২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

ক্রসফায়ার বিতর্ক


‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি অনেক আগেই তার মূল অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও ক্রসফায়ারকে এখন মোটামুটি সমার্থক করে ফেলা হয়েছে, যা রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। দেশের অন্যতম প্রধান একটি দৈনিক গত ২০ জুন প্রথম পৃষ্ঠায় ২০০৪ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার বছরভিত্তিক একটা পরিসংখ্যান ছেপেছে। তাতে দেখা যায়- ক্রসফায়ারে সবচাইতে বেশি নিহতের ঘটনা ঘটেছে ২০০৫ সালে, ৩৫৪ জন। পরবর্তী সর্বোচ্চ সংখ্যা ২০০৬ সালে, ২৫৮ জন। এরপর ক্রমেই ক্রসফায়ারে নিহতের সংখ্যা কমে আসে। ২০১৬ সালে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৫৯ জন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, প্রতিটির ভিন্ন সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- হলো- সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে অকারণ (টহঢ়ৎড়াড়শবফ) পরিস্থিতিতে কাউকে হত্যা করা, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বেআইনী। এটা জননিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-।

২০১৫ সালের প্রথম দিকে এক নাগাড়ে ৯২ দিন অবরোধের নামে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে প্রায় দেড় শ’ মানুষকে নিদারুণ অমানবিকভাবে হত্যা করা হয়। এটা স্বল্প সময়ের মধ্যে এযাবতকালের সর্বোচ্চসংখ্যক বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-। সুতরাং শুধুমাত্র ক্রসফায়ারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের ভয়াবহতা সঠিকভাবে চিত্রিত হয় না এবং ক্রসফায়ারও তার সত্যিকার অর্থ হারায়। ক্রসফায়ার নতুন কোন বিষয় নয়, সব ক্রসফায়ারই বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- নয়। যেদিন থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের সৃষ্টি হয়েছে সেদিন থেকে ক্রসফায়ারের বিষয়টি ঘটে চলেছে। অস্ত্রের সঙ্গে সংঘর্ষের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ের হাতে যখন আগ্নেয়াস্ত্র তখন অস্ত্রের সংঘর্ষ অবশ্যম্ভাবী। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন অস্ত্র ব্যবহার করে তখন কোন্টি বৈধ, আর কোন্টি বৈধ নয় তা বিচার্য হয় পরিস্থিতির ওপর এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনসিদ্ধভাবে অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে কিনা তার ওপর। সুতরাং অস্ত্রের ব্যবহার মানেই সেটা আইনবিরুদ্ধ নয়। বাংলাদেশের জঙ্গীদের কাছে আধুুনিক অস্ত্র রয়েছে এবং পুলিশ ও জঙ্গীদের মধ্যে সংঘর্ষের সচিত্র প্রতিবেদন বহুবার দেখা গেছে। সংঘর্ষে দুই পক্ষেরই যে কোন ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে এবং অস্ত্রের কার্যকরী দূরত্বের ওপর নির্ভর করে তাতে কাছে বা দূরের তৃতীয় পক্ষের কেউ নিহত-আহত হতে পারে। তাই কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাছবিচার ব্যতিরেকে ঢালাওভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের অভিযোগ তোলা হলে জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রের ব্যবহারের ওপর সিআরপিসিতে স্পষ্টভাবে জঁষবং ড়ভ ঊহমধমবসবহঃং বা বিধি লিপিবদ্ধ আছে। পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল ১৯৪১, অনুসারে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটার পর প্রতিটির বেলায় ম্যাজিস্ট্রিয়াল বা বিচারিক তদন্ত হওয়ার কথা এবং হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। উল্লিখিত রুলস বা বিধি মানা না মানার ওপর নির্ভর করছে কোন্টা বৈধ, কোন্টা অবৈধ। বৈধভাবে অস্ত্রের ব্যবহারে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটলে সেটাকে তখন একেক দেশে একেক রকম আখ্যায়িত করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এটাকে বলা হয় ঔঁংঃরভরধনষব ঐড়সরপরফব বা বিধিবদ্ধ হত্যাকা-। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধে প্রায় চার শ’ থেকে সাড়ে চার শ’ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গণতন্ত্র মানবাধিকারের মডেল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেও প্রতি বছর বহুসংখ্যক ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে আজ ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- সমার্থক হওয়ার পেছনে পুলিশ বাহিনীর অপেশাদারিত্ব এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঠিক মনিটরিংয়ের অভাব আছে বলে মনে হয়। বিধি মোতাবেক সব ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত হলে এবং তার সারাংশ জনগণের সামনে তুলে ধরলে এ রকম বিভ্রান্তির সুযোগ কমে যেত।

বাংলাদেশের জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি আজ ধর্মান্ধ উগ্র জঙ্গী গোষ্ঠী। এই জঙ্গীরা সম্প্রতি নারীসহ নিরপরাধ-নিরীহ মানুষকে যেভাবে হত্যা করছে তাতে তারা বর্র্বরতারও সকল সীমা লঙ্ঘন করছে। তাদের আর মানব সন্তান বলা যায় না, তারা দানব ও দানবীয় শক্তির প্রতিনিধি। সুতরাং দানবের জন্য কোন রকম মানবিক বিবেচনা প্রযোজ্য হতে পারে না। মানবতাকে রক্ষা করার জন্য এদের কঠিনহস্তে নিষ্ঠুরভাবে দমন ও নির্মূল করা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবতা বড় কঠিন ও বিচিত্র। এই জঙ্গী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার জায়গায় রয়েছে অনেক ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক পক্ষ, তারা সকলেই আবার অন্য বড় রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে জোটসূত্রে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ। সুতরাং জঙ্গীদের রাজনৈতিক পক্ষ ও তার মিত্ররা জঙ্গীদের সম্পর্কে রাজনৈতিক বক্তব্য দেবে, জঙ্গীদের ব্যবহার করে, রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করতে চাইবে এবং এসবের জন্য নানা অজুহাত ও ছদ্মবেশে জঙ্গীদের আড়াল করার চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাই কারা জঙ্গী, কোথায় তার উৎপত্তিস্থল, সব অকাট্যভাবে দেশের উচ্চ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার পরেও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে, এখনও আবার মিথ্যা সত্যের সঙ্গে মিশ্রিত করে ওই সব রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের সুবিধাভোগীরা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও তাদের মিত্র পক্ষ দীর্ঘ দিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। সঙ্গত কারণেই সে সময়ে এই জঙ্গীদের মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পুলিশসহ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গনে ঢুকেছে। তারা ঘাপটি মেরে থাকলেও সুযোগ মতো জঙ্গীদের যে সহযোগিতা করছে না, তাও তো ভাবা যাচ্ছে না।

সুতরাং কোথা থেকে কি হচ্ছে তা সব সময় বলাও কঠিন। ক্রসফায়ার নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে পুলিশের অপেশাদারিত্বের সুযোগে পশ্চিমা বিশ্বের টাকায় পুষ্ট কিছু এনজিও কর্তারও সব সময় মাঠে দেখা যায়। একটা ঘটনার বহুবিধ কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে, ম্যাজিস্ট্রিয়াল তদন্তের জন্য অপেক্ষা না করে ক্রসফায়ারের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যখন তারা শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার মতো কথা বলেন তখন তা অতি জ্যোতিষীমূলক মনে হয়, যা রাষ্ট্রের জননিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। ক্রসফায়ারে সন্ত্রাসী-জঙ্গী মারা পড়তে পারে এই ভয়ে আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনের সময়ে অস্ত্রের ব্যবহারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে, দ্বিধান্বিত হলে তাতে অবশ্যই জঙ্গী-সন্ত্রাসীরাই লাভবান হবে। জঙ্গীরা এটাই চায়। বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ হত্যার ফেরারি আসামি ও পত্রিকায় নাম ছবিসহ ঘোষিত আসামি শরীফ ওরফে মুকুল রানা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী গত দুই বছর শরীফের জীবনযাপন কর্ম ছিল অস্বাভাবিক এবং এলোমেলো। শরীফের পিতা-মাতা ও শরীফ ঢাকায় কোথায় কি কাজ করে তা সঠিকভাবে বলতে পারে না। জানা যায়, গত দুই বছর ঢাকা থেকে নিজ বাড়ি সাতক্ষীরায় যখন গেছে তখন আগের মতো সে কারোর সঙ্গে মেলামেশা করত না, সকলকে এড়িয়ে চলত। শরীফের স্ত্রীর ভাই একজন জঙ্গী দলের সদস্য হওয়ায় গ্রেফতার হয়ে জেলে আছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে শরীফ নিখোঁজ হয় বলে তার পরিবার থানায় জিডি করে এবং প্রচার করে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয়েছে। গত ১৯ মে অন্য জঙ্গীদের সঙ্গে শরীফের ছবি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পরেও তার পরিবারের কেউ পুলিশের সঙ্গে যোগযোগ করেনি। নাম ভিন্ন হলেও ছবি দেখে তো পরিবারের সদস্যরা তাকে চেনার কথা। সব আলামতই বলে শরীফ ওরফে মুকুল রানা কোন জঙ্গী দলের সদস্য ছিল। পুলিশ বাহিনীকে দুর্বল করার জন্য জঙ্গীরা বহুমাত্রিক কৌশল অবলম্বন করছে। তাই এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, জঙ্গীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কিডন্যাপ নাটক সাজিয়েছে যাতে সে নিহত হলে প্রচার পায় শরীফকে পুলিশ গ্রেফতারকালীন অবস্থায় হত্যা করেছে। উদ্দেশ্য পুলিশের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ ও অনাস্থা বৃদ্ধি করা। তাছাড়া আরেকটি কথা তো বহুল প্রচারিত যে, সন্ত্রাসী দলের কেউ ধরা পড়লে পুরো দলের তথ্য ফাঁস হওয়া রোধ করার জন্য নিজেরাই গ্রেফতার হওয়া সঙ্গীকে হত্যা করতে দ্বিধা করে না। সুতরাং বাছবিচার না করেই যারা ঢালাওভাবে বলেন প্রতিটি ঘটনাই বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

পরাশক্তিসহ পশ্চিমাদের ছাড়া লোক বাংলাদেশে অভাব নেই। জঙ্গী নিয়ে এখন দেশী-বিদেশী চক্রান্ত চলছে তাও স্পষ্ট। আর পাকিস্তান তো দেদার অগণিত টাকা ছড়াচ্ছে জঙ্গীদের পেছনে। বাংলাদেশের জঙ্গীদের সহায়তা করার অভিযোগে পাকিস্তান দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তা প্রত্যাহৃত হয়েছে। জঙ্গীদের টাকা বিলি করার রসিদসহ ধরা পড়ে পাকিস্তান দূতাবাস কর্মকর্তা মাযাহার খান। সে সময়ে পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছিল মাযহার খানের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক লোকের যোগাযোগ রয়েছে। কয়েকজনের নামও তখন পত্রিকায় এসেছিল। পাকিস্তানী গোয়েন্দা ফান্ডের টাকা বাংলাদেশে কার পকেটে কত পড়ছে তার খোঁজখবর নেয়া দরকার। সুতরাং আজ যারা বাছবিচার না করে সব ক্রসফায়ারের ঘটনাকেই ঢালাওভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বলছে তারা কারও বন্ধু হতে পারে সেটা ভাবলে শঙ্কা বাড়ে। রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার জন্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে জঙ্গীরা উৎসাহিত হয় জঙ্গীদের উদ্দেশ্য সাধিত হয় বা পুলিশের কার্যক্ষমতা কমে যায় এমন সব কথাবার্তা বলার সময় সকলেরই সতর্ক হওয়া উচিত।

লেখক : ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক