২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিটিসিএলের ট্রিপল প্লে সেবা চালু করতে চাই আরও প্রকল্প!


ফিরোজ মান্না ॥ বিটিসিএলের ট্রিপল প্লে (ত্রিমাত্রিক) সেবা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছেনি। তার আগেই সেবাটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ট্রিপল প্লে সেবার আওতায় ছিল ভয়েস কল, ইন্টারনেট ও টিভি দেখার সুবিধা। বর্তমানে সীমিত আকারে মিরপুর ও বারিধারায় কিছু গ্রাহককে ট্রিপল প্লে সেবার নামে শুধু ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া হচ্ছে। টিভি সেবা এখনও চালু হয়নি। এক বছর আগে বিটিসিএল প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ করে। তখন ঘটা করে সেবাটির উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পরের দিনই সেবাটি বন্ধ হয়ে যায়। এর পর এক বছরেও এটি চালু করতে পারেনি বিটিসিএল। অভিয়োগ উঠেছে, ট্রিপল প্লে সেবা চালু না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে। যারা ডিশ টিভি ও ইন্টারনেট সেবা দেয় তারা কৌশলে এই সেবা বন্ধ রেখেছে। তবে বিটিসিএল বলছে, কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এই ত্রুট দূর করতে বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। টাকা পাওয়া যাচ্ছে না বলে ট্রিপল প্লেও চালু হচ্ছে না।

এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি স্থাপন করার কারণে সেবাটি কোন কাজে আসছে না। এটি চালু করতে হলে নতুন করে যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। তাতে আরও এক শ’ কোটি টাকার প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো টাকা বুঝিয়ে দিয়েছে বিটিসিএল। প্রকল্পের কোন দায়দায়িত্ব আর ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নেই। এখন প্রকল্পটি চালু করতে হলে আবার একটি প্রকল্প তৈরি করতে হবে। এভাবেই চলছে বিটিসিএলে সরকারী অর্থের হরিলুট।

সূত্র জানিয়েছে, ট্রিপল প্লের মাধ্যমে সেবা দেয়ার জন্য রাজধানী ঢাকার সর্বত্র ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপনের কাজটিও শেষ হয়নি বলে জানিয়েছে বিটিসিএল। সর্বশেষ, বিটিসিএল ট্রিপল প্লে সেবায় কেবল টিভি নয়, ‘ভিডিও অন ডিমান্ড’ সেবার মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে নির্বাচিত কিছু ভিডিও দেখার সেবা দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে বলে জানা গেছে। টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের (টিএনডিপি) আওতায় নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ট্রিপল প্লে সেবা দেয়ার জন্য যন্ত্রপাতি বসানো হবে। এখানেও নানা অনিয়মের কারণে টিএনডিপি প্রকল্পটির বাস্তবায়নের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের কাজ অফিশিয়ালি শেষ হয়ে গেছে। তবে বাস্তবে এখন পর্যন্ত বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। কাজগুলো শেষ না হলে সাধারণ গ্রাহকের কাছে সেবা পৌঁছানো যাবে না। কতদিনের মধ্যে গ্রাহক এ সুবিধা পেতে পারেন জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। তবে গ্রাহকের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ চলছে।

বিটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, জাপানের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জাইকার ঋণ সহতায় বিটিসিএলের নেয়া ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ (টিএনডিপি) লটে অংশের মাধ্যমে ২০১১ সাল থেকে ট্রিপল প্লে সেবা দেয়ার জন্য উন্নত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে শুরু থেকেই প্রকল্পটি ঘিরে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ঠিকাদারকে জাপানী ইয়েনে মূল্য পরিশোধের শর্ত লঙ্ঘন করে মার্কিন ডলারে মূল্য পরিাশোধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে প্রায় দেড় শ’ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে যায়। ট্রিপল প্লের সেবার জন্য প্রয়োজনীয় জি-পন যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগেই যন্ত্রপাতি স্থাপন দেখিয়ে ঠিকাদারকে মূল্য পরিশোধের বিষয়ে বড় বিতর্ক ওঠে। জানা গেছে, বিওকিউ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যয়বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়। এই প্রকল্পের আরেক অংশ লট-বি’র দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক ওঠে। অনিয়মের অভিযোগ এবং আদালতে দীর্ঘ আইনী লড়াইও চলে। মামলায় বিটিসিএল হেরে যাওয়ার পর নানা অপকৌশলে অত্যাধুনিক ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপনের জন্য গৃহীত প্রকল্পের লট-বি অংশটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এ অংশের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণও জাইকা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। জাইকা ঋণ প্রত্যাহারের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটিও টিএনডিপি প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের প্রমাণ পায়।

সূত্র জানায়, লট বি অংশের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জেলা শহরে নিরবচ্ছিন্ন ফাইবার অপটিক কেবল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার কথা ছিল। প্রথমে রাজধানী এবং পরে দেশের বিভাগীয় এবং জেলা শহরেও একই সংযোগে ভয়েস কল, কেবল টিভি এবং ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্ত লট-বি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ফাইবার অপটিক নেওয়ার্ক না থাকার কারণেই লট-এ মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া ট্রিপল প্লে সুবিধা রাজধানীর সাধারণ গ্রাহকের কাছেই পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। কিছু এলাকায় টিএনডিপি প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের জুন মাসে। তবে দু’দফায় সময় বাড়িয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় ২০১৫ সালের জুন মাসে। কিন্ত এক বছর পর ট্রিপল প্লে সুবিধার খ-িত সেবা পৌঁছে দেয়া হয়েছে শুধু রাজধানীর মিরপুর ও বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায়। এসব এলাকায় ট্রিপল প্লের মাধ্যমে একই সংযোগে ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কিন্ত কেবল টিভি সুবিধা দেয়া হচ্ছে না। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এনজিএন (নেক্সট জেনারেশন নেটওয়ার্ক) ভিত্তিক যে ধরনের সফট সুইচের মাধ্যমে যে ধরনের উন্নত নেটওয়ার্ক সুবিধা দেয়ার কথা ছিল তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ট্রিপল প্লে সুবিধার আদলে এ দুটি এলাকায় মূলত কিছুটা উন্নত ইন্টারনেট সেবা দিয়ে ট্রিপল প্লে বলে চালিয়ে যাচ্ছে বিটিসিএল। ট্রিপল প্লে সেবায় কেবল টিভি যুক্ত করার পরিবর্তে ‘ভিডিও অন ডিমান্ড’ সেবা চালু করতে যাচ্ছে বিটিসিএল। এ জন্য এরই মধ্যে কনটেন্ট প্রোভাইডার নিয়োগের জন্য দরপত্রও আহবান করা হয়েছে। ভিডিও অন ডিমান্ড সেবায় গ্রাহক নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে পছন্দের সিনেমা কিংবা ভিডিও দেখতে পারবেন। কপিরাইট ব্যবস্থার কারণে অনলাইনে যেসব সিনেমা কিংবা ভিডিও বিনামূল্যে দেখা যায় না, মূলত সেগুলোই নির্ধারিত মূল্য নিয়ে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।

অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রিপল প্লে চালু না হওয়ার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী হাত। ট্রিপল প্লে চালু হলে ডিশ টিভির কোন প্রয়োজন হবে না। বিটিসিএলের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এই সেবা চালু হতে দিচ্ছে না। বিটিসিএলকে লোকসান থেকে লাভজনক করতেই ব্যয়বহুল টিএনডিপি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি হাতে নেয়ার পর থেকেই কেবল টিভি, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সেবাদাতা ও ইন্টারনেট সেবা দাতা প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রকল্প নিয়ে আপত্তি তোলে। এ প্রভাবশালী মহলের মদদেই নানা কৌশলে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: