১২ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বিএনপি নেতার বাড়ির বোমা কারখানার নেপথ্যে চোরাচালান!


ডি. এম. তালেবুন নবী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ॥ একেবারে দুর্গম বিচ্ছিন্ন ভয়াল পদ্মাপারের ইউনিয়ন নারায়ণপুরের একটি বাড়িতে বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণে একাধিক ব্যক্তির আহত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে থলের বিড়াল। ঘটনার অনেক নেপথ্য কাহিনী সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। ঘটনাটি ২৩ জুন বৃহস্পতিবার গভীর রাতের। নির্বাচনে একজন বিএনপিপন্থী ইউপি সদস্য হুমায়ুনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এই বিস্ফোরক নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনে তেমন কোন আলোড়ন সৃষ্টি না হলেও নানা প্রচ্ছন্ন তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপি নেতার বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে বলা হয়েছে, পাঁচজন গুরুতর আহত। আহতরা হচ্ছে সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউপির রুস্তম ম-লপাড়ার বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবিরের ছেলে সুমন ওরফে শাকিল (২২), মনিরুলের ছেলে জসিম (২৩) ও চরবাগড়াঙ্গা ইউপির গড়াইপাড়া গ্রামের মাজেদ আলির ছেলে আরিফ (৪০), তার সহোদর জাহিদ (৪৫) ও আজিজুর রহমানের ছেলে আনোয়ার হোসেন। আসলে আহতদের সংখ্যা মোট কতজন তার কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই কোন তরফ থেকেই। কারণ ইতোমধ্যে হুমায়ুনের পুরো পরিবারসহ গ্রামের কোন পুরুষ লোক বাড়িতে নেই। পালিয়েছে এলাকা ছেড়ে। আহতদের তিনজনকে গোপনে রাজশাহী নিয়ে গিয়ে একটি বেসরকারী ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অবস্থা বেগতিক দেখে তাদের রাজশাহী মেডিক্যালে নিয়ে যায়। এর মধ্যে টিম লিডার শাকিল ওরফে সুমনের ডান হাতের কবজি, আরিফের বাম হাতের কবজি উড়ে যায়। জাহিদুলের শরীর একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। অপর দু’জন গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছে। কিন্তু একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে বোমা বিস্ফোরণে ঝলসে যাওয়া কিংবা ক্ষত বিক্ষত হয়ে হাত-পা উড়ে যাওয়া বা বিচ্ছিন্ন হবার সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের দ্রুত ভারতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছে বলে এলাকাজুড়ে গুজব রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ভারতের যাবার যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ভাল ও নিরাপদ। প্রশ্ন উঠেছে এসব বিশাল পরিমাণের বোমা কার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতো? কারণ ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ইতোমধ্যেই ৫১টি তাজা বোমা বা ককটেল, বোমা তৈরির বিশাল পরিমাণ সরঞ্জামসহ দুইজনকে আটক করেছে। অভিযোগ রয়েছে বিএনপি জামায়াত সমর্থক বোমা তৈরির গ্রুপটির প্রশিক্ষিত সদস্য সংখ্যা শতাধিক। এদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে ইউপি সদস্য ও ইউপি বিএনপির সহসভাপতি হুমায়ন কবিরের ছেলে শাকিল ওরফে সুমন (২৮)। ১০-১৫ জনের একটি দল বোমা তৈরি করছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই ইউপিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বিরোধ চলে আসছিল। বিরোধের অন্যতম কারণ একটি সচল ভারতীয় গরু আসার বড় ধরনের রুট। পথে আনতে গিয়ে প্রায় সময়ে গরু ছিনতাই, জহুরপুর বিটের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ভাগাভাগি ও স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহজুড়ে বাগপাড়া ও রুস্তম ম-লের পাড়ায় প্রতি রাতে এমনকি দিনেও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে আসছে। তারা গরু নির্বিঘেœ বহনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বোমা ফাটিয়ে থাকত। উল্লেখ্য, নানান চাপে প্রশাসন এখানে একটি গরু করিডর বা জহুরপুর বিটকে গরু আনার অনুমতি দিয়ে রেখেছে। কিছুদিন আগে এই বিট লিজ দেবার ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সদর উপজেলা প্রশাসনের টানাপোড়নের একটি সংবাদ স্থানীয় একটি পত্রিকায় বের হরে তোলপাড় পড়ে যায়। জেলা প্রশাসক নাখোশ হয়ে কিছু উল্টোপাল্টা বক্তব্য দেয়া শুরু হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রতিবাদে জেলা প্রশাসনের সকল প্রকারের সংবাদ প্রকাশ বর্জন করলে পরিস্থিতির অবনতি হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি মীমাংশাও হয়ে যায়। উল্লেখ্য, নারায়ণপুর ইউপির বর্তমান বিএনপিপন্থীরা টার্গেট করে এক আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক পাতানকে। বিএনপি নেতা হুমায়ুন ও আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক পাতান উভয়ে উভয়ের প্রতিপক্ষ হয়ে এলাকা উত্তপ্ত করে রেখেছে। অভিযোগ রয়েছে কয়েক বছর ধরে উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন জেলায় বোমা ও ককটেল হামলার পুরো রসদ সরবরাহ হয়েছে এই দুর্গম চর নারায়ণপুর থেকে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গত তিন বছরে সন্ত্রাসী কর্মকা-ে কোন ব্যক্তিকে এই ইউপি থেকে আটক করেনি। নারায়ণপুর দুর্গম বিচ্ছিন্ন এলাকা হলেও এখানে সব সময় একাধিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন গিজগিজ করে। কারণ এখানে রয়েছে গরু আনার একটি বৈধ রুট। যার প্রতিদিনের অবৈধ আয় প্রায় ১০ লাখ টাকার ওপর। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ভাগ বাটোয়ারা হয়ে থাকে ক্ষমতাধর আইন প্রয়োগকারী সদস্য ও কোন কোন ক্ষেত্রে তথাকথিত সাংবাদিকও রয়েছে। এছাড়াও অবৈধ টাকার বাটোয়ারার তালিকায় প্রভাবশালীরাও রয়েছে। এসব কারণে কোন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এখানে আইন প্রয়োগে তেমনভাবে তৎপর হয়ে উঠে না। সবার জিজ্ঞাসা এখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে বোমা হামলা বা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও আগাম কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাই এবার প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক তুফান ও তার দলবলকে নির্মূলে বিএনপি নেতা হুমায়ুনের বাড়িতে বিশাল পরিমাণ বোমা তৈরি করা হচ্ছিল। এমনটাই স্থানীযভাবে জানা গেছে। তারা সফল হলে (বিএনপি) এবার স্থানীয় আওয়ামী লীগ বেকায়দায় পড়ত। এখানে উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিন এই ইউপি বিএনপির নিয়ন্ত্রণে ছিল। মধ্যখানে লোকাল এমপি বিএনপি থেকে ভাগিয়ে এনে এক বিএনপি নেতা এ্যাডভোকেট আলমীগর কবিরকে আওয়ামী লীগ বানিয়ে চেয়ারম্যান করেছিল। এই নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এবারও পূর্বের পথ অনুসরণ করে বিএনপি থেকে আসা আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট আলমগীর কবিরকে নৌকার প্রতীক দিয়ে মাঠে নামানো হলেও এবার আর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতা হুদার কাছে টিকতে পারেনি। তাই নতুন করে এই ইউনিয়নে মেরুকরণ শুরু হয়েছে। গরু করিডর হতে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা আসার কারণে এখানে অপরাধী বা নাশকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল বা ব্যক্তিরা রয়েছে নিরাপদ দূরত্বে। এদের অর্থের কাছে সবাই আত্মসমর্পণ করে মাঝপথ দিয়ে চলার চেষ্টা করে। অভিযোগ রয়েছে আইন প্রয়োগকারীরা ২৩ জুন বৃহস্পতিবার গভীর রাতের বোমা বানানোর কারখানার খবর কি জানত না? তানা হলে বিএনপি নেতার বাস ভবনে এ ধরনের বোমা তৈরির কারখানা বানাবার সাহস কে যোগান দিয়েছে? বড় ধরনের নিরপক্ষ তদন্ত (যাতে চাঁপাইয়ের কেউ থাকবে না) করলেই বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: