১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ॥ তুরস্ক ও মিসরে আমাদের বন্ধুরা


২০১০ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ’৭১-এর গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণের আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী এ বিচার বন্ধের জন্য- যদি তা সম্ভব না হয় প্রশ্নবিদ্ধ ও বিলম্বিত করার জন্য দেশে ও বিদেশে যে বহুমাত্রিক তৎপরতা শুরু করেছিল তা প্রথম দিকে হালে পানি পেলেও এখন বহুলাংশে স্তিমিত হয়ে পড়েছে।

’৭১-এর ঘাতক আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে জামায়াতের পিতৃভূমি পাকিস্তান ছাড়া একমাত্র তুরস্ক সরকারীভাবে প্রতিবাদ করেছে। দণ্ড কার্যকরের পর তুরস্ক ঢাকা থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছে, যিনি দেড় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ফেরত আসেননি। যদিও তুরস্কের দূতাবাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ আঙ্কারা থেকে আমাদের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠালেও সেখানে এবং ইস্তানবুলে দূতাবাস ও কনস্যুলেটের দৈনন্দিন কাজ স্বাভাবিক রয়েছে।

তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ‘জামায়াতে ইসলামী’র যেমন জ্ঞাতি ভাই, একই সম্পর্ক তাদের রয়েছে মিসরের ক্ষমতাচ্যুত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ বা ‘ইখওয়ানুল মুসলেমীন’-এর সঙ্গে। ২০১৩ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি, নতুন সরকার উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসী এই দলটিকে নিষিদ্ধ করে একদিনে প্রায় সাড়ে পাঁচ শ’ নেতাকর্মী সমর্থককে হত্যা করেছে। দু’সপ্তাহ আগে মিসরের একটি আদালত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রধান নেতা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে হত্যা ও সন্ত্রাসের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। মিসরে নিষিদ্ধ হলেও পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর মতো মুসলিম ব্রাদারহুডের শাখা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশে তৎপর রয়েছে। নিজামীর মৃত্যুদ-ের পর জামায়াতের বড় ভাই মুসলিম ব্রাদারহুড কঠোর ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মুসলিম উম্মাহকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

গত ১৬-২৫ জুন আমি তুরস্কের প্রধান শহর ইস্তানবুল ও মিসরের রাজধানী কায়রো সফর করেছি ‘ওআইসি’র এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশে আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আলোচনার জন্য। তুরস্কের পীস কাউন্সিল গত মে মাসে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ১৯ জুন ইস্তানবুলে তাদের একটি সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য। ইস্তানবুলের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের প্রায় সবাই পীস কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত। দু’বছর আগে তারা আমার ‘দি আল্টিমেট জিহাদ’ ছবিটি তুর্কি ভাষায় রূপান্তরিত করে সেখানে অনেক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল।

যাওয়ার আগে তুরস্ক ও মিসরে আমাদের বন্ধুদের এবং আমাদের দূতাবাসকেও অনুরোধ জানিয়েছিলাম সেখানকার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার জন্য। তিন মাস আগে ইউরোপ যাওয়ার পথে ইস্তানবুলে যাত্রাবিরতি করেছিলাম টার্কিশ পেনক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য। তখনই পীস কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান এ্যাদমির গুলের বলেছিলেন, আমাকে তারা জুনে আমন্ত্রণ জানাতে চান। সেমিনারের বিষয় সম্পর্কেও তিনি বলেছিলেন। তুরস্কের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা সিরিয়ায় গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সিরিয়ায় গণহত্যার জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিচার করবেন গণআদালতে।

বাংলাদেশে ’৭১-এর অন্যতম প্রধান যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের পক্ষে জনমত সংগঠনের জন্য আমরা কীভাবে ২৪ বছর আগে গণআদালতের আয়োজন করেছিলাম এ বিষয়ে আগে তুরস্কের বন্ধুদের বিভিন্ন আলোচনায় বলেছি। আমার প্রামাণ্যচিত্রও তারা দেখেছেন। এ্যাদমির গতবার জানতে চেয়েছিলেন প্রতিকূল পরিবেশে গণআদালত করতে গিয়ে আমরা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলাম এবং কীভাবে তা মোকাবেলা করেছিলাম। গত এপ্রিলে ইস্তানবুলে যখন এ্যাদমিরের সঙ্গে কথা হয়েছিল তখনও নিজামীর রিভিউর রায় বেরোয়নি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের জামায়াতপ্রেম সেদেশের মানুষ সেভাবে জানতে পারেনি।

তুরস্কের সরকারবিরোধী কোন পত্রিকায় নিজামীকে প্রথমে ‘মুজাহিদীন’ পরে ‘শহীদ’ আখ্যা দিয়ে এরদোগানের বক্তব্য ছাপা হয়নি। সরকার সমর্থক প্রধান দুটি কাগজের মাত্র একটিতে এই বক্তব্য ছাপা হয়েছে। ক্ষমতাসীন একে পার্টির অনেকেই এরদোগানের ক্রমশ স্বৈরাচারী হওয়া এবং অটোমান যুগে ফিরে গিয়ে খলিফা হওয়ার পরিকল্পনা পছন্দ করছেন না। বাংলাদেশে ’৭১-এর শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী পরবর্তীকালে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর পক্ষে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বক্তব্য প্রকাশের পরই এ্যাদমির আমাকে লিখেছিলেন, ’৭১-এর গণহত্যা, জামায়াত ও নিজামীর ভূমিকা এবং এই বিচার সম্পর্কে তিনি বামপন্থী দৈনিক সোল (ঝঙখ)-এর জন্য আমার একটি সাক্ষাতকার নিতে চান। সঙ্গে দীর্ঘ প্রশ্নমালাও পাঠিয়েছেন।

প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মনে হলে, এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ লেখা প্রয়োজন। আমি বেশ বড় একটি লেখায় পুরো বিষয়টা তুরস্কের বন্ধুদের জন্য পাঠিয়েছিলাম, যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এরদোগানের নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী বক্তব্যে ক্ষুব্ধ ছিলেন। গত ১৯ মে (২০১৬) দৈনিক ‘সোল’-এ আমার দীর্ঘ সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়েছে ’৭১-এর গণহত্যার কয়েকটি ছবিসহ। একই দিন বহুল প্রচারিত অনলাইন পত্রিকা ‘এবিসি গেজেটিয়ার’ আমার নিবন্ধটিও ছেপেছে, বলাবাহুল্য দুটোই তুর্কি ভাষায়।

এবার যাওয়ার আগে এ্যাদমির লিখলেন, গণআদালতে এরদোগানের বিচার নিয়ে তারাও বলবেন, আমার কাছে বিশেষভাবে জানতে চান বাংলাদেশের জামায়াত ও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তুরস্কের একেপির অশুভ আঁতাত সম্পর্কে। এ বিষয়টি আমার ‘দি আল্টিমেট জিহাদ’ ছবিতে বিস্তারিত দেখিয়েছি। আরও নতুন তথ্য যোগ করে ইস্তানবুলের বন্ধুদের বলেছি ১৯ জুনের সেমিনারে।

ইস্তানবুলের প্রগতিশীল লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীও সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। আমার পঞ্চাশ মিনিটের বক্তব্যের পর এক ঘণ্টা মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং চিন্তা উদ্রেককারীও বটে। ইস্তানবুলের নাজিম হিকমত কালচারাল সেন্টার সব সময় সরগরম থাকে প্রগতিশীল শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের পদচারণায়। সেদিন সেমিনার উপলক্ষে মূল প্রবেশদ্বারের পাশে বিজ্ঞপ্তি বোর্ডে আমার ছবি ও পরিচিতিসহ সেমিনারের বিষয় সম্পর্কে ডিজিটাল পোস্টার সেঁটে দিয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। সেমিনারে দেখলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ কম নয়। তুরস্কের পীস কাউন্সিলের অন্যতম নেতা মুরাত আকাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন প্রবীণ চলচ্চিত্র ও মঞ্চ অভিনেতা ওরহান আইদির, ওদা টিভির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক বারিশ তারকোগলু, ছাত্রনেতা দোগা কান ও ডেনিয গেযেলসহ আরও কয়েকজন। সেমিনারের শুরুতে এ্যাদমির গুলের নির্মূল কমিটির আন্দোলন সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ একটি ভাষণও দিয়েছিলেন।

শ্রোতাদের প্রশ্নের জবাবে গণআদালত সম্পর্কে আমাদের তৎকালীন অবস্থান এবং তুরস্কের বর্তমান অবস্থার তুলনা করে বলেছি, তৎকালীন বিএনপি সরকার জামায়াতের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও তারা তখনও জামায়াতের সঙ্গে খোলাখুলি গাঁটছড়া বাঁধেনি। আমাদের সুবিধা ছিল আমরা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো নেত্রী পেয়েছিলাম এবং আমাদের পাশে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগসহ সকল প্রগতিশীল দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। যে কারণে ১৪৪ ধারা এবং রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়ার হুমকি অগ্রাহ্য করে ঢাকার কেন্দ্রীয় উদ্যানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল। গণআদালতের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রচুর বিদেশী সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক এসেছিলেন, যা তুরস্কের বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব নয়।

তুরস্কের বন্ধুদের পরামর্শ দিয়েছি ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনামে গণহত্যার জন্য যেভাবে বার্ট্রান্ড রাসেল ও জাঁ পল সার্ত প্যারিসে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গণআদালত বসিয়েছিলেন সে রকম কিছু ভাবার জন্য। কারণ, এরদোগান সরকার ইস্তানবুলে এ রকম কিছু সহ্য করবে না। তিন বছর আগে তাকসিম স্কয়ারের ছাত্র-জনতার গণজাগরণ কী ভাবে দমন করা হয়েছে আমার চেয়ে ভাল জানেন তারা। এর আগে অনলাইন ও অফলাইনে গণস্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা এবং ইতালির ‘পার্মানেট পিপলস ট্রাইব্যুনাল’-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছি ইস্তানবুলের বন্ধুদের।

সেমিনারের বাইরেও তুরস্কের লেখক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। মাদাম ভাসফিয়ে জামান ’৭১-এর গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শীÑ যাঁকে আমাদের সরকার মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করেছে। ১৮ জুন তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তিনিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন এবং প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সমালোচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু ও কামাল আতাতুর্ক সম্পর্কে তাঁর চমৎকার তুলনামূলক মন্তব্য রয়েছে ‘দি আল্টিমেট জিহাদ’ প্রামাণ্যচিত্রে।

মিসরে আমার বন্ধু প্রাচীন ইংরেজী দৈনিক ‘ইজিপ্সিয়ান গেজেট’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোহসেন আরিশি কায়রো যাওয়ার আগেই আমাদের দূতাবাসের সঙ্গে বসে দুদিনের জন্য ঠাসা কর্মসূচীর ব্যবস্থা করেছিলেন। ২০ জুন কায়রোয় পৌঁছার পর পরের দুদিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশ ও মিসরের পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেছি।

চলবে...