২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১০ ফাল্গুন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে

প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০১৬
  • আমানতের সুদের হার হ্রাস এবং পুঁজিবাজার মন্দায় বিনিয়োগ বাড়ছে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) সময় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময় ছিল প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে ৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ায় সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ধার করেই প্রয়োজনীয় খরচ মেটাচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে অব্যাহতভাবে আমানতের সুদের হার হ্রাস এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে একটু বেশি লাভের আশায় সবাই ‘নিরাপদ’ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশে কার্যরত ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ৪৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের নগদায়নের ফলে যে পরিমাণ অর্থ তুলে নেয়া হয়েছে, তা মোট বিক্রি থেকে বাদ দিয়ে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৯২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল ২৬ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে নিট বিক্রি বেড়েছে ৩ হাজার ৫৩০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ অবস্থায় অর্থবছরের বাকি এক মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মূলত প্রতিদিন যে টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় তা থেকে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যেটা অবশিষ্ট থাকে সেটাকেই নিট বিক্রি বলে হিসাব করা হয়।

সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে থাকে। গত তিন বছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ব্যাপক উলম্ফন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাংক ব্যবস্থায় আমানতের ওপর সুদহার অনেক কমে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখার পরিবর্তে বাড়তি মুনাফার আশায় জাতীয় সঞ্চয়পত্র প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। এখানে বিনিয়োগ করে দ্বিগুণ মুনাফা পাচ্ছে তারা। সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার বিশেষ এ প্রকল্প চালু রেখেছে। যদিও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদহার থাকায় ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা নেতিবাচক মন্তব্য করে থাকেন।

তাদের মতে, আন্তঃব্যাংক কলমানি মার্কেটের সুদহার ৩ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। সরকারের ট্রেজারি বন্ডেও সুদহার আড়াই থেকে ৩ শতাংশ বিরাজ করছে। ব্যাংকগুলোর আমানতে সুদহার ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এমতাবস্থায় প্রায় দ্বিগুণ সুদহারে আমানত সংগ্রহ করা অনুচিত। আর সরকার যে গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এই উচ্চ সুদহার রেখেছে, তারা প্রকৃতপক্ষে এই সুযোগ নিতে পারছে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সম্পদশালী উচ্চ মুনাফার আশায় নামে-বেনামে সঞ্চয়পত্র কিনে রেখেছে। অপরপক্ষের দাবি, দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনও ৬ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। সে হিসেবে বছর শেষে ব্যাংকে সঞ্চয়কারীর প্রকৃত অর্থ কমে যাচ্ছে। বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডিও দেশের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সুদহার না কমানোর সুপারিশ করেছে। এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে জানান, চলতি অর্থবছরেই সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন প্রকল্পের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদহার কমানো হয়েছে। এরপর আবারও কমালে সাধারণ সঞ্চয়কারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই মুহূর্তে সুদহার কমানো ঠিক হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে তার থেকে বেশি পরিশোধ করেছে। ফলে সরকারের নিট ঋণ কমেছে ৯ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র বিক্রি উলম্ফন থাকায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকবহির্ভূত ‘অন্যান্য’ উৎস থেকে নেয়ার কথা ছিল তিন হাজার কোটি টাকা।

সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। যার মধ্যে কেবল সঞ্চয়পত্র থেকেই অর্থবছরের ১১ মাসে সাড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ চলে এসেছে। আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি হওয়ায় বিক্রি হু হু করে বেড়ে চলেছে। এর ফলে সরকারের সুদব্যয়ও বাড়ছে।

বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদী পারিবারিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদী পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদী তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদী ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং পাঁচ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ হারে সুদ পাওয়া যাচ্ছে। অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত বলেন, সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের অন্য সব পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে বলা চলে।

ব্যাংকে টাকা রাখলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। শেয়ারবাজারের অবস্থা তো দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। তাই বেশি মুনাফা পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকছে মানুষ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস’র ওই গবেষক বলেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে ঋণ করাই সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। সরকার এর মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষদের সঞ্চয়মুখী করতে চেষ্টা করছে। তবে এ খাতের সুদের হার বেশি। তা ছাড়া এ খাতে অনেক অপ্রদর্শিত অর্থও ঢুকে পড়ছে। যেগুলো ভালভাবে দেখভাল করা উচিত।

প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০১৬

২৮/০৬/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: