১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ইইউ প্রশ্নে ব্রিটেনে গণভোট


ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে, নাকি তা থেকে বেরিয়ে যাবে সেটা নির্ধারণের জন্য আগামী ২৩ জুন সেদেশে জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিটিশ জনগণের এক উল্লেখযোগ্য অংশ ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসা নয়ত এর সদস্য পদের শর্তাবলীর আমূল সংস্কার করা উচিত বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিমত প্রকাশ করে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অঙ্গীকার করেছিলেন যে, ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে জিততে পারলে তিনি পরের বছর এই প্রশ্নে গণভোট দেবেন।

গণভোটের কেন প্রয়োজন হচ্ছে

ব্রিটিশ রক্ষণশীল দল, ইউকে ইন্ডিপেন্ডেন্স পার্টি ও অন্যরা দীর্ঘদিন ধরে গণভোটের দাবি জানিয়ে এসেছে। তাদের যুক্তি, ব্রিটেনরা ১৯৭৫ সালে এক গণভোটে ইইউতে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিল। তারপর থেকে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সংস্থাটি ব্রিটেনদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। তাই আজ সময় এসেছে তাদের অভিমত প্রকাশের। সময় এসেছে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ইউরোপীয় প্রশ্নটির নিষ্পত্তি করার।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদারী সংস্থা। এর নিজস্ব পার্লামেন্ট, নিজস্ব মুদ্রা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়মকানুন আছে। জাতীয় আইন পরিবর্তন করার ও সেটাকে ইউরোপীয় মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ক্ষমতাও ইইউর রয়েছে। সেই হিসেবে ব্রিটেনের শতকরা ৫৫ ভাগ আইনকানুন এখন ইউরোপ কর্তৃক নির্ধারিত। ব্রিটিশরা এ কারণে বিশেষভাবে রুষ্ট। তারা মনে করে যে এতে তাদের জাতীয় কর্তৃত্ব খর্ব হয়েছে। এভাবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব খর্ব করার বিনিময়ে ইইউতে থেকে যাওয়ার স্ট্র্যাটেজিক সুবিধাটা বেশি কিনা তা নিয়ে তাদের সংশয় আছে। সেজন্য তাদের একটা বড় অংশ সংস্থা থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসার পক্ষপাতী।

ক্যামেরন যা করেছেন

ইতোমধ্যে ক্যামেরন ব্রিটেনের সদস্যপদের শর্তাবলী পরিবর্তনে ইইউর অন্যান্য নেতার সঙ্গে একটা মতৈক্য আদায় করেছেন। তিনি বলেছেন যে, গণভোটে ব্রিটেনরা যদি ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে রায় দেয় তাহলে ওই সমঝোতা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। সেই সমঝোতায় ইইউতে ব্রিটেনকে এক বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এই সমঝোতার মাধ্যমে ইইউ সম্পর্কে ব্রিটিশ জনগণের অপছন্দের কিছু কিছু বিষয়ের নিষ্পত্তি হবে। যেমন বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর আগমণ এবং নিজেদের বিষয় পরিচালনার ক্ষমতা বিসর্জন দেয়া। চুক্তিটা হাতে থাকায় ক্যামেরনের সুবিধা হয়েছে। কারণ এতে যেসব ছাড় তিনি আদায় করেছেন তার ভিত্তিতে বলতে পারবেন যে ইইউর ভেতরে আমরা নিরাপদ থাকব, শক্তিশালী থাকব এবং অধিকতর ভাল থাকব। বলাবাহুল্য ক্যামেরন চান ব্রিটেন ইইউতেই থেকে যাক। গণভোটের আয়োজন করতে গিয়ে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য তার হাসিল হয়েছে। যেমন-এর মধ্য দিয়ে তার একটি নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ। দ্বিতীয়ত ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা আদায় এবং তৃতীয়ত এসবের মধ্য দিয়ে ইউরোপ ইস্যুতে কয়েক দশক ধরে তীব্রভাবে বিভক্ত তার রক্ষণশীল দলের দুই উপদলকে ঐক্যবদ্ধ করা।

গণভোটে ফল কি হবে

ইইউতে থাকা না থাকা নিয়ে ব্রিটিশ জনমত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। তবে এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে থাকার পক্ষে রয়েছে শতকরা ৪৪ ভাগ এবং বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ৪২ ভাগ নাগরিক। ১৪ শতাংশ কোন সিদ্ধান্ত জানায়নি। ধারণা করা হচ্ছেÑ গণভোট ক্যামেরনের জন্য অস্বাচ্ছন্দ্যকর রকমের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। মোট প্রদত্ত ভোটের ভিত্তিতে সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে।

ব্রিটেন ইইউতে থেকে গেলে ভাল। আর বেরিয়ে গেলে ইউরোপ ও বিশ্বব্যবস্থার উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। ব্রিটেন ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। এর রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং বহির্বিশ্বের ওপর প্রভূত প্রভাব। ব্রিটেন বেরিয়ে গেলে একই ধরনের সিরিজ ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। ইউরোপের অন্যান্য সদস্য দেশও বেরিয়ে যাবার কথা ভাবতে পারে। আবার অনেক সদস্য দেশের মধ্যে এমন আশঙ্কা দেখা দিতে পারে যে ব্রিটেন ইউনিয়নে না থাকার ফলে তারা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে জার্মানির দ্বারা পদানত হবে। এতে ওই সকল দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে নিরাপত্তাগত হুমকি দেখা দেবে।

ব্রিটেনের মানুষ মনে করে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের পেছনে টেনে ধরছে। এই সংস্থা তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যাধিক সব নিয়মকানুন আরোপ করে থাকে এবং সদস্যপদের জন্য বছরে কয়েক শ’ কোটি পাউন্ড আদায় করে নেয়। অথচ বিনিময়ে তারা তেমন কিছুই পায় না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেনের রয়েছে প্রেম ও ঘৃণার দীর্ঘদিনের এক সম্পর্ক। ইউরোপে থেকেও ইউরোপ থেকে ইতোমধ্যেই বিচ্ছিন্ন ব্রিটেন। যেমন ব্রিটেন ইউরো মুদ্রা অঞ্চলের সদস্য নয়। তার নিজস্ব মুদ্রা, পাউন্ড স্টালিং যথারীতি বহাল আছে। তেমনি ব্রিটেন বিনা পাসপোর্টে চলাচলের সুযোগ সংবলিত সীমান্তমুক্ত শেনঝেন অঞ্চলেরও সদস্য নয়। গত মাসে লন্ডন সফরকালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, আগামী ২৩ জুনের গণভোটের রায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গভীর আগ্রহের বিষয়। তিনি ব্রিটেনদের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, ব্রিটেন ইইউর সদস্য থাকলে সংস্থার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমন উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর হবে। এমন মন্তব্য করার জন্য কিছু কিছু ব্রিটিশ নেতা ওবামাকে ভর্ৎসনা না করে ছাড়েননি। যেমন লন্ডনের মেয়র বলেছেন তার এই ভূমিকা ‘বিকৃত মানসিকতা।

আমেরিকার কেন মাথাব্যথা

যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ইউরোপ দেখতে চায়। ইদানীং ওয়াশিংটন-লন্ডন বিশেষ সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়া সত্ত্বেও ব্রিটেন আমেরিকার প্রধান ট্রান্সলান্টিক সামরিক মিত্র রয়ে গেছে এবং ইউরোপে এর ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই ব্রিটেন যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে ইইউ খ-িত হয়ে যাবে। ভেঙ্গে পড়বে, আমেরিকার মিত্ররা হয়ে পড়বে দুর্বল এবং এতে করে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে বলে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করেন।

মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব পড়বে

ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলে সংস্থাটি ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। তাতে আমেরিকার দক্ষিণপন্থী শিবিরের অনেক রক্ষণশীল ব্যক্তিবর্গের একঘরে দৃষ্টিভঙ্গি জোরদার হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রজানীতিকরা তখন নিজের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সাফাই গেয়ে বলতে পারবেন যে, ইউরোপ দুর্বল ও এর প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক যুগের বাস্তবতা মোকাবেলা করতে অক্ষম।