২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ঠুঁটো আইন, ছোট ইলিশে ছেয়েছে বাজার


ঠুঁটো আইন, ছোট ইলিশে ছেয়েছে বাজার

অনলাইন ডেস্ক ॥ লম্বায় মেরেকেটে ইঞ্চি আটেক। আর ওজন ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম।

নিষেধ উড়িয়ে ধরা ছোট মাপের এই ইলিশই দেদার বিকোচ্ছে রাজ্যের উপকূলবর্তী জেলাগুলির বাজারে। দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি। মৎস্যজীবীদের সংগঠন ‘ইউনাইটেড ফিশারমেন অ্যাসোসিয়েশন’-এর রাজ্য সভাপতি প্রণবকুমার করও মানছেন, ‘‘গত কয়েক দিন ধরে পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় রোজ ১০ থেকে ১২ টন করে ছোট ইলিশ ধরা পড়ছে।’’

অথচ মৎস্য দফতরের নিয়ম, ২৩ সেন্টিমিটার অর্থাৎ ৯ ইঞ্চির কম দৈর্ঘ্যের ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহণ ও বেচাকেনা একেবারে নিষিদ্ধ। তার পরেও কয়েক দিন ধরে কাঁথি, মেচেদা, তমলুক বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপের খোলাবাজারে ঢালাও বিকোচ্ছে ৭-৮ ইঞ্চির ছোট ইলিশ। এতে স্পষ্ট নিয়ম বলবৎ হচ্ছে না, চলছে না নজরদারি। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আশঙ্কা, এত ছোট ইলিশ ধরা পড়লে আগামীতে বাঙালির রসনায় ভাটা পড়বে না তো! ইলিশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা নিয়ে পুর্ব মেদিনীপুরে দীর্ঘদিন কাজ করে আসা বিশেষজ্ঞ উজ্জ্বল সরের কথায়, “ছোট ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। সরকারি নজরদারিও নেই। তাই প্রায় অবাধে ছোট ইলিশ ধরা ও বিক্রি চলছে।’’

সীমান্তের ও পারে বাংলাদেশের ছবিটা কিন্তু উল্টো। বাংলাদেশে বাচ্চা ইলিশকে বলে ‘জাটকা ইলিশ’। আর তার ধরপাকড় বন্ধে যারপরনাই কড়া সে দেশের সরকার। সেখানকার ইলিশ সংরক্ষণের একটি সাম্প্রতিক নথি থেকে জানা গিয়েছে, কেবল মৎস্য দফতর নয়, মরসুমি রুপোলি ফসল বাঁচাতে নৌবাহিনী, উপকূলরক্ষা বাহিনী, পুলিশ, প্রাণিসম্পদ দফতর একসঙ্গে কাজ করে। মরসুমে বাচ্চা ইলিশ ধরা ও বিক্রি আটকাতে টাস্ক ফোর্স গড়া হয়। ইউনাইটেড ফিশারমেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতা বিজন মাইতিও বললেন, ‘‘বাংলাদেশে আটকে পড়া মৎস্যজীবীদের আইনি সহায়তা দিতে গিয়ে দেখেছি, সেখানে ইলিশ নিয়ে নিয়ম খুব কড়া। জেল-জরিমানা পর্যন্ত হয়।’’ শুধু তাই নয়, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের যে সময়টায় ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে, সেই সময় মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রকল্প পর্যন্ত রয়েছে বাংলাদেশে। আর বছরভর নানা সচেতনতা কর্মসূচি তো চলেই।

রাজ্যে ইলিশ সংরক্ষণের বিধি বাংলাদেশের ধাঁচে তৈরি হলেও তার প্রয়োগে পশ্চিমবঙ্গ বেশ পিছিয়ে। বিশেষ করে পরিকাঠামোয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় যেমন ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৭টি ‘ফিশ ল্যান্ডিং’ ঘাট রয়েছে। কিন্তু রায়দিঘি, কাকদ্বীপ, নামখানা-সহ কিছু বড় ঘাটেও মৎস্য দফতরের (সামুদ্রিক) এর অফিস নেই। নেই নজরদারির লোক। ফলে, এই ঘাটগুলি থেকেই নিয়মিত ৯০ মিলিমিটারের কম ফাঁসের জাল নিয়ে সমুদ্রে যাচ্ছেন মৎস্যজীবীরা। ধরা হচ্ছে ছোট ইলিশ।

মৎস্য দফতরের দাবি, তাদের মূল সমস্যা লোকাভাব। দফতরের অধীনে থাকা সব মৎস্য ব্লকে ‘ফিশারিজ এক্সটেনশন অফিসার’ পর্যন্ত নেই। অথচ এঁদেরই কাজ নজরদারি চালানো। আর মাঝদরিয়ায় দায়িত্বে থাকা উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং নৌবাহিনী নিরাপত্তার স্বার্থে শুধু মৎস্যজীবীদের পরিচয়পত্র যাচাই করেন। বেআইনি ভাবে ছোট ইলিশ ধরা হচ্ছে কিনা তা তারা দেখে না।

কাঁথির সহ-মৎস্য অধিকর্তা (সামুদ্রিক) রামকৃষ্ণ সর্দার মানছেন, এ ক্ষেত্রে নজরদারির ব্যবস্থা ঠুঁটো। তাঁর কথায়, ‘‘মৎস্য দফতরের পক্ষ থেকে ইলিশ-মরসুমের আগে থেকেই সভা, শিবির, হোর্ডিং টাঙানো— এ সব চলে ঠিকই। তবে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় প্রায় ৭৮ কিলোমিটার জুড়ে উপকূল। সেখানে মৎস্যজীবীরা কোথায় আইন ভেঙে ছোট ইলিশ ধরছেন, তার খবর রাখা বা আটকানোর মতো পরিকাঠামো মৎস্য দফতরের নেই।”

ডায়মন্ড হারবারের সহ-মৎস্য অধিকর্তা (সামুদ্রিক) সুরজিৎকুমার বাগ অবশ্য জানালেন, বাজারগুলিতে দফতরের তরফে অভিযান চালানো হয়। কোনও বাজারে আসা ইলিশের ২০ শতাংশ বা তার বেশি বাচ্চা হলে তা কেড়ে নেওয়া হয় এবং দেখা হয়, কোন ট্রলারে সেই মাছ ধরা হয়েছে। প্রয়োজনে ট্রলারের লাইসেন্স বাতিল হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা হল, বাজারে যে মাছ বিক্রেতা বাচ্চা ইলিশ বেচছেন, তাঁকে লাইসেন্স দেয় সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত বা পুরসভা। ফলে, সেখানে মাছ কেড়ে নেওয়া ছাড়া ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আর কোনও পদক্ষেপ করার ক্ষমতা মৎস্য দফতরের নেই। তা ছাড়া, ট্রলারে বেআইনি ছোট মাছ পেলে তা কেড়ে নিলামে বেচে তার অর্ধেক টাকা আবার সেই মৎস্যজীবীকেই দেওয়ার নিয়মও রয়েছে।

সব মিলিয়ে ছোট মাছে নিষেধাজ্ঞা খাতায়-কলমেই আটকে থাকছে। আর ইলিশের ভবিষ্যতে বিঁধছে কাঁটা।

সূত্র : আনন্দাবাজার পত্রিকা

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: