২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ন্যাটোর ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা


২০১৬, ২৪ জুন। সকালের ঘুম ভাঙতেই ব্রিটেনবাসী জানতে পারল বিচ্ছেদের করুণ খবর। ইইউ ছাড়ার পক্ষে প্রায় ৫২ শতাংশ জনগণ রায় দিয়েছে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড এখন আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অংশ নয়। বরং ২৮ জাতির এ সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রথম দেখা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে আসলেও সামরিক জোট ন্যাটোতে থাকা না থাকা নিয়ে এখনও নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেনি দেশটি। নিজেদের অর্থনৈতিক প্রশ্নে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গ ছাড়লেও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কখনই মার্কিনীদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে না ব্রিটেন। বোঝা যায় এ দায় তার নিজের। তবে, রিপাবলিকান দলের মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদ প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি ন্যাটো মার্কিনীদের কাছে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ন্যাটোর ধারণাও সেকেলে।

বার্লিন দেয়াল পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী সময়ে ন্যাটো ছিল শক্তিশালী এক সামরিক সংস্থা। ইউরোপ ও আমেরিকার ঐতিহাসিক মেলবন্ধন দুই মহাজোটকেই নিরাপদ রেখেছিল। বিশ্ব নিরাপত্তা জোরদারের এ সংস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বর্তমানে সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তিক্ততা ও দূরত্ব বেড়েছে। সংস্থাটিও হয়েছে দুর্বল। যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ সংস্থার তাতেও চিড় ধরেছে। কারণ বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকা ভিন্ন ভিন্ন সঙ্কটের মুখোমুখি। ইউরোপ বর্তমানে যেসব সঙ্কটের সম্মুখীন তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করতে অক্ষম। সঙ্কটের শীর্ষে রয়েছে শরণার্থী ও অভিবাসী সঙ্কট। আনুমানিক ১.৮ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসী ২০১৫ সালে ইউরোপের সীমান্ত অতিক্রম করেছে। যার অধিকাংশের ঠিকানা হয়েছে জার্মানি। আনুমানিক ১১ লাখ শরণার্থী জার্মানিতে আশ্রয় পেয়েছে। অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর অল্প বিস্তার শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী সঙ্কট সমাধানে উদাসীন। গত বছর ভূ-খ-ের এ দেশটি মাত্র ৮৫০০০ শরণার্থী আশ্রয় নেয়। এ ছাড়া রয়েছে সন্ত্রাস মোকাবেলা ও রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপের প্রভাব। সন্ত্রাস মোকাবেলায় ইউরোপকে যতটা বেগ পেতে হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে তার ছিটেফোঁটা ভোগ করতে হয় না। প্যারিস ও ব্রাসেলসে হামলা যার জ্বলন্ত উদাহরণ। রাশিয়ার ওপর ন্যাটোর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের প্রসঙ্গে আসা যাক। ইউক্রেন সঙ্কটের পর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। যার অন্যতম ভুক্তভোগী ইউরোপ নিজেই। কারণ রাশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৃতীয় বাণিজ্যিক অংশীদার। জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপের অধিকাংশ দেশ রাশিয়া জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফ্রান্সেই নির্মিত হয় রাশিয়ার নৌবহরের বিশাল সব রণতরী। ইতোমধ্যে ইতালি, গ্রীস ও সাইপ্রাস প্রকাশ্যে এই অবরোধের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে। রাশিয়া অর্থনীতিক ক্ষেত্রে ইউরোপের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মার্কিনীদের কাছে ততটা নয়। কারণ রাশিয়া হলো যুক্তরাষ্ট্রের ২৩তম ব্যবসায়িক পার্টনার। ইউরোপ ও আমেরিকার মাঝে সঙ্কট ও মূল্যবোধের বিস্তর ফারাক রয়েছে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা দিয়েও রয়েছে নিজস্ব ছক। ইতোধ্যে দুই মহাদেশেই জাতীয়বাদীদের উত্থান নতুন সঙ্কট তৈরি করবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছে বিশ্লেষকরা। ইউরোপ এখন প্রতিটি রাষ্ট্রের উগ্র-জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান। শরণার্থী ও ইউক্রেন সঙ্কটের ফলেই বিস্তার ঘটেছে এসব দলের। গেল নির্বাচনে এসব উগ্রবাদী জাতীয়তাবাদী দল ডাবল ডিজিল ভোট পেয়ে নির্বাচন শেষ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপকে কখনই এতটা অসহায় ও ভঙ্গুর মনে হয়নি।

ন্যাটোর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ইউরোপের নিরাপত্তা। কিন্তু এ নিরাপত্তার ব্যয়ের সবটায় যুক্তরাষ্ট্রকে মেটাতে হয়। ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রের মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, পোলান্ড, গ্রীস বাজেটের দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট অন্য ২৭টি রাষ্ট্রের সংবলিত বাজেটের তিনগুণ। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ধনী রাষ্ট্র জার্মানি যদি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এমন কৃচ্ছ্রতা দেখায় তবে তা মেনে নিতে পারে না যুক্তরাষ্ট্র।

ইউরোপ আমেরিকার মাঝে যে বিভাজন তাতে রাশিয়া লাভবান হবে। ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলো বিষয়টি উপলব্ধি করে। কিন্তু নিজস্ব সঙ্কটের ফলে তাদের মাঝে সৃষ্ট দেয়াল সমস্যাকেই ঘনীভূত করে।