২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

কোচ ছোটনের বড় কীর্তি...


গোটা কয়েক প্রবাদ প্রবচন দিয়েই শুরু করা যাক এই লেখাটির ভূমিকা। ‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল; গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল’, ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’, কষ্ট করিলে কেষ্ট মেলে’, ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ ... এমনি আরও কত কি। এই প্রবাদ প্রবচনগুলোর প্রতিটিই এখন খাটছে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির বেলায়। কে তিনি? তিনি আর কেউ নন, গোলাম রব্বানী ছোটন। নামটি ছোটন হতে পারে, কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে যা করছেন, তাতে তার কীর্তি কিন্তু যথেষ্টই বড়! কথায় আছে, ‘নামে নয়, কাজে পরিচয়।’ ছোটনও তাই, কথা বলেন কম। কাজই করেন বেশি। আর সেই কাজের বেশিরভাগই মুখ দেখেছে সফলতার। তাতে নিজে তো বটেই, গবির্ত ও উজ্জ্বল করেছেন গোটা দেশের মানুষকেই।

মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে যিনি দু’-দুবার একটি দলকে শিরোপা জেতাতে পারেন দ্রোণাচার্য হিসেবে, তাকে নিয়ে এমন ভূমিকা লেখাই যায়। বাংলাদেশের মহিলা ফুটবলের দায়িত্ব যেদিন থেকে নিয়েছেন, সেদিন থেকেই মহিলা ফুটবল উন্নতির সোপান বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে তরতর করে এবং সেটা খুব দ্রুতই। আর এটাই বিস্ময়কর ব্যাপার। কেননা, সাত আট বছর আগেও এদেশের মহিলা ফুটবল ছিল আঁতুরঘরে। ফুটবলারদের খেলা দেখে সবাই হাসাহাসি করতো। আর এখন? মুগ্ধ হয়ে দেখে, তালি বাজায় এবং তাদের সমর্থনে গলা ফাটায়! এটাই সত্য, এটাই বাস্তবতা। আর এই আকাশ কুসুম স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার নেপথ্য কারিগর হচ্ছেন গোলাম রব্বানী ছোটন। তার সাফল্যেই আজ এদেশের ফুটবলপ্রেমীরা সুনীল স্বপ্ন দেখছে এদেশের মহিলা ফুটবলাররা আগামীতে ফিফা অনুর্ধ-১৭ এবং ২০ মহিলা বিশ^কাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে হলেও এই লক্ষ্যের কথা শুনলে সবাই হাসি-তামাশা করে উড়িয়ে দিত, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়াটা মোটেও অসম্ভব নয় বলেই মনে করছেন ফুটবলবোদ্ধারা।

২১ ডিসেম্বর, ২০১৫। নেপাল থেকে বাংলাদেশ বালিকা জাতীয় দল ফিরেছিল ‘এফসি অনুর্ধ-১৪ বালিকা চ্যাম্পিয়নশিপে’র শিরোপা জিতে। দলের কোচ ছোটন বলেছিলেন, ‘ফাইনালের আগে এত বেশি টেনশনে ছিলাম যে, টানা দুই রাত ঘুমাতেই পারিনি। তবে তাই বলে ঘুণাক্ষরেও নিজের এই উদ্বেগ ভাবটা দলের খেলোয়াড়দের বুঝতে দেইনি। নইলে ওরাও খুব নার্ভাস হয়ে পড়তো।’ ৩ মে, ২০১৬। তাজিকিস্তান থেকে বাংলাদেশের একই দল ফিরলো একই আসরের শিরোপা জিতে। কি আশ্চর্য, এবারও ছোটনের কথাগুলো শুনে মনে হলো এ যেন আগের কথাগুলোরই কার্বন কপি! ‘যদিও আমরা গ্রুপ পর্বে ভারতকে হারিয়ে আত্মবিশ^াস বাড়িয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে ফাইনালে যখন সেই ভারতকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে পাই, তখন শঙ্কিত ছিলাম এই ভেবেÑ ফাইনালে না আবার ভারত তাদের সেরা খেলাটা খেলে ফেলে। তাই এ নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন ছিলাম।’

নেপালে শিরোপা জয়ের পাঁচ মাস পর তাজিকিস্তানে এই টুর্নামেন্ট খেলতে যায় ছোটনের শিষ্যারা। সেই আসরে খেলেছে, এমন ১০ জনই এবার দলে ছিল না। এ নিয়েও একটা চাপে ছিলেন ছোটন। এ নিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা মজা করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলের সাফল্যের জন্য ছোটনের এভাবে বার বারই টেনশনে পড়াটা অত্যাবশ্যক!’

ছোটন আরও বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টের জন্য সারাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে দেড় ’শ জনকে বাছাই করার পর ৬৭ জনকে নিয়ে বিকেএসপিতে যাই। সেখান থেকে চূড়ান্ত দল গঠন করি। দীর্ঘ দুই মাস বাচ্চা মেয়েরা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। শুধু ফুটবলের জন্য তারা যে কষ্ট ও সাধনা করেছে, তা সফল হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো জেতার পরেই তাদের স্পিরিট সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। আমি শুধু মেয়েদের এটুকুই বলেছি যে দেশের জন্য ইতিহাস সৃষ্টি কর।’

বলা হয়ে থাকে ফুটবলে অধিনায়ক কেবল নামেই অধিনায়ক, আসলে তিনি খেটে খাওয়া শ্রমিক ছাড়া কিছুই নন! আসল অধিনায়ক যদি কাউকে বলতে হয়, তাহলে তিনি হচ্ছেন কোচ। তার দিক-নির্দেশনায়, পরিচালনায়-পরিকল্পনায় দলের জয় বা ড্র নির্ধারিত হয়। ফুটবল দলকে যদি একটা জাহাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সে জাহাজের ক্যাপ্টেন হচ্ছেন কোচ। শিপ ক্যাপ্টেন এবং ফুটবল কোচের মধ্যে আরেকটি মিল আছে। জাহাজডুবি হলে দায়ী করা হয় ক্যাপ্টেনকে, তেমনি দলের ভরাডুবি ঘটলে বা সাফল্য না পেলে বলির পাঁঠা বানানো হয় এ কোচ মহাশয়কেই! ছোটনের অবশ্য সেই সময় এখনও আসেনি!

ছোটন নিজে একসময় ছিলেন কৃতী ফুটবলার। ১৯৮৮-২০০২ পর্যন্ত খেলেছেন আরামবাগ, ফকিরেরপুল, ওয়ারী ও বিআরটিসির হয়ে। অধিনায়কত্বও করেছেন প্রতিটি দলেরই। মজার ব্যাপারÑ খেলোয়াড়ী জীবন চলাকালেই কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি! গল্পটা এরকমÑ ১৯৯৩ সালে যখন ওয়ারীর হয়ে খেলতেন, তখন থাকতেন মতিঝিলের টিএ্যান্ডটি কলোনিতে। সেখানকার টিএ্যান্ডটি ক্লাব সেবার প্রথমবারের মতো অংশ নেয় পাইওনিয়ার ফুটবলে। কলোনির মুরুব্বী ও বড় ভাইয়েরা চেপে ধরলেন, এলাকার ক্লাবটির কোচ হতেই হবে ছোটনকে। কি আর করা, অনুরোধে ঢেঁকি গিলতেই হলো! কোচিংয়ের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, অথচ ছোটনের অধীনে সে বছর টিএ্যান্ডটি ক্লাব পাইওনিয়ার লীগে চ্যাম্পিয়ন হয়! সেই থেকে শুরু। তারপর ১৯৯৬ সালে টিএ্যান্ডটি ক্লাবকে তিনি শিরোপা পাইয়ে দেন তৃতীয় বিভাগ ফুটবলেও। ২০০৬ সালে বাফুফে কোচ হিসেবে চাকরি হয় তার। ২০০৮ সালে মারদেকা কাপে জাতীয় ফুটবল দলের সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ এসএ গেমসে তাম্রপদক জেতা বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা দলেরও সহকারী কোচ ছিলেন ছোটন। ২০১৬ এসএ গেমসে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা দল তাম্রপদক জেতে। এই দলেরও হেড কোচ ছিলেন এই ছোটন। মেয়েদের বয়সভিত্তিক দলগুলোর কোচ হিসেবে আছেন ২০০৯ সাল থেকে। সাফ গেমস, অলিম্পিক বাছাইপর্ব, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ, এসএ গেমসÑ প্রতিটি আসরেই দলের সঙ্গে ছিলেন সাবেক ফুটবলার ছোটন।

‘নোটন নোটন পায়রাগুলি ঝোটন বেঁধেছে ...’ গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যাদের দেখলেই কেন যেন বার বার মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় পড়া এই ছড়ার লাইনটি। ছোটনের ছোট ছোট মেয়েরা একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে এবারও শিকার করেছে দ্বিতীয় বারের মতো। শিকারের নাম? ‘এএফসি অনুর্ধ-১৪ বালিকা আঞ্চলিক চ্যাাম্পিয়নশিপে’র (দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল) শিরোপা (এবং সেটা অপরাজিত)।

ক্ষীণ সংশয় ছিল। তারচেয়েও বেশি ছিল শিরোপা অক্ষুণœ রাখার প্রত্যয়। দ্বিতীয়টাই হয়েছে। বেঙ্গল টাইগ্রেস দল আবারও গলায় পড়েছে বিজয়ের মালা। সুদূর তাজিকিস্তানের মাটিতে জয়ের চিহ্ন এঁকেছে লাল-সবুজের বাহিনী। গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যারা প্রমাণ করলো, তারা যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছে এই শিরোপা। তাজিকিস্তানের দুশানবের এ্যাভিয়েটর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ভারতকে ৪-০ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। সোমবার রাতে বিমানযোগে তাজিকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফেরে ছোটন বাহিনী। বিমানবন্দরে তাদের বাফুফের কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। করান মিষ্টিমুখও। দলের সাফল্যগাথা অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ৩ মে বাফুফে ভবনের কনফারেন্স রুমে তাদের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেয় বাফুফে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় মহিলা ফুটবলের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুকে।

এই আসরে এর আগে গ্রুপ পর্বে (‘বি’ গ্রুপ) ভারতকে ৩-১ এবং নেপালকে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত করে সেমিতে ওঠে বাংলাদেশ। এরপর তাজিকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে ৯-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে নাম লেখায় বাংলাদেশের মেয়েরা। এবারের আসরে গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ‘বেঙ্গল টাইগ্রেস’ দল ভারতকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করে। কেননা তারা এর আগে কোন লেভেলের প্রতিযোগিতামূলক খেলাতেই এই দেশটিকে হারাতে পারেনি। সেই একই দলকে হারালো ফাইনালে। ভারতের মতো শক্তিশালী দেশকে একই আসরে টানা দু’বার হারানোর জন্য অবশ্যই প্রশংসা পাবে বাংলাদেশ দল।

এই আসরের আগের ভার্সনেও বাংলাদেশ সেন্ট্রাল জোনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। গ্রুপ পর্বে ভুটানকে হারিয়েছিল ১৬-০ গোলে। হারিয়েছিল শক্তিশালী ইরানকেও (১-০)। ভারতের সঙ্গে করেছিল ড্র (১-১)। এপ্রিলে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্প নির্ধারিত ফাইনালটি হতে দেয়নি। ডিসেম্বরে নেপালেই পুনঃনির্ধারিত ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে হারিয়ে (১-০) চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।

বিভিন্ন কারণে ২০১৫ সালের ওই শিরোপা জয় বাংলাদেশ বালিকা ফুটবল দলের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং স্মরণীয় হয়ে আছে। কেননা মেয়েদের ফুটবলের যে কোন পর্যায়ের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের এটাই প্রথম শিরোপা। এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৪ মহিলা দল শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত এই আসরে অংশ নিয়ে তৃতীয় হয়েছিল (ফেয়ার প্লে ট্রফিও লাভ করেছিল)।

আগামীতে মহিলা ফুটবলকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিতে ছোটন কি করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।