২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জগত নন্দিনী ও জনম দুঃখিনী...


১৭ মে মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতে জনম দুঃখিনী এক কন্যা এসে প্রকৃতির কান্নার মাঝে যে ভাষণ দিয়েছিলেন সে ভাষণ ছিল বাংলাদেশের নিয়তির অভিসার। দৃপ্ত শপথ, ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে যেই রাজনৈতিক দর্শন তিনি অন্তরে লালন করেছেন, তা ছিল বাঙালী জাতি তথা বাঙালীর মুক্তির অভিপ্রায়।

১৯৮১ থেকে ২০১৬, সুদীর্ঘ ৩৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। একটি দেশের ইতিহাসে এটা খুবই অল্প সময়। অল্প সময় হলেও প্রাপ্তি এক বিশাল। মানব কল্যাণ সূচক উন্নয়নের দিক থেকে বিবেচনা করলে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায় এবং গবেষণায় বাংলাদেশ ভারতসহ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো (ডঐঙ, টঘওঈঊঋ, টঘ এবং টঘউচ, ঋঅঙ) প্রায় সবাই এ উন্নয়নের স্বীকৃতিও দিয়েছে।

৩৫ বছরের আন্দোলন, নির্বাচন, বিরোধী দলের আসনে বসা এবং সরকার পরিচালনার পুরো সময়টাকে আমরা নিম্নোক্তভাবে ভাগ করতে পারি : ১. সামরিক শাসনের অবসান ঘটানো। ২. জাতির জনকসহ সকল নৃশংস হত্যাকা-ের বিচারের জন্য সোচ্চার হওয়া এবং সর্বশেষ বিচার করা। ৩. অনগ্রসরতা ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ। ৪. বাধ্যতামূলক ফ্রি শিক্ষা। ৫. ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারী সম্পত্তি ভোগদখল মুক্ত করা। ৬. নারী শিক্ষাসহ নারী অগ্রগতি এবং লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা। ৭. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। ৮. তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা এবং পরিবার পরিকল্পনার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করা। ৯. ভূমি সংস্কার। ১০. ধর্মকে রাজনীতির বাইরে তার নিজস্ব আসনে প্রতিষ্ঠা। ১১. ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্রের খাদ্য সংস্থান। ১২. পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্যোগ ও কাজের অধিকার সুনিশ্চিত করা। ১৩. গড় আয়ু বৃদ্ধি। ১৪. শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস। ১৫. ধর্মীয় স্বাধীনতা। ১৬. সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রগতি ও সমতা অর্জন এবং কল্যাণকর রাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন সেক্টরে ভাতা প্রদান ইত্যাদি আরও অনেক উন্নয়নমূলক কাজ।

১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আনন্দ বাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদক বলেছিলেন, যে চারটি আদর্শ নিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা ধ্বংস করে বাংলাদেশ আবার পাকিস্তানী লেবাসে সামরিক শাসনের দিকে ধাবিত হলো। তিনি নিশ্চয়তা দিয়ে লিখেছিলেন, পড়লে মনে হয় তিনি শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কবর হয়ে গেছে।’ উনার সেই সর্বনাশের ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়নি। বরং বলা যায় শেখ হাসিনার দর্শনের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

যেই সেনাবাহিনীর একটা বিচ্ছিন্ন অংশ ১৫ আগস্টের নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছিল যার সূত্র ধরে জিয়াউর রহমান সাহেব ক্ষমতা গ্রহণ করে, সেনা নিবাসে অবস্থান করে রাজনীতি শুরু করেছিলেন, সংবিধানকে সংশোধনের নামে, ’৭২-এর সংবিধানকে পদদলিত করেছিলেন, পরবর্তীতে জে. হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ একই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখল করলেন। একই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখল করে সেনা ছাউনিতে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তা থেকেও তাকে নামতে হলো শেখ হাসিনা নির্দেশিত পথ ধরে। গণতন্ত্রের সূর্য পূর্বাকাশে উঁকি দিতে লাগল। কিন্তু ১৯৯১-এর নির্বাচনে পাকিস্তানী ষড়যন্ত্র, সূক্ষ্ম কারচুপি, আইএসআইয়ের অর্থের কাছে নিশ্চিতভাবে জয়ী হওয়ার প্রত্যাশী আওয়ামী লীগ হেরে গেলে, শেখ হাসিনা দমে যাননি। বিরোধী দলের আসনে বসে তিনি সংসদকে এবং সরকারী দলকে শিখিয়ে দিলেন গণতন্ত্র কি? কিভাবে তার চর্চা করতে হয়। ১৯৯১ তে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় নয়, এই পরাজয় ছিল গণতন্ত্রকামী বাঙালীর।

দীর্ঘ ইতিহাস সম্পন্ন, কোন পুরনো সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে নীতি পরিবর্তনের জন্য ও বিরোধী পক্ষকে শাসকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ দেয় গণতন্ত্রের এই দর্শন তত্ত্বকে উপলব্ধি করে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সংসদে ব্যাখ্যা করে তুলে ধরলেন, কিভাবে যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার করা যায়। আইন, যুক্তিতর্ক কোনটাকেই সরকারদলীয় নেতা এবং উপনেতা খ-ন করতে পারেননি।

বাংলাদেশের প্রধান ব্যর্থতাগুলোর প্রতিকারের উপায়টি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও সামাজিক দাবির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত সেই কারণেই শেখ হাসিনার ভবিষ্যত কর্মপন্থা ও লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করার দিক দিয়ে শেখ হাসিনার নিয়তির অভিসার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে যা আপনা-আপনি ঘটার কথা ছিল, এক উর্ধমুখী সরল রেখায় তাঁর অগ্রগতি ধাবমান হওয়ার কথা ছিল, ’৭৫-এর আগস্টের পরে তা মুখথুবড়ে পড়ল। যা একালের জননেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নতুন করে এগিয়ে নিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেখালেন।

শেখ হাসিনার বর্তমান বাংলাদেশের উন্নয়নের চিত্র, যার তুলনা চলে আলফ্রেড টেনিসনের অনবদ্য বর্ণনার সঙ্গে :

আমি ভবিষ্যতের গভীরে তাকালাম

মানব চক্ষু যতদূর দেখতে পায়

সারা বিশ্ব উদ্ভাসিত হলো

সে অপরূপ সম্ভাবনা, আমাদের সামনে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অপরূপ সম্ভাবনার বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা আজ যে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে তাতে পুরো বিশ্ব বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কে নিশ্চিত।

তাই স্রষ্টার কাছে বিনীত প্রার্থনা, বাংলার মানস কন্যা, বঙ্গ সমাজের কুলবধূ, রমণীকুলের অলঙ্কার, বঙ্গভূমির অহঙ্কার, জগত নন্দিনী, জনম দুঃখিনী, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে তুমি দীর্ঘায়ু কর, বাংলাদেশের অসংখ্য দরিদ্র মানুষের যেন ক্ষুধা ও নিরক্ষরতার অবসান ঘটাতে পারেন।

লেখক : সাবেক ভিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়