মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বাস্তবস্পর্শী জীবন-অর্থ ও শিল্পকলার ঔজ্জ্বল্যে ‘অনিকেতন’ স্বায়ম্ভুব

প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৬, ০৭:০২ পি. এম.
বাস্তবস্পর্শী জীবন-অর্থ ও শিল্পকলার ঔজ্জ্বল্যে ‘অনিকেতন’ স্বায়ম্ভুব

লিটন আব্বাস ॥ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার কল্যাণে দুরধিগম্য পৃথিবী মানুষের জন্য প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। জীবিকার সন্ধানে মানুষ প্রতিনিয়ত দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। নূতন পরিবেশে তাদের নূতনতর জীবনে সমস্যা ও সম্ভাবনা অনেক। প্রবাসী-জীবনে নূতন পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের সতত প্রয়াস স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষগুলোর জন্য অভাবিতপূর্ব সমস্যা।

এর মোকাবেলায় কখনও এককভাবে, কখনও সমাবতভাবে তারা দ্বন্দ্বে অবীতর্ণ হয়। ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ বা সাম্প্রদায়িক-স্বার্থ তাদেরকে নানাভাবে প্ররোচিত ও উদ্বোধিত করে সমস্যার মোকাবেলায় আহ্বান জানায়। তাদের কর্মকা-ে একদিকে যেমন সচতুর দক্ষতার প্রকাশ দেখা যায় তেমনি নির্বুদ্ধিতার চরমতম অভিব্যক্তিও ফুটে উঠে কখনও-বা। আশা-নিরাশা, দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দোলাচলে আন্দোলিত মানুষগুলোর জীবনচরিত চিত্রণে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর উপন্যাস ‘অনিকেতন’ রচনা করেছেন, যা তাঁর সংবেদনী ও পরিহাস প্রবন দৃষ্টিভঙ্গি অনন্যতায় ভরপুর। অনিবার্যভাবেই মানবতন্ত্রী সাহিত্যের প্রধান বিষয় হচ্ছে―মানুষের অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোকিত করা। মানুষ তার আপন বোধবুদ্ধি, যুক্তিতর্ক ও নিষ্ঠা দিয়ে, শ্রেষ্ঠ এবং অক্লান্ত শ্রম ও মেধার বলে তার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে―এই ধারণা ও বিশ্বাস ছিল রেনেসাঁ-উত্তর আধুনিক সাহিত্যের মূলমন্ত্র। কিন্তু ইউরোপে এই ধারা ক্রমশই হারিয়ে যায় এবং সেখানে স্থান করে নেয় অমানবতন্ত্রী সাহিত্য বোধের।

দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী অমানবতন্ত্রী পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যে প্রভাবিত হলেও তাঁর স্বকীয় জীবনোপলব্ধি থেকেই তিনি নিষ্ঠুর, নির্মম ও বিকারগ্রস্ত মানুষগুলোকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই রেনেসাঁ-উত্তর আধুনিক সাহিত্যে মানুষের প্রতি যে বিশ্বাস ও আস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়―মহিমাম-িত, প্রতিশ্রুতিশীল ও রুচিশীল মানুষের যে ভিড় লক্ষ করা যায়―আব্দুর রউফ চৌধুরী সেখানে মানুষের সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতার কথা, এমনকি মানুষের মনুষ্যত্বহীনতার দিকগুলো প্রকটভাবে তুলে ধরেছেন। আর তাই তাঁর কালের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসহ জাতিক-আন্তর্জাতিক সময় ও সমাজপ্রবাহের অন্তরলালিত মানব-অস্তিত্বের সর্বগ্রাহী সমস্যাই ‘অনিকেতন’ উপন্যাসে শিল্পরূপে স্থান করে নেয়। ‘অনিকেতন’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো আগাগোড়া হতাশাগ্রস্ত, জীবনযুদ্ধে পরাজিত, নিঃসঙ্গ ও শান্তিবিবর্জিত মানুষ। তাদের জীবনে কোনও এক পর্যায়ে শান্তির দৃশ্য দেখা দিলেও সেসব চিত্র যেন অনড় কষ্টের ও যন্ত্রণার গভীরতাকে তীব্র করে তোলার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানেই মূলধারা বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে আব্দুর রউফ চৌধুরীর সাহিত্য স্বাতন্ত্র্যভাবে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘অনিকেতন’-এ এসেছে অমানবতন্ত্রের এক নূতন আলোকবর্তিকা। এই আলোকিত সম্ভাবনার পথ ধরেই বাংলা সাহিত্যের জগতে ‘অনিকেতন’ রূপ ও রুচির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে সক্ষম। সময়, সমাজ ও জীবনের বিশাল প্রেক্ষাপট ‘অনিকেতন’ উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরীতিতে নবতর তাৎপর্যতা প্রদান করেছে। জীবনার্থ সন্ধানের প্রশ্নে মীমাংসাপ্রবণ দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর শিল্পসত্তা তত্ত্বাশ্রয়ী হলেও কোনও দ্বন্দ্বময় চারিত্র-বৈশিষ্ট্যে রক্তাক্ত হয়নি, বরং তত্ত্বকে তিনি বিশ্বজনীন জীবন-জিজ্ঞাসার স্পৃহায় অভিব্যক্ত করেছেন। যেমন, ‘কাজি’ চরিত্রের অন্তর-বাইর দ্বন্দ্ব, রক্তক্ষরণ ও রূপান্তরের সমান্তরালে সর্ব-কুসংস্কারমুক্ত, সর্ব-অকল্যাণমুক্ত লেখকের চৈতন্যের সমগ্রতাস্পর্শী বাস্তবস্বরূপকেই উন্মোচন করে। সংকীর্ণ ধর্মভিত্তিক চিন্তাধারার শিল্পপ্রতিবাদ হিসেবেও ‘অনিকেতন’ নূতন বোধের দিগন্ত-রেখাকে স্পর্শ করেছে। এতে লেখক পরীক্ষাপ্রবণ শিল্পসাধনার মাধ্যমে যোগ করেছেন প্রবাসী বাঙালির সমাজ-বিন্যাস, আর্থ-উৎপাদন কাঠামো, মনোজাগতিক সূক্ষ্মতা, অস্তিত্ব-জিজ্ঞাসার জটিলতর ক্রমবিকাশ। তাদের অভাবক্লিষ্ট, ব্যর্থতা ও লাঞ্ছনায় নিপীড়িত ক্ষয়িষ্ণু রূপটিকেও তিনি সুস্পষ্টরূপে অনুধাবন করতে পেরেছেন। আর তাই এই উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাদের দ্বন্দ্বময় জীবন-চেতনার মর্মমূলে বিদ্যমান প্রবাসী বাঙালির অন্তর্জ্বালাময় অনুভূতি-উপলব্ধি-অভিজ্ঞতা।

আব্দুর রঊফ চৌধুরী ছিলেন এক অসাধারণ দ্রোহী কথাসাহিত্যিক, তিনি সনিষ্ঠা মনস্বতায় অতুলনীয়। তাঁর সাহিত্য চর্চা ও পাঠ-এর মধ্য-দিয়েই ক্রমাগত চেতনা ও মননে জাগরিত সম্ভব। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের নির্মিতি ও মর্মাংশে এক শুদ্ধ উত্তর-আধুনিক। ফলস্বরূপ, যুগাত্মক জটিল চেতনাপ্রবাহী আঙ্গিকে তিনি পর্বতচূড়াবিহারি; বিষয়-আশয়েও অতিশয় কালচৈতন্যবাহী; বিস্ময়-সূচক। তাঁর উপন্যাসে জীবন-চর্চা ও দক্ষতার সঙ্গে শিল্পসৌন্দর্যবোধ একাত্ম-মোহনায় ঘূর্ণিত ও চূর্ণিত। স্থিত অথচ মেধাবী, মননশীল, রুচিবান শিল্পীসত্তা অধিষ্ঠিত। সেই সঙ্গে তাঁর সংবহ ব্যক্তিত্ব সংক্রামে, স্বোপার্জিত পৃথকতায় তিনি একটি স্বকীয় সাহিত্য-বিশ্বের নির্মাতায় অতুল্য। তাঁকে স্পর্শ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারতবর্ষ বিভাজন ও স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি যৌবন-ভরাট যুবক যখন তখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র মতোই প্রাবাসী হন। ইউরোপীয়, ফরাসী ও ইংরেজি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিচিত্র শিল্প-রূপান্তর ও প্রকরণ কুশলতার প্রতি ছিল তাঁর সজাগ অভিনিবেশ ও অনুসন্ধান। তিনি যেমনি স্বদেশ ও স্ব-সমাজকে প্রত্যক্ষ করেছেন তেমনি প্রবাসও। তাই তিনি জীবনের প্রত্যক্ষণ ও পরিচর্যায় কালের বিবেচক এবং শিল্পসূত্রে তিনি উত্তর-আধুনিক। দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রঊফ চৌধুরী’র উপন্যাস ‘অনিকেতন’ তাই হয়ে উঠেছে জীবন-সূচকতার দর্পণ। ‘অনিকেতন’ উপন্যাসে যন্ত্রণা ও আনন্দহীনতার তৃপ্তিকর পরিসমাপ্তি ধরা দেয়। এই উপন্যাসের প্রধান পটভূমি প্রবাস-জীবন, বিলাত-জীবন। নৈঃসঙ্গের যন্ত্রণায় প্রবাসী বাঙালিরা যেন দিশেহারা।

‘অনিকেতন’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো বেশিরভাগ অল্পশিক্ষিত, অসংবেদনশীল এবং এরই ফলে নিঃসঙ্গ, একাকীত্ব সংশয়-পীড়িত, বিছিন্নতাবোধের চেতনায় আক্রান্ত, দিশেহারা। এর দীর্ঘ অবয়ব জুড়ে নারীদের গৃহিণী হয়ে ওঠার পরিচয় পাওয়া গেলেও তাদের জগৎটা যেন শরৎচন্দ্রীয় জগৎ থেকে আলাদা; এ যেন নারীকে হাতের কাছে পেয়ে তাদেরকে পুরুষরা বশীভূত করার খেলায় মেতে উঠেছে। এই খেলার পিশাচি দৃশ্যগুলোই দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী তাঁর এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন, যা অবশ্যি মানব স্বভারের কল্যাণকামী স্বরূপ নয়, বরং তার অত্যুগ্র অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটাই লেখকের উদ্দিষ্ট। নীলা, আফিয়া, রেখা প্রমুখ নারীদের কাছে স্থূলবুদ্ধি ও দেহসর্বস্ব। ফলে অনিবার্যভাবেই তারা আশ্রয়হীন, ভিন্ন ধরনের নৈঃসঙ্গ। নীলা একান্তভাবেই একজন স্বাভাবিক নারীর, যার অন্তরে রয়েছে স্বামীর প্রেম পাওয়ার তৃষ্ণা, নারীজনোচিত ঈর্ষা, স্বামীর ওপর সঙ্গত অধিকারের প্রত্যাশা। ‘তার বুকের মধ্যে কেমন যেন এক ব্যথা কনকন করে উঠল। ফেলে-আসা স্বামীর কথা, সহস্র দীর্ঘশ্বাস, লুকানো কান্না, অসহ্য যন্ত্রণা, তীব্র অভিমান―সবকিছু মিলে তার অন্তর যেন পাথরবৎ।’ নীলার শুধু বাইরের রূপই নয়, ভিতরের রূপটিও লেখক সক্ষমভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন, ‘নিজেকে ভেবেছে বঞ্চিত, দুঃখী, নিঃসঙ্গ নারী হিসেবে। সে [...] পর্দার ফাঁকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল দূরে―অন্ধকার আর বৃষ্টিতে, বৃষ্টি আর অন্ধকারে। অন্ধকার শুধু ভয় দেখায় না, এর মধ্যে নিরাময় শক্তিও নিহিত থাকে, সাধারণ দৃষ্টিতে তা ধরা পড়ে না, বোঝানোও যায় না, বোঝা শ্রমসাধ্য, অনুমোদিত ব্যবস্থা সাপেক্ষ, অন্ধকার যেন নিগূঢ় সত্তার জটিলতায় আবদ্ধ [...]।’ এই অন্ধকারই নীলাকে শক্তি দেয়; সত্য-সন্ধানে অনুসন্ধানী করে তুলে। ‘আফিয়ার নিটোল যৌবনের দিকে তাকিয়ে রইল ভিক্টোর আলি মুগ্ধ দৃষ্টিতে। আফিয়ার রূপ ও যৌবন তার চোখের সামনেই অনুপভুক্ত-অস্পশ্য-অপচয়িত হয়ে চলেছে দেখে তার চিত্ত যেন নিজেই সর্বস্ব লুণ্ঠনের মতো যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠল।’ আর নিঃসঙ্গ আফিয়া চমকে ওঠে ভিক্টোর আলির কথায়। ‘বন্ধুত্ব! বন্ধুত্ব! [...] এই সম্পর্কের মাপকাটি কী শুধুই দেহের সীমার মধ্যে আটকে থাকে!’ তবে নারীর জীবন কী পরিমাণের নিঃসঙ্গ হয়ে উঠতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে আফিয়া নিজেই। তার জীবনের একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার বীজ প্রোথিত রয়েছে তার জীবন ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ‘এই বেদনা থেকে, এই নিঃসঙ্গতার ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে হলে কী তাকে আত্মহত্যা করতে হবে! তবে সে জানে, নিরালম্ব মানুষের আর্তিতে তার জগৎ বিমর্ষ। সেই জগতে তাকে ভালোবাসার মতো মানুষ নেই। আজকাল অনেকেই বলে বন্ধুত্বের কথা। সে নিজেকে মনে করে একজন রক্ষিতা হিসেবে। তাছাড়া যেন আর কোনও পরিচয় নেই তার।’ শুধু আফিয়া নয় রেখাও একসময় হয়ে ওঠে পরপুরুষের ভোগের বস্তু। ‘পুড়ে গেল রেখার সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাজানো সাধের সংসারটি। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে পুরোপুরি ছেদ পড়ল। এক সন্ধ্যায়, সন্তান-দুটো নিয়ে রেখা এক নবীন এঞ্জিনের সাহায্যে ও যুবক-পাখায় ভর দিয়ে উড়ে গেল; নূতন প্রেম লাভের, ঘর বাঁধার এবং পুরুষচিত্ত জয় করার আশায়।’ বাইরের ঘটনাগত রূপ ‘অনিকেতন’ উপন্যাসের নারীদের নিঃসঙ্গের অংশ। তারা নিঃসঙ্গের যন্ত্রণায় আক্রান্ত হয়েই জীবন সম্বন্ধে শিখেছে। তারা তাদের ভাগ্য নিয়ে লড়েছে। এই যুদ্ধ শুধু নিজেদের জন্য নয়, নিঃসঙ্গতা থেকে উদ্ধার পাওয়ার মানবিক মূল্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায় যেন।

‘অনিকেতন’ উপন্যাসে পুরুষগুলোর মধ্যেও একই জিনিস উপলব্ধি করা যায়, যেমন তাজিদ উল্লা, সফিকুল ইসলাম, হাজি মজনু, দস্তাবেজে দ্বীন প্রমুখরা। তাই বিলাতের অপুষ্ট ও অনুজ্জ্বল বাঙালি নি¤œমধ্যবিত্তশ্রেণির

অনমনীয় ব্যক্তিত্ব, তাদের মানসদ্বন্দ্ব ও মূল্যবোধের সম্পর্ক এই উপন্যাসের বিশাল ভূমি দখল করে আছে। কেন্দ্রীয় অপনায়ক চরিত্রের ভূমিকায় যারা আছে (তাজিদ উল্লা, সফিকুল ইসলাম, হাজি মজনু, দস্তাবেজে দ্বীন প্রমুখ) তারা মানুষ হিসেবে সংস্কৃতিমান, সৃষ্টিশীল ও শুদ্ধাচারী নয়। তাজিদ উল্লা: ১৯৭১-এর ‘স্বাধীনতার চির শত্রু। স্বভাবসিদ্ধ ইতর। [...] যেন তার কোমরে সবসময় বাঁধা থাকে শয়তান।’ সফিকুল ইসলাম: সে তার পতœীর প্রতি বিশ্বাসঘাত ও কন্যার সম্বন্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীন। তার সম্বন্ধে লোকের ধারণা, ‘[...] সফিকুল ইসলামের বড় মেয়ে আফিয়া তার বিয়ের বিচ্ছেদের পর বাপের বাড়িতেই আছে। অবশ্য তার বাবা থাকেন আল্লাহর কাজে ব্যস্ত। আল্লাহওয়ালা মানুষ কিনা! [...] তিনি কেমনতর মানুষ! [...] তিনি একজন পাষ- পিতা [...]। তার কোনও হিতাহিত জ্ঞান আছে বলেও মনে হয় না; থাকলে স্বামীর গৃহ থেকে বিতাড়িত কন্যার জন্যে ব্যথা বোধ করতেন।’ হাজি মজনু: ‘দুশ্চিন্তার মূর্তি হাজি মজনু। তার চোখেমুখে যন্ত্রণার ছবি, তীব্র আহত যেন, যা সহজে দৃষ্টি কেড়ে নেয়। শরীর ভেঙে গেছে। কাঠামো ঠিক থাকলেও চেহারা রোগ্ন শুকনো দেখাচ্ছে, মৃত প্রায়। অত্যন্ত করুণ ও বীভৎস হাজি মজনুর চেহারার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, তাই চোখ চলে যায় তার পোশাকে। এই পোশাকই পরিচয় দিচ্ছে তিনি পবিত্র হজ্ব পালন করে ফিরেছেন।’ দস্তাবেজে দ্বীন: নিজেকে একজন নকল পুঁজিপতি। বিস্ময়করভাবে সে অর্থলোভ দেখিয়ে শিল্পীর তরুণ-হৃদয়কে হরণ করার চেষ্টা করে, একসময় সে শিল্পীকে বিয়ের মুখোমুখি নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। তাই সে হয়ে উঠেছে একজন অপনায়ক, অসাধু ও দুষ্ক্রিয়। নৈঃসঙ্গ মানব স্বভাবের অস্তিত্বের কতটা গভীরে প্রোথিত তা ‘অনিকেতন’ উপন্যাসে প্রকাশ পেয়েছে। এই নৈঃসঙ্গ ভাবনার সঙ্গে ইউরোপীয় বিচ্ছিন্নতাবাদের সম্পর্ক থাকলেও তা হয়ে উঠেছে একেবারে বাংলার জল-বায়ু-মৃত্তিকার সাধারণ মানুষের নৈঃসঙ্গ যন্ত্রণা যেন।

মানব স্বভাবের স্বার্থান্ধ ও অশুচি বৈশিষ্ট্য দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী ভীষণ নির্মোহ ও নিরাবেগ বস্তুতান্ত্রিকতার সঙ্গে উন্মোচিত করেছেন এই উপন্যাসে। এর বস্তবতার ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা ও স্বার্থান্ধাশুচিতার অন্ধকারাচ্ছন্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’-উক্তিটি আর সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় মিস্টার ইউলসন-এর কথা। জীবন ও সাহিত্য সাধনার এই ক্ষেত্রটিতে, মিস্টার ইউলসন-এর মাধ্যমে, দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী মনুষ্যধর্ম সম্বন্ধে শুধু প্রতিবাদীই নন, একইসঙ্গে মানব স্বভাবের অধর্মকে বিস্ময়কর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুধাবণ করেছেন। উত্তর-আধুনিক কথাসাহিত্যের সৃষ্টি করতে গিয়ে জীবন থেকে এই উপাত্তগুলো বের করে আনার প্রয়োজন ছিল খুবই। আব্দুর রউফ চৌধুরী স্বার্থান্ধ, অশুচি ও বিকারগ্রস্ত্র মানুষের স্বরূপ তুলে ধরেছেন তিনটি উপায় থেকে―স্বার্থ ও লোলুপতা; বিকৃত যৌনতা; এবং বিকৃত আনন্দ-এর দিক থেকে। স্বার্থ ও লোলুপতা: ‘স্বার্থসিদ্ধিতে মানুষ শুধু কুচক্রীই নয়―নিষ্ঠুর, নির্মম ও অমানুষ। অমানুষ তো বটেই, বরং মনুষ্যহীন, ইতর, নীচতর, বড়োই অসরল।’ বিকৃত যৌনতা: ‘শুভপীর সেজে’ একজন ‘মাওলানা ক্ষান্ত হননি; একসময়, [...] শাকরেদের বাড়িতে, ভুঁড়িভোজনের পর সুখনিদ্রা যাওয়ার ছলে, তোষকের ওপর অর্ধেক উপবেশনে,

অর্ধেক বদনে, ডান-হাতে তসবী নিয়ে তেলাওয়াত করা অবস্থায়, রিপুর প্রেরণায় এক সুন্দরী বালিকাকে দিয়ে কাম-ভোগ-তৃষ্ণা মিটাতে অধীর হয়ে উঠেছিলেন।’ বিকৃত আনন্দ: ‘মাওলানা তার অন্তঃকরণের দ্বিমনা দ্যোতনা ও ছলনায় কত যে নিরীহ ললনাকে আত্মার শান্তচন্দ্রলোক ও অন্তরালোকিতানন্দ লাভের স্পৃহায় ভোগ করে নিয়েছিলেন, শকরেদদের বশে এনে।’ এই চিত্রটি থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় যে, মাওলানা বিকৃত আনন্দের এক আধার।

এই উপন্যাসের লাভলী-রুবেল এবং শিল্পী-সুয়েব চরিত্রের ব্যক্তিত্বের সঙ্কট নিয়ে আলোকপাত করা আবশ্যক। শিল্পীর বিতর্কিত পরিণাম ও সুয়েবের প্রচ্ছন্ন নীতিমুখিতার প্রেক্ষাপটে সক্রিয় প্রবাসী কাল-স্থানের দ্বান্দ্বিক আবহ। শিল্পীর আন্তর-নৈঃসঙ্গ, ক্ষোভ-লোভ-প্রতিবাদ, দুঃখ-বেদনা-অভিমান মূলত এই উপন্যাসের বর্ণনীয় বিষয়। শিল্পীর বিপরীত-আচরণ ও পরিণামে তার আত্মসমর্পণ, তার প্রাথমিক জড়স্বভাব এবং অন্তরস্থিত ধ্রুববিশ্বাসের প্রতি সুয়েবের নির্মম সততা, তার অস্তিত্ব ঘোষণায় কম্পিত প্রভৃতির কার্যকারণ তাদের জীবন-বিন্যাসে সমগ্রতার মূলীভূত। শিল্পী-সুয়েবের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পরস্পর সংঘাত-উত্থিত দ্বন্দ্ব-যন্ত্রণা, বিক্ষোভ-উচ্ছ্বাস, সংযম-অসংযম, আত্মপীড়ন ও মানসিক অবদমন-বিজড়িত পূর্ণ অস্তিত্বের রূপায়ণ করেছেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। তবে শিল্পী-সুয়েবের সংকট কেবল হৃদয়বৃত্তির সংকট নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব ও অস্তিত্বের সংকট। অন্তর্বিরোধ নি¤œমধ্যবিত্তশ্রেণির চরিত্রের অন্তরঙ্গ বৈশিষ্ট্য। এই উপন্যাসের এক ঘটনাংশ লাভলী-রুবেলের চিত্তসংকটের কারণ ও পরিণাম। ব্যক্তিত্ব-সচেতন ও অস্তিত্ব-প্রতিষ্ঠাকামী ব্যক্তির মনোজাগতিক অন্ধকার অঞ্চল আবিষ্কার; চিত্তজাগতিক অন্তর্বিরোধী জটিলতাসমূহের উন্মোচন; চলমানতা এবং জীবনার্থের রূপাঙ্কন করা। লাভলী-রুবেল চরিত্রদ্বয়ের ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত ও অস্তিত্বরক্ষার সংঘাতময় ক্রমপরিণতি কার্যকারণ ও স্বরূপ বিশ্লেষণই হচ্ছে আব্দুর রউফ চৌধুরী মূল উদ্দেশ্যে। এই চরিত্রদ্বয় অগ্রসর হয়েছে তাদের অভিপ্রেত লক্ষ্যের দিকে, অথচ তারা প্রতিমুহূর্তেই নিক্ষিপ্ত হয়েছে অপ্রাপ্তির শূন্যতায়, দগ্ধ হয়েছে অস্তিত্বহীনতার যন্ত্রণায়। মানবস্বভাবের এই আলোকিত এবং প্রচ্ছন্ন যন্ত্রণাকাতর জীবন-আবেগ, অন্তর্জ্বালা ও অস্থির বেদনার প্রতিবিম্বপাত হয়েছে এই উপন্যাসে। দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী প্রতিটি চরিত্রের মনোভাব, আচরণ ও চেতনাকে সেই চরিত্রের সমগ্র জীবনপ্রবাহের পটভূমিতে বিবেচনা ও মূল্যায়ন করেছেন। ঘটনা শুধু নয়, ঘটনা-উত্থিত মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্তর উন্মোচনই লেখকের যেন অন্বেষণ, আর তাই লাভলী-রুবেল-শিল্পী-সুয়েবকে আত্মসচেতন ও ব্যক্তিসচেতন; আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় উত্তেলিত এবং ঘটনাপ্রবাহের ¯্রষ্টা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।

উত্তর-আধুনিকতা এভাবেই দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী’র এই উপন্যাসে ধরা দিয়েছে। তিনি মানুষের জীবনযাপনকে তাঁর আপন স্বরূপের মধ্যে রেখে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন বলেই সম্ভব-অসম্ভবের প্রশ্নে বাংলা সাহিত্যের প্রথাগত কার্যকরণ রীতিকে মেনে নিতে পারেননি। বাংলা সাহিত্যের প্রথাগত নির্মাণ

কৌশলটিও তিনি ভেঙে দিতে চেয়েছেন। যারা বাংলার মূলভূমি থেকে অনেক দূরের অধিবাসী, তাদের সমাজ অমানবিক ও অসামাজিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন; অসুস্থ সমাজে ধর্মপ্রলেপে কুসংস্কার ও অমানবিকতায় বলি হচ্ছে

কেউ কেউ; এখানে নারীরা পায় না প্রেম ও প্রশ্নহীন অধিকার। তাই দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের প্রথাবিরোধী চরিত্র ও অচেনা মুখ অঙ্কন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ‘অনিকেতন’ যেন মানব স্বভারের অমীমাংসিত স্তরের অনুসূক্ষ্ম জটিলতার রূপাঙ্কন। বঙ্কিম-ঢঙ, ঘটনা বিস্তার, বিবরণ, রবীন্দ্র-শিল্পনিপুণতা, মানসক্রিয়ার বিশ্লেষণ, বিস্ময়কর চিত্রকল্প সৃজন ও অব্যর্থ প্রতীক উদ্ভাবনে এবং প্রয়োগ-নিপুণে লেখকের সার্থকতা সন্দেহাতীত। তিনি বর্ণনা ও রূপবর্ণনায় সংযত, যৎসামান্য ও যথার্থ রূপাঙ্কনে লিপ্ত। বিষয়-ভাবনায়, শিল্পরূপ বিচারে এই উপন্যাস উত্তর-আধুনিক উপন্যাসের প্রায় সব শর্তই পূরণ করেছে। উত্তরাধুনিক জীবনের অন্তর্বর্তী নৈরাশ্য, কষ্ট, বেদনা, সংশয় ও প্রবাসী গহন রহস্যময় জগতের উন্মোচনে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরীর রচনানীতিও ব্যতিক্রমধর্মী। সংলাপ নির্মাণের শৈল্পিক শক্তি এবং নাট্যিক সংহতিতে এই উপন্যাস সুসংহত ও অসাধারণ। ভৌগোলিক সীমাসংহতি, মানব-মনের ওপর ভূপ্রকৃতির সর্বাত্মক প্রভাব, জীবন-স্বাদের অন্যন্য নিঃসঙ্গতা যেমনি এই উপন্যাসে বিদ্যমান, তেমনি চরিত্রায়ণ, প্রতীক ব্যবহার ও ভাষা-বিন্যাসে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক কাঠামোর জীবন প্রাণময় রূপ লাভ করেছে। একমুঠো উদাহরণ―

বন্ধুর বাসায় ভুঁড়িভোজনের পর ফিরছিলেন বদরুদ্দিন। ইয়র্কওয়ে রাস্তার মোড় ঘুরে প্যান্টনভিল রোডের বইয়ের দোকানের সামনে সিগারেট কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল তার, হাঁটুতে ভর দিয়ে অনেক মানুষের পায়ের চাপে ভেজা সিঁড়ি ভেঙে পাতাল-স্টেশন থেকে উপরে ওঠে আসা তাজিদ উল্লাকে; সফেদ গোল কটন টুপিতে মাথা ঢাকা, কাঁচাপাকা কেশ―বেশ মানিয়েছে, থুতনীতে শুধু শুভ্র দাড়িগুচ্ছ―পানের পিক পড়ে কিছুটা ফিকে হয়েছে মাত্র।

একটি বেণী ঝুলিয়ে, ধনেখালিজিড়ের রঙের জামা-পায়জামা পরা লাভলী সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে লাগল, আর শিল্পী তার পিছু পিছু নির্ভেজাল হাসি ছড়িয়ে এগুতে লাগল। লাভলী আর শিল্পী দুই বোন।

রোদ আর মেঘের সমারোহের দিকে তাকিয়ে শিল্পী ভাবতে লাগল, এই আকাশের সঙ্গে তার জীবনের কোনও যোগাযোগ আছে কিনা, না তা শুধু ময়লাযুক্ত সবুজ রঙের পতপত করে উড়াতে থাকা জালগুলোর সঙ্গেই আছে!

হঠাৎ বিদ্যুৎ বাতির হলুদ-কুসুমের মতো রঙ ছড়িয়ে পড়েছে গাছের গায়ে, তখনই ভুলে যাওয়া কোনও এক কথা তার মনে ভেসে উঠতে চাইল। বুকের ভেতর কেমন যেন একরকম অনুভূতি জেগে উঠল, যা থেকে সে নিষ্কৃতি চেয়েছিল, যদিও এখন তা সে চায় না; তাই অল্পসল্প বেদনা-বিষাদের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখ জুড়ে, দুঃখ-দুঃখসুখ আর কী!

গভীর সন্ধ্যাকালের আকাশ, আশপাশের গাছপালাগুলোর গায়ে ভেজা সন্ধ্যার ছায়া, গাঢ় ধূসর বর্ণের আকাশের গা ঘেঁষে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি ঝরছে কয়েকদিন ধরে, থামছে না একমুহূর্তের জন্যও। বিলাতি মনেও, কিভাবে কে জানে, মেঘলা আকাশ বিরক্তিকর একরকম উপলক্ষ্য তৈরি করে চলেছে।

হঠাৎ বৃষ্টির দাপটে ভেজানো কপাটের ফাঁকে একটুকরো হিমেল হাওয়া ফুরুৎ করে ঘরে প্রবেশ করে দেয়ালে টাঙানো বাংলার জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের তৈলচিত্রটির ওপর আঘাত হানল, সঙ্গে সঙ্গে

সেটি ঝনাৎ করে ভূপতিত হল। ত্বরিৎ বেগে তা তুলে নিয়ে নীলা জলদগম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আমার করণীয় আপনি বলে দেন।’ পাঠক-সাধারণ ‘অনিকেতন’ পাঠ করে তৃপ্তি লাভ করবেন, সেইসঙ্গে অভিজ্ঞতার নূতন দিগন্ত উদ্ঘাটিত হবে, যা সাহিত্যপাঠের ফল-লাভের মতোই স্বাদে-গন্ধে-পুষ্টিতে ভরপুর। দীর্ঘদিন বিদেশি ভাষার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগযুক্ত থাকায় তার নিজস্ব মাতৃভাষায় একটি নূতন ভঙ্গিমা ফুটে বেরিয়েছে। এটা তার একান্তই নিজের ভাষা, অনুকরণীয় অথচ বাংলা ভাষায় সমীকৃত। সংলাপ নির্মাণের শৈল্পিক শক্তি এবং নাট্য সংহতিতে ‘অনিকেতন’ উপন্যাস সুসংহত ও অসাধারণ। বোধ-বোধি, ব্যক্তি-পরিবার-সামাজিক দ্বন্দ্বে বাস্তবস্পর্শী জীবন-অর্থ ও শিল্পকলার ঔজ্জ্বল্যে ‘অনিকেতন’ স্বায়ম্ভুব। [প্রিয়মুখ প্রকাশন। ২০১৬।

প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৬, ০৭:০২ পি. এম.

১৭/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: