোদ্ধা দলের কমিটি পুনর্গঠন করবেন বলে জানা গেছে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাসাস। এছাড়া বিএনপির প্রতিটি আন্দোলন কর্মসূচীতে জাসাসের নিজস্ব শিল্পীরা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে তুলতেন। গত ক’বছর ধরে জাসাসের কোন কার্যক্রম নেই। এছাড়া বর্তমান কমিটির সভাপতি এম এ মালেক ও সাধারণ সম্পাদক মনির খানের মধ্যে গ্রুপিং থাকায় সংগঠনটিতে এখন অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

এক সময় স্বেচ্ছাসেবক দল ছিল বিএনপির অন্যতম শক্তি। আন্দোলন সংগ্রাম থেকে শুরু করে যে কোন কার্যক্রম সফল করতে এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবক দল এখন ঝিমিয়ে পড়েছে। সংগঠনের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব করায় এবং তিনি বেশ ক’টি মামলায় জড়িয়ে যাওয়ায় তিনি এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবুও এখন সংগঠনে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। তবে নতুন কমিটি গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে তারা জোর লবিং করছেন বলে জানা গেছে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ওলামা দলের সভাপতি হাফেজ আবদুল মালেক ও মহাসচিব মাওলানা শাহ মোঃ নেছারুল হকের নেতৃত্বাধীন কমিটি বহাল রয়েছেন। সংগঠনের অন্য নেতাদের কোথাও খুব একটা দেখা যায় না। এক সময় এ সংগঠনটিও রাজপথে সক্রিয় ছিল। কিন্তু এখন ওলামা দলের কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

বিএনপির অঙ্গ সংগঠন মৎস্যজীবী দলের সর্বশেষ কমিটি হয় ২০০৯ সালে। মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটির কোন কার্যক্রম এখন আর নেই। সংগঠনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মাহতাব ও সাধারণ সম্পাদক মিলন মেহেদী মাঝেমধ্যে বিএনপির কর্মসূচীতে অংশ নিলেও সংগঠনের নিজস্ব কোন কার্যক্রম নেই দীর্ঘদিন ধরে।

২০০৮ সালের ২২ মে তাঁতী দলের কমিটি গঠন করা হয়। সংগঠনের বর্তমান সভাপতি হুমায়ুন ইসলাম খান ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মাঝেমধ্যে বিএনপির অনুষ্ঠানে হাজির হলেও নিজস্ব কোন কার্যক্রম নেই তাদের। তবে তারা দু’জন আবার তাঁতী দলের কমিটিতে থাকতে চান।

গ্রুপিংয়ের কারণে মহিলা দলের কার্যক্রম থেমে গেছে। অথচ এক সময় ১১টি সংগঠনের মধ্যে বিএনপির যে কোন কর্মসূচীতে মহিল দলের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সংগঠনের নূরে আরা সাফা ও শিরিন সুলতানার নেতৃত্বে মহিলা দলের যে কমিটি রয়েছে তা এখন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নূরে আরা সাফার রাজপথে আন্দোলনে অংশ নেয়ার মতো অবস্থা নেই। আর শিরিন সুলতানা দলীয় কাজে সক্রিয় থাকলেও নেতৃত্ব নিয়ে তার সঙ্গে মহিলা দলের অনেক নেতার বিরোধ রয়েছে। তবে নতুন কমিটিতে সভাপতি পদ পেতে চান শিরিন সুলতানা। যদিও তাকে ঠেকাতে মহিলা দলের অনেক নেতাকর্মী সক্রিয় রয়েছেন।

কৃষক দলের বর্তমান কমিটি হয়েছে এক যুগ আগে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব পদ পাওয়ার পর কৃষক দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। আর সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামন দুদু বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হওয়ায় মূল দল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তাই এক সময়ের সক্রিয় এ সংগঠনটিও এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, দলের সকল কর্মকা-ে ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বর্তমানে অধিকাংশ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার পর থেকেই অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। আশা করা যাচ্ছে শীঘ্রই ১১ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন হবে। আর যোগ্য নেতারা স্থান পাবেন এসব সংগঠনে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: