২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চিনির দাম বাড়ছে, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির অভিযোগ


এম শাহাজাহান ॥ ঈদ সামনে রেখে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে চিনির দাম বাড়ানো হচ্ছে। দুর্বল বাজার মনিটরিং এবং বৈষম্যমূলক শুল্ক ধার্য্যরে কারণে ‘মনোপলি’ ব্যবসায়ে ঝুঁকি পড়ছেন মিলমালিকরা। মিল থেকে চিনি সরবরাহ কমে যাওযায় একদিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ১২০-২০০ টাকা পর্যন্ত। আর খুচরা বাজারে এই চিনি কিনতে একজন ভোক্তাকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৫-৬৮ টাকা। চিনি সঙ্কটের কথা জানিয়ে রাজধানীর কোন কোন বাজারে আরও বেশি দাম নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণায়ের তথ্যমতে, দেশে চিনির কোন সঙ্কট নেই। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (এপ্রিল পর্যন্ত) দেশে মোট চিনি আমদানি হয়েছে সাড়ে ১৭ লাখ টন। এ ছাড়া সরকারী চিনি কলগুলোতে রয়েছে আরও এক লাখ টন চিনি। আর পুরো বছরে চিনির চাহিদা মাত্র ১৫-১৬ লাখ টন। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, দেশী চিনি শিল্পকে রক্ষায় গত বছর আগস্টে চিনি আমদানির ওপর ২০ শতাংশ সংরক্ষণমূলক শুল্ক আরোপ করেছে সরকার। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে চিনি আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। এ কারণে চিনির দাম একটু বাড়লেও তা ৫০-৫৫ টাকার উপরে ওঠার কথা নয়। এরপরও দাম বেড়ে চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়। তিনি বলেন, দাম বৃদ্ধির জন্য যারাই দায়ী থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। রমজানে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আশা করছি, ন্যায্যদামেই পণ্য বিক্রি করবেন ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, বেসরকারী খাতে দেশে চিনি উৎপাদন করছে সিটি গ্রুপ, ফ্রেশ, ইগলু, দেশবন্ধু এবং এস আলম গ্রুপ। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করছে চিনির বাজার। রোজা ও ঈদ সামনে রেখে মিল সংস্কারের নামে উৎপাদন কমানোর পাশাপাশি চিনির সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারণে চিনির দাম বেড়েই যাচ্ছে। মিলগুলো থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারেও।

এ প্রসঙ্গে মৌলবী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ এবং চিনির পাইকারি ব্যবসায়ী হাজী মোহাম্মদ আলী ভুট্টো জনকণ্ঠকে বলেন, মিলগুলো চাহিদামতো চিনি সরবরাহ করছে না। তাদের একচেটিয়া ব্যবসায়ের কারণে ভোক্তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে। চিনির সঙ্কট দেখা দিয়েছে পাইকারি বাজারে। তিনি বলেন, ‘র’ (অপরিশোধিত) সুগার এবং ‘রিফাইন্ড’ (পরিশোধিত) সুগারের আমদানিশুল্ক সমান করা হলে মিলগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হবে। তিনি বলেন, ‘র’ সুগারের শুল্ক কম এবং রিফাইন্ড সুগারের শুল্ক বেশি হওয়ায় এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। শুল্কহার সমান করা হলে একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হবে এবং ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে চিনি কিনতে পারবেন। এছাড়া মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী কার প্রয়োজন বলেও দাবি করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

এদিকে মৌলভী বাজারে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হচ্ছে সিটি গ্রুপের চিনি, যা বিক্রি হচ্ছে প্রতিবস্তা (৫০ কেজি) ৩ হাজার ১২০ টাকা দরে। দু’দিন আগেও তা বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৯০০ টাকা দরে। এছাড়া ফ্রেশ ব্র্যান্ডের চিনি বিক্রি হচ্ছে প্রতিবস্তা ৩ হাজার টাকা দরে। ইগলু ও এস আলমসহ অন্য ব্র্যান্ডের চিনিও বাজারে একই দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার কারণে খুচরা বাজারেও চিনির দাম বেড়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাপ্তান বাজারের জামশেদ স্টোরের খুচরা বিক্রেতা মোঃ খায়রুল হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিবস্তা চিনিতে ১২০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। এতে করে খুচরা মূল্যেও কেজিতে বেড়েছে ২-৩ টাকা। তিনি বলেন, পাইকারি বাজারে চিনির দাম বেশি হলে খুচরা বাজারে দাম বাড়বেই।

জানা গেছে, দেশীয় শিল্প রক্ষায় চিনি আমদানিতে ইতোপূর্বে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একইসঙ্গে টনপ্রতি চিনি আমদানির ট্যারিফ মূল্য বৃদ্ধি করেছে সংস্থাটি।

ওই সময় প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, পরিশোধিত, অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক দিতে হবে। এছাড়া পরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি ট্যারিফ মূল্য ৪০০ থেকে ৪৩০ মার্কিন ডলার ও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে টনপ্রতি ট্যারিফ মূল্য ৩২০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলার করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই মূসক আরোপ ও ট্যারিফ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে।

জানা গেছে, অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে শুল্কহার কম হওয়ায় এখন আর পরিশোধিত চিনি আমদানি হচ্ছে না। ফলে মিলমালিকরা মনোপলি ব্যবসার সুযোগ নিচ্ছেন। বাড়ছে চিনির দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দু’ধরনের চিনি আমদানিতে শুল্কহার সমান করা হলে দাম নিয়ে কারসাজির হওয়ার সুযোগ কমে আসবে।

জানা গেছে, রোজার কয়েক দিন আগেও খুচরা দোকানে চিনি বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৫২ থেকে ৫৪ টাকায়। সেই একই চিনির দাম এখন দোকানগুলোতে ৬৫-৬৮ টাকা। সরকারী বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব মতে, গত মে মাসের শেষ সপ্তায় ঢাকায় প্রতিকেজি চিনির খুচরা দর ছিল ৫৬ টাকা। আর রোজা শুরুর সপ্তাহখানেক আগে হঠাৎ তা বেড়ে হয় ৬০ টাকা। আর এখন বাজারে চিনির দর আরও বেড়ে ৬৫-৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিল থেকে চিনির সরবরাহ না বাড়লে ঈদের আগে দাম আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মিলমালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নাকচ দিয়ে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, কারখানা থেকে ৪৮ টাকা ৭৬ পয়সা কেজি দরে চিনি বিক্রি করা হচ্ছে। তবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে কি না তা জানি না। তিনি বলেন, রোজায় প্রতিদিন দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টন চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: