২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ব্যর্থতার চিত্র আর কে তুলে ধরবেন?


বলা যায় অসময়েই ইহলোকের সব মায়া কাটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন রণজিৎ বিশ্বাস। অসময়ে বলছি এ কারণে, এখনকার যে গড় আয়ু বলতে গেলে সেটাও পার করে যেতে পারলেন না। সে অর্থে অসময়েই বলা যায়। সারা জীবন শুধু দিয়েই গেছেন। যখন তাঁর পাওয়ার সময় তখনই তিনি এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। গদ্যসাহিত্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন পরিপূর্ণ ক্রীড়ালেখক তথা ক্রিকেটলেখক। বহু পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন তিনি। তাঁকে কী বলে অভিহিত করা যায়? একজন সদালাপী, সদাচারী-শিষ্টাচারী মানুষ নাকি একজন শুদ্ধাচারী ও প্রমিত ক্রিকেটলেখক? তিনি ছিলেন একজন নান্দনিক ও সৌকর্যম-িত একজন ঋদ্ধমানুষ, পরিশীলিত লেখক। আচার-আচরণে, চলাফেরায়, কথা-বার্তায় তিনি ছিলেন আর দশজনের চেয়ে আলাদা। তাঁর এভাবে চলে যাওয়া নিঃসন্দেহে বাংলাসাহিত্যের তথা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ব্যর্থতার চিত্রগুলো আর কে তুলে ধরবে? ২৩ জুন বৃহস্পতিবার বিকেলে শেওড়াপাড়ায় একটি কবি সংগঠন ‘অনুপ্রাসে’র অনুষ্ঠানে যাব ভাবছিলাম। যাই যাব করে আর যেতে ইচ্ছে হল না। ইফতারের আগে সময় কাটানোর জন্য ফেসবুকে বসলাম। হঠাৎ করে কবি ও বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদিরের একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। ‘নন্দিত লেখক ও সাবেক সিনিয়র সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস আর নেই। বৃহস্পতিবার বিকেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।’ খবরটা দেখে যেন হাজার ভোল্টের শক খেলাম। ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ঘটনার সত্যতা জানার জন্য বৌদি কবি শেলী সেনগুপ্তার ফোনে ফোন দিলাম। ফোন ব্যস্ত। কথা বলা গেল না। রণজিৎদার ফোনে কল দিলাম। ফোনটা তখনও বন্ধ হয়নি। রিং হতে থাকল। কিন্তু কেউ ধরল না। ক্রীড়ালেখক সমিতির সাবেক সভাপতি রানা হাসানের ফোনে ফোন দিয়েও বিফল মনোরথ হতে হলো। সেটাও এনগেজড। এভাবে আরও অনেকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে হতাশ হলাম। ইতোমধ্যে দুলাল মাহমুদ, শ্যামল কর্মকার, অজয় দাশগুপ্তসহ আরও কয়েকজনের পোস্ট দেখার পর আর সন্দেহ থাকল না। তাতে করে যা জানলাম সেটা হচ্ছে, একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বুধবার রাতে রণজিৎ বিশ্বাস স্ত্রী শেলী সেনগুপ্তাসহ চট্টগ্রামে আসেন। পরদিন দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম নেয়ার সময় বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের ‘বকুল’ এ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি রুমে একা ছিলেন। বিকেলে আয়োজকরা তাঁকে অনুষ্ঠানে নেবার জন্য এসে দেখেন দরজা বন্ধ। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ধারণা করা হয়, হার্ট ফেইলরে তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। দীর্ঘদিন তিনি ডায়াবেটিকসে ভুগছিলেন। অভিষেক বিশ্বাস হীরা ও উপমা বিশ্বাস মুক্তা নামের দুই সন্তানের জনক । তাঁর স্ত্রী শেলী সেনগুপ্তা একজন কবি ও শিক্ষক। মৃত্যুর সময় তিনি স্বামীর পাশে ছিলেন না।

পরদিন শুক্রবারে দুপুরে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর লাশ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে নেয়া হয়। সেখানে চট্টগ্রামের মেয়র থেকে শুরু করে অনেক মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, প্রকাশক-লেখক-সাংবাদিক, আমলা-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষ সবাই এ বরেণ্য লেখক ও সচিবের শবে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শেষ বিদায়ের আগে স্বামী ড. রণজিৎ বিশ্বাসের মরদেহের সামনে দাঁড়িয়ে স্ত্রী কবি ও শিক্ষক সিএম শেলী সেনগুপ্তা বললেন- ‘আমার স্বামীর সঠিক মূল্যায়ন হয়নি।’ তাঁর এই কথাটা (অভিযোগ) আমার মনটাকে আরও একবার নাড়া দিল। কথাটা যে শতভাগ সত্যি এর আগেও অনেকবার উপলব্ধি করেছি। রাষ্ট্র তাঁকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে বা স্বাধীনতা পদকের কোনটাই দেয়নি। অথচ তাঁর চেয়ে অনেক কম যোগ্য অনেকেই এসব পদক পেয়েছেন। আমি এর আগেও অনেকবার বলেছি, আজকাল পদক দেয় না, নিতে হয়। তিনি ছিলেন তাঁর পিতার আদর্শে গড়া মানুষ। তাই তিনি এই তথাকথিত নেয়াটাকে ঘৃণা করতেন। নিজে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। চাইলে তিনি অনেক পদক নিতে পারতেন। তিনি চাননি ও নেননি। এ কারণে তিনি অনেক ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে তাতে করে তিনি ছোট হয়ে যাননি। যারা দেয়নি তারা ছোট হয়েছে। তাদের হীনম্মন্যতা প্রকাশ পেয়েছে। এ সব পুরস্কার না পেয়েও তিনি পুরস্কারের অনেক ওপরের মানুষ হিসেবে গণ্য হবেন। সবার শ্রদ্ধার আসনে আসীন থাকবেন, অনন্তকাল।

রণজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়, সেটাও হবে প্রায় বছর তিরিশেক আগে। আমরা দুজনেই বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সদস্য। আমি তাঁর লেখার, বিশেষ করে ক্রিকেট লেখার ভীষণ ভক্ত ছিলাম। ইত্তেফাকের রবিবারের খেলার ফিচার পাতা, ইনকিলাবের শনিবারের খেলার ফিচার পাতাসহ সব দৈনিকের সাপ্তাহিক খেলার ফিচার পাতা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, রোববার, পূর্ণিমা, পাক্ষিক ক্রীড়াজগতে তাঁর লেখা পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। সমিতিতে তিনি ছিলেন আমার বছর দুয়ের সিনিয়র সদস্য। আমরা দুজনেই ক্রীড়ালেখার বাইরে সাহিত্যচর্চা সঙ্গে জড়িত থাকায় হৃদ্যতাটা একটু বেশিই ছিল। এ সবেরও অনেকগুলো কারণ ছিল। তাঁর সঙ্গে আমার অনেক বিষয়ে মিল ছিল। তাঁর মতো আমিও মধুমেহ রোগে ভুগছি। তাঁর স্ত্রী ও আমার স্ত্রী দুজনেই কলেজ শিক্ষক। দুজনেই সমমনা মানুষ। এসব নানা কারণে তাঁর সঙ্গে আমার তিরিশ বছরের সখ্য অটুট ছিল। তিনি যে কেবল আমার একজন প্রিয় লেখকই ছিলেন তাই নয়, ছিলেন একজন প্রিয় মানুষও। আমার দেখা অন্যতম সেরা প্রিয় ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। তাঁর মতো এমন সজ্জন, এমন বিনয়ী, এত ভাল ব্যবহার আমি খুব কমই দেখেছি। তাঁর সঙ্গে আমার একটাই অস্বস্তিকর ঘটনা ছিল, ২০০৮ সালে ক্রীড়ালেখক সমিতির নির্বাচনে সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে তিনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। সে নির্বাচনে আমি জয়লাভ করি। যদিও সে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আমার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না। সেটা আমি তাঁকে বলেছিলামও। তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় চাননি। সে পরাজয় যেমন তাঁর মনের একটা কষ্ট ছিল, সে জয়ও আমার মনে কোন আনন্দের উদ্রেক করেনি। কেননা আমি তো নির্বাচন করতেই চাইনি। তবে তাতে করে আমাদের সম্পর্কে এতটুকু চিড় ধরেনি।

১৯৫৬ সালের ১ মে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন রণজিৎ বিশ্বাস। তাঁর পিতা অপর্ণাচরণ বিশ্বাস ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। মা স্নেহলতা বিশ্বাস ছিলেন সু-গৃহিণী। তাঁর জন্মের পর বাবা অপর্ণাচরণ অনেক সখ করে ছেলের নাম রাখলেন রণজিৎ বিশ্বাস। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ছেলে রণজিৎ জীবনের সব যুদ্ধ জয় করবে। জয় করেও ছিলেন তিনি। একটা অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে একজন অসাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। জীবনের অনেক যুদ্ধে জিতলেও (এই তো গেল বছর একটা মারাত্মক এ্যাক্সিডেন্ট করেও সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে প্রাণে বেঁচে যান) শেষ যুদ্ধে লড়াইয়ের আগেই হেরে গেলেন। চিকিৎসার সুযোগটুকুও না দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। যেখান থেকে আর কেউ কোনদিন ফিরে আসে না। রণজিৎ বিশ্বাসের ছেলেবেলা কাটে সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাপ্তাইয়ে। এখানেই স্কুলশিক্ষক বাবা অপর্ণাচরণ বিশ্বাস আর মা স্নেহলতা বিশ্বাসের স্নেহছায়ায় বেড়ে উঠতে থাকেন। ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, জীবন গড়ার দীক্ষা নেন বাবার কাছ থেকে। বাবার আদর্শে বড় হন। সারা জীবনে পিতাই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। যে কারণে সারা জীবন সততার পরিচয় দিয়ে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বেঁচে ছিলেন। পিতার কর্মস্থল কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী প্রজেক্ট হাইস্কুলে রণজিৎ বিশ্বাসের লেখাপড়া শুরু। এখান থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থায়ই ছিলেন মেধাবী ছাত্র, একজন ভাল বিতার্কিক। স্কুলে পড়াকালে ইস্ট পাকিস্তান সায়েন্স স্পীকার্স ফোরামের ‘বিজ্ঞান বিষয়ক’ বত্তৃতায় দ্বিতীয় হন। ১৯৭০ সালে ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র’ আয়োজিত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিতর্কে রণজিৎ বিশ্বাস সারা দেশের মধ্যে প্রথমস্থান লাভ করে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখান। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অনার্স ও মাস্টার্স করেন।

ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যে এবং খেলাধুলার প্রতি দুর্বলতা ছিল। বিশেষ করে ক্রিকেটের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন প্রাণের টান। বলা যায় ক্রিকেটপ্রাণ মানুষ ছিলেন। ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা থেকেই ক্রিকেটসাহিত্য লেখায় অনুুপ্রাণিত হন। যদিও পত্রিকায় প্রথম তাঁর গল্প ছাপা হয়। সেটা ১৯৭২ সালে। দৈনিক সংবাদে ’শোধ’ নামে তাঁর একটি গল্প ছাপা হয়। এ গল্প প্রকাশের পর লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। ১৯৭৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে তাঁর প্রথম ক্রীড়াবিষয়ক লেখা প্রকাশিত হয়। নবাগত এই তরুণ লেখককে উৎসাহ দেয়ার জন্য চট্টগ্রাম থেকে তাঁর পাঠানো ’টেস্ট ক্রিকেটে ট্রিপল সেঞ্চুরি’ লেখাটি ইত্তেফাকের ক্রীড়া সম্পাদক বদি-উজ-জামান আধাপৃষ্ঠাজুড়ে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছেপেছিলেন। এরপর থেকে লেখালেখিতে অনেকটা সক্রিয় হন। বিশেষ করে ক্রিকেট সাহিত্য নিয়ে। চট্টগ্রামের স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত ক্রিকেট কলাম লিখতে শুরু করেন। এরপর থেকে ক্রীড়াবিষয়ক লেখার পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, মানুষ ও মানবতা নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে দু’হাতে লিখতে থাকেন। ইত্তেফাক, ইনকিলাব, দৈনিক বাংলা, বাংলার বাণী, সংবাদসহ অন্যান্য দৈনিকের সাপ্তাহিক খেলার ফিচার পাতায়, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, রোববার, পূর্ণিমা, পাক্ষিক ক্রীড়াজগতসহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। ১৯৭৭ সাল থেকে প্রায় তিন দশক তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন পাক্ষিক ক্রীড়াজগতে। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর জনপ্রিয় কলামগুলো হচ্ছে, কুড়িয়ে পাওয়া সংলাপ (কালের কণ্ঠ), জীবনকথন (জনকণ্ঠ), রম্যকথন (যুগান্তর), প্রতিদিনের পথের ধুলায় (দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম), রম্যকথার এক ঝাঁপি (দৈনিক পূর্বকোণ, চট্টগ্রাম), নিত্যদিনের কড়চা (দৈনিক পূর্বকোণ) ও ভাষা শেখার আনন্দ (প্রথম আলো)। ক্রিকেটসাহিত্য রচনায় তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। গত তিরিশ বছর ধরে দেশের সব শীর্ষ পত্রিকায় ক্রিকেটসাহিত্য লিখেছেন। লেখার পাশাপাশি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। বেতারে তিনি ছিলেন নিয়মিত কথিকা প্রদায়ক। একসময় পেশাদার সাংবাদিকও ছিলেন।

রণজিৎ বিশ্বাস নিজে আশৈশব দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে বড় হয়েছিলেন বলে তাঁর অকালপ্রয়াত একমাত্র পুত্র অভিষেক বিশ্বাস (হীরা)’র নামে বিগত দশ বছর ধরে নিজের গ্রামে প্রতিবছর দুজন দরিদ্র ছাত্রকে (একজন ছাত্র, অপরজন ছাত্রী) ব্যক্তিগত অর্থে বৃত্তি দিয়ে আসছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সভাপতি মোস্তফা মামুন ও সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান উজ জামান রাজীব বলেনÑ ‘তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন অভিভাবক হারালাম আর দেশ হারালো একজন ঋদ্ধ কথাসাহিত্যিক ও ক্রিকেট-লেখককে। কবি ও বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদির বলেনÑ ‘বিচিত্রায় নিয়মিত লিখতো তরুণ রণজিৎ। বদি-উজ-জামান ওকে বলত খেলোয়াড়। আমার সম্পাদিত ‘নিরীক্ষ’য় ও নিয়মিত লিখেছে। এই সেদিন এসেছিল বাংলাদেশ লেখক পরিষদের আমাকে দেয়া এক সম্মাননা অনুষ্ঠানে। সেখানে ওর স্মৃতিচারণ অভিভূত করে আমাকে। আমার মতো একজন সামান্য সম্পাদককে অসামান্য সম্মান জানিয়ে বলেÑ ‘সাযযাদ কাদির আমার লেখক-জীবনের অভিভাবক।’ সাবেক সচিব ও কবি অর্ণব আশিক বলেনÑ ‘তাঁর মতো এমন অকৃত্তিম বন্ধু ও একজন পরিপূর্ণ মানুষ বিরল।’ বই প্রকাশে রণজিৎ বিশ্বাস কখনোই অতটা বেশি সক্রিয় ছিলেন না। ফলে তুলনামূলক তাঁর বইয়ের সংখ্যা কমই বলা যায়। তবে যেগুলো লিখেছেন তা বাংলাসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। বিশেষ করে তাঁর ক্রিকেটের লেখাগুলো। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- অসঙ্কোচ প্রকাশ, অসবর্ণ, ব্যবহারিক বাঙলায় ভ্রমকণ্টক, চার কোণে চারজন, যত ভুল তত ফুল, শুদ্ধ বলা শুদ্ধ লেখা ও গৌরব আমার গ্লানি আমার, কুড়িয়ে পাওয়া সংলাপ, মানুষ ও মুক্তিযুদ্ধের সংলাপ, হৃদয়ের ক্ষরণকথা প্রভৃতি। ক্রীড়া বা ক্রিকেট লেখার পাশাপাশি গদ্য, গল্প, প্রবন্ধ ও রম্যচনায়ও তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।

১৯৮১ সালে তিনি বিয়ে করেন রণজিৎ বিশ্বাস। স্ত্রী কবি ও শেলী সেনগুপ্তা পেশায় একজন শিক্ষক। ঢাকার ক্যামব্রিয়ান কলেজের অধ্যাপক। একমাত্র ছেলে অভিষেক বিশ্বাস (হীরা) কে নিয়ে একটা দুঃখজনক ও মর্মান্তিক ঘটনা এ দম্পতির জীবনের চালচিত্র ওলট-পালট করে দেয়। সেটা ছিল তাদের জীবনের একটা বড় কষ্ট। এ ঘটনা তাদের হৃদয়ের অনেকটা অংশ বেদনায় নীল হয়ে ছিল। সে সন্তান অনেকদিন হলো অকালপ্রয়াত। তবে একমাত্র মেয়ে উপমা বিশ্বাস (মুক্তা) তার স¦ামী অনিরুদ্ধ ভদ্রকে নিয়ে সুখের সংসার করছে।

রণজিৎ বিশ্বাস স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৮১ সালে বিসিএস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন সরকারী চাকুরিতে। চাকরিসূত্রে তিনি অনেক দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সচিব পরে সচিব হন। ২০১৪ সালে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন। ২০১৫ সালের মে মাসে তিনি সিনিয়র সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। চাকরির মেয়াদ বাড়াতে পারতেন, কিন্তু এ বছর একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার কারণে আর বাড়াননি।

রণজিৎ বিশ্বাস তাঁর নিজের শত ব্যস্ততার মাঝেও লেখার জন্য আলাদা করে সময় বের করে নিতেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দু’হাতে লিখে গেছেন। এত নিষ্ঠাবান লেখক আমার জীবনে কমই দেখেছি। কাউকে ‘না’ করতেন না। শত ব্যস্ততার মধ্যে ঠিক সময়ে লেখাটি যথাস্থানে পৌঁছে দিতেন। নিজেকে ‘শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি। কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। ছোট-বড় সব অনুষ্ঠানেই যেতেন। ছোট-বড়র ভেদাভেদ করতেন না। বিশেষ করে রিটায়ার করার পর তো বলতে গেলে কোন অনুষ্ঠানই বাদ দিতেন না। বইমেলার সময় স্ত্রী শেলী সেনগুপ্তাসহ এলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘কবিবরণ’ অনুষ্ঠানে। সেখানে তাঁর স্ত্রী শেলী সেনগুপ্তাও বরণীয় ছিলেন। অনেকটা সময় দিলেন এ অনুষ্ঠানে। ক্রীড়ালেখক সমিতির পিঠা উৎসব বা বাংলাদেশ লেখক পরিষদের ‘পঙ্ক্তির প্রকাশনা উৎসব কোনটাই বাদ দেননি। ২৮ মে বাংলাদেশ লেখক পরিষদের অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর নিজের লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করে সবাইকে মুগ্ধ করেন। কথা ছিল ৩০ জুন উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ লেখক পরিষদের ইফতারে। নিয়তির কী বিধান, তার আগেই ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন। আগেই বলেছি ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বারবার। যে কারণে বাংলা একাডেমি, একুশে বা স্বাধীনতা পদক তাঁর ঘরে ঠাঁই পায়নি। ৪২ বছরের লেখালেখি জীবনে পেয়েছেন ‘পলক সাহিত্য পুরস্কার, ‘মাসিক মোহামেডান ক্রীড়া পুরস্কার’ ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির এআইপিএস-ডে সম্মাননা, ২০১২ সালে সমিতির সূবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ’আজীবন সম্মাননা’সহ বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা। বিভিন্ন সময় ক্রীড়লেখক সমিতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সদাহাস্য প্রাণচঞ্চল, সুদর্শন-ছিমছাম ও অত্যন্ত মার্জিত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রণজিৎ বিশ্বাস ছিলেন সবার প্রিয় একজন মানুষ। কর্মজীবনে তিনি ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডে, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, স্কটল্যান্ড, জাপান, ইতালি, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, মালদ্বীপ, হংকং, চীন, কাতার ও নেপালসহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। এছাড়া পেশাগত জীবনে তথ্য সার্ভিসে কাজ করার সুবাদে ডিপার্টমেন্ট অব ইন্দোনেশিয়া, জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাষ্ট্র), ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম (যুক্তরাজ্য) এবং সিভিল সার্ভিস কলেজ (যুক্তরাজ্য) থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

তাঁর এই অকাল প্রয়ানে এটাই প্রার্থনা, পরজীবনে শান্তিতে থাকুন আমাদের সবার প্রিয়জন ড. রণজিৎ বিশ্বাস। তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও ক্রীড়ালেখক

syedmayharulparvey@gmail.com