২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

লে. জেনারেল জিয়ার হত্যাকাণ্ড প্রশাসকের বয়ান


বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি লে. জে. জিয়াউর রহমান বীরউত্তম ১৯৮১ সালের ৩০ মে তার সশস্ত্র সহকর্মীদের হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল মনজুর, যিনি ছিলেন জিয়াউর রহমানের অন্যতম সহচর ও বন্ধু। সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এই তিনজনই বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বা খুনীদের প্রশ্রয় দিয়েছিলেন বলে অনুমিত।

চট্টগ্রাম গ্যারিসনে যারা জিয়াকে হত্যা করেন তাদের বিদ্রোহ বেশিক্ষণ টেকেনি। জেনারেল মনজুর পালিয়ে যান। পথে গ্রেফতার হন এবং সেনানিবাসে ফিরিয়ে আনার পর নিহত হন।

জিয়া হত্যার পর হত্যাকারী হিসেবে অনেক সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি হয়। রটনা ছিল মনজুর ঘটনার শিকার। তিনি হত্যা করেননি। প্রকৃতপক্ষে কোন্ ঘটনাচক্রে জিয়া ও মনজুর নিহত হলেন সে ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু কন্যা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ঘটনার বিচার করেছিলেন। জিয়া হত্যার বিচার তার স্ত্রী খালেদা জিয়া করেননি। জেনারেল এরশাদের কাছে তিনি অনেক সুবিধা পেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগী ছিলেন জিয়া ও তার বন্ধুরা। জিয়া হত্যার বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধা পেয়েছিলেন এরশাদ ও তার বন্ধুরা।

জিয়া হত্যা নিয়ে পরে অনেকে লিখেছেন। এর মধ্যে কিছু সেনা কর্মকর্তাও ছিলেন। সবাই কোন না কোনভাবে অভিযোগ করেছেন এরশাদের বিরুদ্ধে। মনজুর হত্যা নিয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। নিষ্পত্তি হয়নি। তেমনি এরশাদ আমলে হাসিনাকে হত্যার যে প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল এবং অনেকে নিহত হয়েছিলেন, সে মামলারও নিষ্পত্তি হয়নি।

জিয়া হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা পাই একজনের লেখায়। তিনি জিয়াউদ্দিন চৌধুরী। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য জিয়াউদ্দিন ১৯৮১ সালে ছিলেন চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার। এমন অনেক ঘটনার তিনি সাক্ষী যেসব ঘটনা আর কারও পক্ষে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব ছিল না। এ বিষয়ে আত্মস্মৃতিমূলক একটি গ্রন্থ লিখেছেন যার নাম এ্যাসোসিয়েশন অব জিয়াউর রহমান এ্যান্ড আফটারমাথ। ‘জিয়াউর রহমান হত্যা ও তার পর।’ ২০০৯ সালে ইউপিএল গ্রন্থটি প্রকাশ করে। আমার ধারণা, এ বইটি অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। না হলে তার বর্ণিত ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা হতো। জিয়াউদ্দিন এখন সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। আমার এই প্রবন্ধের মূল ভিত্তি জিয়াউদ্দিনের গ্রন্থ।

জিয়াউদ্দিন ভূমিকায় লিখেছেন, চট্টগ্রামে জিয়া এসেছিলেন তার দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব মিটাতে। জিয়ার শেষ দিনগুলো কাছে থেকে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছিল তার। মনজুর ও জিয়া দুজনকেই তিনি চিনতেন ১৯৭২ সাল থেকে যখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বিশেষ সহকারী ছিলেন।

তিনি লিখেছেন, ১৯৭৫ সালে জিয়া ক্ষমতায় আসেন, ক্ষমতা সংহত করেন এবং ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ছিল বৈশিষ্ট্য, জিয়ার আমলে তা ক্রমেই অপসৃত হয় এবং তা বেশি ডানপন্থী ও ইসলামী হয়ে ওঠে। কারণ ওই ছয় বছর জিয়া ওই ধরনের রাজনীতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। ওই রাজনীতি বিকাশে তিনি সব ধরনের মানুষকে নিয়ে দল করেন, নানা কৌশলের আশ্রয় নেন। কিন্তু অন্তিমে যে প্রতিষ্ঠানটি ছিল তার সবচেয়ে বিশ্বাসের, সেই সেনাবাহিনীর হাতেই নিহত হন। তিনি বুঝতে পারেননি তার রাজনীতি ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। বলা হয়ে থাকে তার হত্যার জন্য দায়ী জেনারেল মনজুর। ‘কিন্তু আমি যা দেখেছি’ লিখেছেন জিয়াউদ্দিন, ‘তা সরকারী ভাষ্যের বিপরীত।’ জিয়াউদ্দিন মনে করেন, সামরিক আদালত বা বিচারপতি সাত্তার সরকার গঠিত সেনা ও বিচার বিভাগীয় তদন্তে জিয়া হত্যার আসল রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। পরে একটি দুর্বল বানানো-কাহিনী সরকারীভাবে নির্মিত হয় যে, ক্রুদ্ধ সৈন্যদের হাতে মনজুর নিহত হয়েছেন। [অ ঢ়ড়ড়ৎষু পড়হপড়পঃবফ পড়াবৎ ঁঢ় ংঃড়ৎু ধিং ষধঃবৎ ড়ভভরপরধষষু পরৎপঁষধঃবফ ঃযধঃ যব যধফ ফরবফ রহ ঃযব যধহফং ড়ভ ধহমৎু ংড়ষফরবৎং.]

॥ দুই ॥

১৯৮১ সালের ২৯ মে চাটগাঁর ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দিনকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি জিয়া চট্টগ্রাম আসবেন। ৩০ তারিখ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির বৈঠক করবেন। তার সঙ্গে আসবেন সাধারণ সম্পাদক ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী, উপ-প্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন আহমদ, আমেনা রহমানসহ দলের আরও কিছু কর্মকর্তা। তিনি রাতটা কাটাবেন সার্কিট হাউসে। পরদিন চলে যাবেন ঢাকা। ডেপুটি কমিশনারকে নির্দিষ্টভাবে জানানো হলো, তিনি কোন সরকারী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন না। জরুরী ভিত্তিতে মিটিংটি ডাকা হয়েছে। আর এ মিটিংয়ের কারণে জিয়া ইরাক ও ইরান সফর বাতিল করেছেন।

রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করে দলীয় সভা আহ্বানের অর্থ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির সফরের আয়োজনে বেশ সময় লাগে। কোন জেলায় যদি তিনি আসেন তাহলে মাসখানেক আগে থেকেই তার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তির কারণে জিয়া বেশ ঘন ঘন চট্টগ্রামে আসতেন। তারপরও প্রস্তুতি গ্রহণে ডেপুটি কমিশনার বা ডিসির মাসখানেক লাগত। এবার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার সময় পেলেন ডিসি। সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির থাকার ব্যবস্থা করা ছাড়া তার আর করার কিছু ছিল না।

বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতাও রাষ্ট্রপতির নির্দেশে হ্রাস করা হয়েছিল। ৩০ মে সকালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে জিয়াকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিসি ছাড়া ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুউদ্দিন, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বদিউজ্জামান ও ডিআইজি শাহজাহান। কিছু বিএনপি নেতা এবং তিন বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডাররাও ছিলেন। মনজুর জিওসি হিসেবে সেদিন উপস্থিত ছিলেন না। তাকে প্রতিনিধিত্ব করছিলেন ব্রিগেডিয়ার আজিজ। তবে জিয়াউদ্দিনের কাছে তা অস্বাভাবিক মনে হয়নি। এর আগেও কয়েকবার মনজুর বিমানবন্দরে আসেননি।

বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে তিনি এসেছিলেন। ভিআইপি লাউঞ্জে কুশল বিনিময়ের পর ব্রিগেডিয়ার আজিজুর রহমানকে তিনি মনজুরের কথা জিজ্ঞেস করলেন। আজিজ জানালেন, টেনিস খেলতে গিয়ে মনজুর আহত হওয়ায় আসতে পারেননি। জিয়া ঠাট্টার সুরে হেসে বললেন, ‘আমার মনে হয় সে বেশি খেলছে। মনজুরকে বলো বেশি টেনিস খেলে নিজেকে ক্লান্ত না করতে।’ এ কথা বলে হঠাৎ জিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ গাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। ডিসিও দ্রুত তাকে অনুসরণ করলেন।

ভিআইপি লাউঞ্জের বাইরে রাষ্ট্রপতির গাড়ির বহর অপেক্ষা করছিল। জিয়া সোজা ডিসির নঁভভ পড়ষড়ৎবফ টয়োটা করোলার দিকে অগ্রসর হলেন। চট্টগ্রামে এসে বিমানবন্দর থেকে সার্কিট হাউস এই গাড়িতেই তিনি যেতেন। ডিসি তার সঙ্গে গাড়িতে উঠলেন।

জিয়া সাধারণত বেশি কথা বলতেন না। তার কথা ছিল নির্দেশের মতো। কথা বলার সময় নিজে একা কথা বলাই পছন্দ করতেন।

জিয়াউদ্দিন জানাচ্ছেন, ৩০ মে জিয়া কথা বলার মুডে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রাস্তা চওড়া করার ব্যবস্থা কেন মিউনিসিপ্যালিটি নেয়নি। ডিসি কিছু বলার আগেই জিয়া বললেন, ‘এসব রাস্তা থেকে সড়ক দ্বীপগুলো উঠিয়ে নেয়া দরকার; প্রতিবন্ধক থেকে মানুষের শেখা উচিত লেন অনুযায়ী গাড়ি চালানো। আরো শৃঙ্খলাপূর্ণ হওয়া উচিত।’

ডিসি বিনীতভাবে বললেন, সড়কদ্বীপ সরালে আরও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। জিয়া বললেন, ‘স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা হাতে হাত ধরে চলবে। বাংলাদেশীদের শৃঙ্খলা আরও শেখা উচিত। তাদের জানা উচিত রাস্তায় কীভাবে চলতে হয়।’ যোগ করলেন তারপর, ‘ওইসব মানুষ নয় মাসে অতিদ্রুত স্বাধীনতা লাভ করেছে। তাদের ভিয়েতনামে থাকা উচিত ছিল। তাহলে তারা জানত স্বাধীনতার মূল্য কত!’ ডিসি খানিকটা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন, সড়ক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ভিয়েতনামের কথা আসতে। তিনি চুপ থাকলেন। জিয়াও চুপ করে থাকলেন। সার্কিট হাউসে পৌঁছার মুহূর্তে জানতে চাইলেন, জুমার নামাজ তিনি কোথায় পড়বেন।

‘চন্দনপুরা মসজিদে’ জানালেন ডিসি।

অন্য কর্মকর্তারা পৌঁছার আগেই জিয়া চলে গেলেন তার রুমে। নিচে একে একে পৌঁছলেন পার্টির কর্মকর্তারা। জিয়াউদ্দিন লিখেছেন, অন্তর্দ্বন্দ্ব এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে চট্টগ্রামে তো বিএনপি ভাগ হতোই, তার অভিঘাতও সারাদেশে পড়ত। অন্তর্দ্বন্দ্বের বয়ানও তিনি করেছেন।

চট্টগ্রাম বিএনপিতে দুটি উপদল ছিল। একটি উপ-প্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিনের, আরেকটি সুলতান আহমদের যিনি ছিলেন ডেপুটি স্পীকার। তার কারণেই মূলত ঝামেলাটা বেধেছিল। তার একটি মস্তান বাহিনী ছিল যার মাধ্যমে চাটগাঁ বিএনপির দখল নিতে চাইছিলেন। তার গ্রুপ কয়েকদিন আগে চাটগাঁর বিএনপি অফিস তছনছ করে দেয়। জামালউদ্দিনের সমর্থকরা অফিসটি চালাতেন। জিয়া চট্টগ্রামে এসেছিলেন উপদল দুটির দ্বন্দ্ব মীমাংসা করতে।

(চলবে)