১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এক স্বজনের ফিরে আসার দিন


১২ মাসে ১৩ পার্বণ যে বাঙালীর, সেই জাতির জন্য আজ ১৭ মে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। দেশ ও জাতির ইতিহাসের চাকা আজকের এই দিনটি থেকে পেয়েছিল নতুন গতি। দিশেহারা জাতি ১৯৮১ সালের এই দিনটিতে এসে খুঁজে পেয়েছিল নতুন আশ্রয়। বাঙালীর ইতিহাস এই দিন থেকে আবার নতুন করে লেখা হয়েছিল।

১৯৭১ সালে একটি সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা বাঙালী জাতি মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দিশে হারায়। আন্তর্জাতিক মহল ও দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় একটি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে নিজের বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আকস্মিক এই ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়ে জাতি। রাজনীতি হয়ে যায় গৃহবন্দী। প্রকাশ্য সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ। সান্ধ্য আইনের ঘেরাটোপে বন্দী অদ্ভুত এক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয় দেশে। প্রাণ খুলে কথা বলার উপায় ছিল না। অপহরণ করা হয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার স্বাধীনতা। সেই অবরুদ্ধ দিনের অর্গল খুলে যাওয়ার দিন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। মানুষের প্রাণের আকুতি ভাগাভাগি করে দেয়ার এই দিনটি বাঙালীর কাছে বিশেষভাবেই স্মরণীয়। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে স্বাধীনতার স্বাদ পাবার দিন আজ। উর্দিধারী শাসকগোষ্ঠীকে প্রবল ঝাঁকুনি দেয়ার দিন ১৭ মে। সর্বস্বহারা এক নারী আজকের এই দিনে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর আত্মিকস্বজন। দিশেহারা বাঙালী জাতি আজকের এই দিনেই খুঁজে পায় নতুন নেতৃত্ব, আস্থা ও বিশ্বাস। দেশের মানুষের হতাশা ও বেদনার দিন অপসারণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ১৯৮১ সালের আজকের এই দিনেই দীর্ঘ ছয় বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসেন আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

১৯৮১ সালের আগে নিতান্তই আটপৌরে জীবন ছিল তাঁর। আর দশটা বাঙালী নারীর মতোই প্রতিদিনের ঘরকন্না করে দিন কাটছিল। তবে রাজনীতি ছিল তাঁর রক্তকণায়। ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকারী ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজের ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। এই কলেজ শাখা ছাত্রলীগের প্রথমে সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতিও হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একজন সদস্য ও ছাত্রলীগের রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই সকল গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাজনীতিবিদ বাবার আদর্শের পতাকা হাতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে থেকে শুরু হলো তাঁর নতুন পথচলা। দেশের প্রাচীন ও প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েই দেশে ফিরেছিলেন তিনি। সেদিন তিনি দেশে এসেছিলেন একা। কিন্তু তাঁর এই নিঃসঙ্গ একাকিত্ব কাটিয়ে উঠতে মোটেও অপেক্ষা করতে হয়নি তাঁকে।

১৭ মে, ১৯৮১। সেদিন ঢাকার সব পথ মিশে গিয়েছিল বিমানবন্দর ও মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতে। আসলে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি চাইছিল যে মানুষ, তারা বুঝেছিল তাদের ত্রাতা আসছেন। আসছেন সেই দিকনির্দেশক, যিনি মুক্তির অগ্রযাত্রায় আসন্ন বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন। মানুষের অধিকার ফিরে পাবার আন্দোলনে নতুন গতি যে তাঁরই যোগ্য নেতৃত্বে নতুন করে সূচিত হবে, তা বুঝতে এ দেশের মানুষের একটুও সময় লাগেনি। বঙ্গবন্ধুর মতো উদারপ্রাণ, মহৎ মানুষকে হারিয়ে এ দেশের মানুষ তখন এমন কাউকে খুঁজছে, যাঁর ওপর শতভাগ নির্ভর করা যায়। মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবেই তাঁর ফিরে আসা এই মাটিতে।

তারপর এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বারবার শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়েছে তাঁকে। করা হয়েছে অন্তরীণ। হত্যার জন্য কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা হয়েছে তাঁর ওপর। ছোট একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরা যেতে পারে। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সামরিক সরকার তাঁকে ১৫ দিন অন্তরীণ রাখে। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও নবেম্বর মাসে তাঁকে দুইবার গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২ মার্চ তাঁকে আটক করে প্রায় তিন মাস গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি ১৫ দিন গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে ১১ নবেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করে এক মাস অন্তরীণ রাখা হয়। ১৯৮৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আবার গৃহবন্দী করা হয় তাঁকে। ১৯৯০ সালে ২৭ নবেম্বর তাঁকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাব-জেলে পাঠায়।

রাজনীতি ও জনকল্যাণের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাও করা হয়েছে। ১৯৮৭ সালের ১০ নবেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী পালনকালে তাঁকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তাঁকেসহ তাঁর গাড়ি ক্রেন দিয়ে তুলে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে তাঁকে লক্ষ্য করে এরশাদ সরকারের পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী শহীদ হন। লালদীঘি ময়দানে ভাষণদানকালে তাঁকে লক্ষ্য করে দুইবার গুলিবর্ষণ করা হয়। জনসভা শেষে ফেরার পথে আবারও তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তাঁকে হত্যার জন্য বারবার হামলা করা হয়। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন চলাকালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে তাঁর কামরা লক্ষ্য করে অবিরাম গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় হেলিপ্যাডে এবং তাঁর জনসভাস্থলে ৭৬ কেজি ও ৮৪ কেজি ওজনের দুটি বোমা পুঁতে রাখা হয়। তিনি সেখানে পৌঁছার আগেই বোমাগুলো শনাক্ত হওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। বিএনপি সরকারের সময় প্রাণঘাতী হামলা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ঐদিন বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউতে এক জনসভায় বক্তব্য শেষ করার পরপরই তাঁকে লক্ষ্য করে এক ডজনেরও বেশি আর্জেস গ্রেনেড ছোড়া হয়।

সব চক্রান্তের জাল একে একে ছিন্ন করে তিনি বাঙালীকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়ার ব্রত থেকে একটুও বিচ্যুত হননি এই বিশ্ববরেণ্য নেত্রী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে এই দেশে। কার্যকর হয়েছে দ-। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর দ- কার্যকর হয়েছে। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো যৌক্তিক পর্যায়ে সমাধান হয়েছে। বাস্তবায়িত হয়েছে সীমানা চুক্তি। বিনিময় হয়েছে ছিটমহল। দেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে যে বিরোধ ছিল আন্তর্জাতিক আদালতে তার সমাধান হয়েছে। বাংলাদেশ যে আজ বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে তার শতভাগ কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। তাঁর যোগ্য নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেছে।

জনকল্যাণের ব্রত সাধনার মন্ত্রে নতুন দীক্ষা নিয়ে আজকের এই দিনে এক নিঃস্ব নারী পিতৃভূমিতে পা রেখেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন তিনি একেবারেই একা নন। বাংলার মানুষ রয়েছে তাঁর পাশে। এরাই তাঁর আত্মার আত্মীয়। হার্দিক উষ্ণতায় মানুষ তাঁকে বরণ করে নিয়েছিল। নিজেকে উজাড় করে একরাশ বৃষ্টির মধ্যে তিনিও ভেসে গিয়েছিলেন আবেগের অশ্রুতে। সেই তিনি আজও মানুষের মুক্তির প্রতীক। আজকের এই দিনটিকে তাই বিশেষভাবে স্মরণ করি। স্মরণ করি সেই বর্ষণমুখর দিন, যেদিন তিনি ফিরেছিলেন বাংলাদেশে, মানুষের কল্যাণ সাধনার নতুন মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে। নতুন করে জেগে ওঠা বাংলাদেশের প্রতীক শেখ হাসিনা। আজকের দিনে প্রার্থনা করি তাঁর জয় হোক। জয় হোক বাংলার মানুষের। জয় বাংলা!

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

nayrul@gmx.at