২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

যুবকদের টার্গেট করে তারা মসজিদে মসজিদে ঘুরতেন


স্টাফ রিপোর্টার ॥ নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের দাওয়াতি সেলে দুই শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে গ্র্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দু’জনই মাদ্রাসা শিক্ষক। পবিত্র মাহে রমজানে তারা ঢাকার বিভিন্ন মসজিদে মসজিদে ঘুরতেন। তাদের টার্গেট অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ যুবকরা। পবিত্র কোরান ও হাদিস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানার জন্য ওইসব যুবকদের দাওয়াত দিত।

গত ২৬ জুন রবিবার রাতে রাজধানীর গেন্ডারিয়া থানাধীন ফরিদাবাদ মাদ্রাসা এলাকায় অভিযান চালায় ডিবি পুলিশের একটি দল। অভিযানে গ্রেফতার হয় মাওলানা মোঃ নাইম ওরফে সাইফুল ইসলাম ওরফে সাদ। গ্রেফতারকৃত সাদ ফরিদাবাদ মাদ্রাসার শিক্ষক। তার দেয়া তথ্য মোতাবেক ওই রাতেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানা এলাকায় অভিযান চালায় ডিবি। এই অভিযানে গ্রেফতার হয় সোহেল আহম্মেদ ওরফে সোভেল। তিনি কামরাঙ্গীরচর থানাধীন আল আরাফা ইসলামীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক।

সোমবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, গত ১৩ জুন রাতে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য মোজাহিদুল ইসলাম ও আরিফুল ইসলাম ওরফে সোলায়মান ওরফে আরাফাত গ্রেফতার হয়।

তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার রাতে অভিযান চলে। সেই অভিযানে গ্রেফতার হয় এ দু’জন। তারা দু’জনই মাদ্রাসা শিক্ষক। তারা জঙ্গী সংগঠনটির ঢাকা অঞ্চলের দাওয়াতি শাখার শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তারা মূলত জঙ্গী সংগঠনটির দাওয়াতি কার্যক্রম চালাতেন। এমনকি নিয়মিত তারা দাওয়াতি কার্যক্রম মনিটরিং করতেন। তারা নিজেরাও বিভিন্ন মসজিদে মসজিদে গিয়ে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ যুবকদের টার্গেট করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পক্ষে দাওয়াত দিতেন। দীর্ঘ দিন ধরেই তারা শিক্ষকতার পাশাপাশি জঙ্গী সংগঠনটির দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সরাসরি কোন হত্যাকা-ে বা কোন অপারেশনে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

গ্রেফতারকৃতরা গত ১৯ জুন রাজধানীর খিলগাঁওয়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক শাখার নেতা এবং বিভিন্ন হত্যাকা-ের অপারেশনাল কমান্ডার শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদী-১ দলের সদস্য।

যদিও লাশ নেয়ার সময় শরিফুলের বোনজামাই ও চাচাত ভাই শরিফুল তাদের কাছে মুকুল নামে পরিচিত বলে দাবি করেন। তবে ঢাকায় মুকুল কি নামে পরিচিত ছিল তা তাদের জানা নেই দাবি করেন। লাশ গ্রহণকারীরা শরিফুলের একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দেখান। সেই পরিচয়পত্রের ছবির সঙ্গে পুলিশের প্রকাশ করা ছবি হুবহু মিলে যায়। পুলিশের দাবি, জঙ্গীরা নিজেদের গ্রেফতারের হাত থেকে বাঁচাতে ছদ্মনাম ব্যবহার করে থাকে। শরীফুলও তাই করেছে।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে হাদী কোন নাম নয়। হাদী মানে সামরিক শাখার নেতা। সামরিক শাখার হাইকমান্ডের নির্দেশে একেক জন হাদীর অধীনে একেকটি সিøপার সেল থাকে। হাদীকে সরেজমিনে মাঠে থেকে হত্যাকা-ের অপারেশনাল কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।

প্রসঙ্গত, গত ১৯ মে ছয় জঙ্গীর ছবি প্রকাশ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। তাদের ধরিয়ে দিতে ১৮ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এদের বন্দুকযুদ্ধে নিহত শরিফুলকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আর সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২ ধরিয়ে দিতেও পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। অপর চারজন সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান, আব্দুস সামাদ ওরফে সুজন ওরফে রাজু ওরফে সালমান ওরফে সাদ, শিহাব ওরফে সুমন ওরফে সাইফুল এবং সাজ্জাদ ওরফে সজিব ওরফে সিয়াম ওরফে শামসকে ধরিয়ে দিতে প্রত্যেকের জন্য দুই লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এরা গত কয়েক বছরে লেখক, প্রকাশক, ব্লগারসহ অনেক নৃশংস হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত।

এ চারজনের মধ্যে শিহাব ওরফে সুমন ওরফে সাইফুল গত ১৫ জুলাই গ্রেফতার হয়। এরপর রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয় শিহাব। জবানবন্দীতে গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনা কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি চালিয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল (৫০), লেখক এবং ব্লগার প্রকৌশলী তারেক রহিম (৪২) ও রন দীপম বসুকে (৪০) হত্যাচেষ্টার কথা স্বীকার করে। এমনকি টুটুলকে হত্যা করতে নিজেই চাপাতি দিয়ে পর পর তিনটি কোপ দেয় বলেও জবানবন্দীতে জানায়। হাদী-১ অর্থাৎ শরিফুল টুটুলকে হত্যার উদ্দেশে চালানো হামলায় সরেজমিনে মাঠে থেকে অপারেশনাল কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে বলেও শিহাব তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানায়।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলছেন, কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেফতারকৃত দুইজন, টুটুল হত্যায় জড়িত শিহাব এবং সর্বশেষ গ্রেফতারকৃত দুই মাদ্রাসা শিক্ষক বন্দুকযুদ্ধে নিহত শরিফুলের গ্রুপের সদস্য। তিনি আরও জানান, ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষকসহ নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাগুলোর অধিকাংশের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। এসব হত্যাকা-ে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশকেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও অনেকেই গ্রেফতারের বাইরে রয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিবির পূর্ব, মিডিয়া, দক্ষিণ ও পশ্চিম বিভাগের উপকমিশনার মাহবুব আলম, মাসুদুর রহমান, মাশরুকুর রহমান খালেদ ও সাজ্জাদুর রহমানসহ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: