২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকায় অর্থ পাচার হচ্ছে


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৮ কোটি ডলার। টাকার অঙ্কে যা ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২০ কোটি। মোট পাচার হওয়া অর্থের ৮৮ শতাংশই হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমদানি করা পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে অর্থ বাইরে পাচার করা হয়। মুদ্রার অতি মূল্যায়নের কারণেও অর্থপাচার বেড়েছে। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাবে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও অর্থ পাচারের অন্যতম কারণ। সবচেয়ে বেশি পরিমাণে টাকা পাচার বেড়েছে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে। এজন্য অর্থপাচার রোধে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ নিশ্চিত করার জন্য প্রাইস কমিশন গঠন করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘অর্থপাচার: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক ডায়ালগে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থান করেন সিপিডি’র রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে টাকা পাচারের পরিমাণ বাড়ে, এ ছাড়া দেশের ভেতরে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা থাকলে এবং বিনিয়োগের সুযোগ না থাকলে তখনও টাকা পাচার বাড়ে। ঘটনাক্রমে এই তিনটি কারণই ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে বিদ্যমান। এ কারণেই অব্যাহতভাবে বছরের পর বছর টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। সিপিডি’র মতে, গত দুই অর্থবছরে সুইস ব্যাংকসমূহে বাংলাদেশীদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে। এই অর্থও পাচার করা। আবার মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচীতে গত ১৩ বছরে ৩ হাজার ৬১ বাংলাদেশী অর্থ পাঠিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এর চেয়ে বেশি মানুষ গেছে চীন ও জাপান থেকে। এর বাইরে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব নেয়ার সুযোগ নিচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশী। সিপিডির হিসাবে, ২০১৩ সালে পাচার হওয়া অর্থ দেশের শিক্ষা বাজেটের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ গুণ বেশি, আর স্বাস্থ্য বাজেটের তুলনায় ৮ দশমিক ২ গুণ বেশি । পাচার হওয়া ওই অর্থের ২৫ শতাংশ হারে যদি কর পাওয়া যেত তাহলে স্বাস্থ্য বাজেট তিন গুণ এবং শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ করা সম্ভব হতো। সিপিডি তুলনা করে আরও দেখিয়েছে, ওই সময়ে পাচার হওয়া অর্থ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ওই সময়ে বাংলাদেশের পাওয়া মোট বৈদেশিক সাহায্যের ৩৪০ শতাংশের সমান। জিএফআইয়ের গবেষণা তুলে ধরে সিপিডি বলছে, মোট পাচার হওয়া অর্থের ৮৮ শতাংশই হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমদানি করা পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে অর্থ বাইরে পাচার করা হয়। সিপিডি এ বিষয়ে গবেষণা করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু উদাহরণ দিয়েছে। যেমন, ২০১৪ সালের মার্চে সাড়ে ৫৪ শতাংশ আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা একটি রেকর্ড। এ সময়ে কেবল পুঁজি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ৭৩ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি। আবার এ সময়ে ফ্রান্স থেকে কেবল ক্রেন (পণ্য ওঠানো-নামানোর যন্ত্র) আনা হয়েছে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের। পুঁজি যন্ত্রপাতি হিসেবে এর শুল্ক মাত্র ২ শতাংশ। ২০১৫ সালেও পুঁজি যন্ত্রপাতির দাম বেশি দেখানো হয়েছে। সিপিডির দেয়া আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ২০১৩-১৫ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে যত চাল বিদেশ থেকে আনা হয়েছে, তার আমদানি মূল্য ছিল টনপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ডলার। অথচ এ সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের গড় মূল্য ছিল টনপ্রতি প্রায় ৫০০ ডলার। সিপিডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের উদ্যোগে তৈরি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজি) হিসাবও। ২০০৩ সালে ফাঁস করা তথ্য অনুযায়ী, অফসোর ব্যাংকিংয়ের সুবিধা নিয়ে অন্য দেশে ব্যাংক হিসাব খোলার সংখ্যা ৩৪টি। আর চলতি বছর ফাঁস করা পানামা পেপারস অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ২৭টি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবিএম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থ পাচারের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব অন্যতম কারণ। এ ছাড়া দেশের ভেতরে নিরাপত্তার অভাববোধও একটি কারণ। বিদেশে অর্থ পাচাররোধে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, অপরাধীদের দৃশ্যমান শাস্তি, ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে বিদেশে টাকা পাঠাতে না দেয়া ও শেয়ারবাজার থেকে টাকা সংগ্রহের পর তার সঠিক ব্যবহার নিয়ে যথাযথ তদারকির প্রয়োজন।