২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

শেখ হাসিনা আছেন বলে বাংলাদেশ বাংলাদেশেতেই আছে


কবি নির্মলেন্দু গুণ শেখ হাসিনার বিশ^বিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী ছিলেন। এই লেখার প্রারম্ভে ১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণকে লেখা শেখ হাসিনার অসাধারণ চিঠির কথা সামাজিক গণমাধ্যমের কারণে অনেকেরই নজরে এসেছে। ছোট্ট চিঠিটার হুবহু পাঠকদের জন্য উৎকলন করছি-

“বন্ধুবরেষু গুণ,

আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। ‘ত্রাণ বিতরণ করছি’ এ ধরনের কোন ছবি ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে। ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণী যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না। ওদেরই সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়ে আবার ওদেরই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে সাহায্যদানের নামে হাতে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ অথবা প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস আমি মানসিকভাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার বিবেকে বাধে। তবুও অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আমিও করি। বিবেকের টুঁটি চেপে ধরে অনেক সময় সমাজ রক্ষার তাগিদে, সাথীদের অনুরোধ বা অপরের মান রক্ষার জন্য এ ধরনের কাজ বা ছবি তুলতে হয় বৈকি। তবে যে যাই দান করুক না কেন, বিলি করুক না কেন, এটা তো ওই গরিব মানুষগুলোর অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য। ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেয়া ওদেরই সম্পদ অথবা ওদের পেটের ক্ষুধা দেখিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভিক্ষে এনে এদের দান করা। এখানে ‘ক্রেডিট’ নেয়ার সুযোগ কোথায়? এই ‘ক্রেডিট’ নিতে যাওয়াটা কি দুর্বলতা নয়? আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? কতকাল আর বিবেককে ফাঁকি দেবে? এই গরিব মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে আবার এদেরই হাতে ভিক্ষে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ইমেজ তৈরির পদ্ধতি আমি পছন্দ করি না। আমি মনে করি যা দান করব তা নীরবে করব, গোপনে করব। কারণ এটা লজ্জার ব্যাপার, গর্ব করার ব্যাপার মোটেই নয়। গর্ব করার মতো কাজ হতো যদি এই সমাজটাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়া যেত। গর্ব করার মতো হতো যদি একখানা কাঙালের হাতও সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে না দিত। ফুটপাথে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ভিক্ষের হাত না বাড়াত সেটাই গর্ব করার মতো হতো। যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখেছিলেন, সে দিন কবে আসবে? আমার অনুরোধ আপনার কাছে, সেই ছবি ছাপাবেন না যে ছবি হাত বাড়িয়েছে সাহায্য চেয়ে, আর সেই হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অনেকেই তুলে থাকেন। আমার বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় গরিব মানুষদের কাছে মুখ দেখাতে। আমরা সমাজে বাস করি। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারি। ভালোভাবে বাঁচতে পারি। কিন্তু ওরা কি পাচ্ছে? ওদের নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা কেন? ওরা বরদাশত করবে না, একদিন জেগে উঠবেই। সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। আমার অনুরোধ আশা করি রাখবেন।

শুভেচ্ছান্তে

শেখ হাসিনা

৯.১০.৮৮”

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর মানুষের ওপর ঋণের বোঝা বাড়ানো হয়েছে। ধনী আরও ধনী হয়েছে, গরিব আরও গরিব হয়েছে। শেখ হাসিনা দেশে আসার পর থেকে ক্ষমতায় থাকুন আর না-ই থাকুন সব সময় চেষ্টা করেছেন মানুষের কষ্ট কিভাবে লাঘব করার যায়। দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সব সময় তাঁর চেষ্টা ছিল কিভাবে দেশের জনগণের ঋণের বোঝা কমানো যায়।

১৯৯৭ সালে মাইক্রোক্রেডিট সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় তিনি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। হোয়াইট হাউসের ওই সাক্ষাত অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশ ওই সময় পর্যন্ত যে ঋণ নিয়েছিল তা যেন মওকুফ করে দেন। সেই সময় প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন মোট ঋণের একাংশ মওকুফ করে দেন। সেই মওকুফ করা অর্থ বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণসহ বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যবহারের সিদ্বান্ত নেয়া হয়েছিল।

বেগম সুফিয়া কামাল শেখ হাসিনাকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসতেন। তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে নিয়ে এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেনÑ ‘পরম প্রত্যাশায় আছি, শেখ হাসিনা মৃত্যুর ভয়ে পশ্চাৎপদ হননি। সাহসের সঙ্গে সংগ্রামে এগিয়ে অগ্রবর্তিনী হয়ে আমাদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন আর ঘাতক মূষিক গোপন থেকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পদদলিত হওয়ার আশঙ্কায় কৃমিকীট হয়ে আত্মগোপন করেছে। আল্লাহ সহায় হোন, শেখ হাসিনা অজেয় অমরত্ব লাভ করে সর্বদলের বিজয়িনী হয়ে বিরাজ করুন এই প্রার্থনা আজ সর্বজনার কাছে।’ এ জাতীয় আশীর্বাদ প্রার্থনায় শেখ হাসিনা বিজয়িনী হয়ে আছেন। বলার অবকাশ রাখে না, বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে শেখ হাসিনার আবির্ভাব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কেবল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবে নয়, নিজের চারিত্রিক গুণাবলী, যোগ্যতার বলে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের শীর্ষপদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি বলে অভিহিত করা যেতে পারে। তাঁকে আধুনিক ভারতের রূপকার প-িত জওহরলাল নেহরু তনয়া শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যদি তুলনা করা যায় তাহলে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না।

তাঁর প্রিয় শিক্ষক এবং বাংলা সাহিত্যের এক ঈর্ষণীয় দিকপাল প্রফেসর আনিসুজ্জামান ‘ওরা টোকাই কেন’ বইটির ভূমিকায় লিখেছেন, “নিজের চারপাশটা যেমনভাবে দেখেছেন লেখিকা, তেমনি তা ফুটিয়ে তুলেছেন। যাকে বলা যায় ছক-কাটা রচনা, এ বইয়ের প্রবন্ধগুলো তা নয়। এগুলো হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত লেখা।” তিনি এ-ও লক্ষ্য করেছেন, শেখ হাসিনা লিখতে লিখতে বদলে ফেলেছেন। মানুষের কথা বলতে বলতে প্রকৃতির কথায় চলে গেছেন। প্রকৃতির কথা বলতে গিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির কথায় চলে গেছেন। নারী-নির্যাতনের কথা থেকে অনায়াসে স্বাস্থ্যের কথা এসে গেছে। “সমাজের অধিকাংশ মানুষ অন্ন বস্ত্র চিকিৎসা আশ্রয়ের অভাবে পীড়িত। এই অভাব যে একটা সমাজ ব্যবস্থার ফল, সেই সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ যে মানুষকে শোষণ করে চলেছে, সেই শোষণকে যে সুযোগ করে দিচ্ছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বৈরাচার পাকাপোক্ত করতে যে ধর্মের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে- এসব কথাই তিনি বলেছেন। গভীর এক বেদনাবোধ থেকে শেখ হাসিনা অবলোকন করেছেন পারিপার্শ্বিক। সেই বেদনাবোধ ছড়িয়ে আছে তাঁর রচনার অধিকাংশ স্থানে।” (আনিসুজ্জামান, ‘ভূমিকা’, ‘ওরা টোকাই কেন’, ১৯৮৯, আগামী প্রকাশনী)

নেতাজী সুভাষ বসু বলতেন, ‘আদর্শকে ষোলো আনা পাইতে হইলে নিজের ষোলো আনা দেওয়া চাই।’ সেই ষোলো আনা দেয়ার মতো মানসিকতা সচরাচর মানুষের মধ্যে থাকে না। অবশ্যই শেখ হাসিনা দেশের মানুষকে ষোলো আনা দেয়ার জন্য ৩৪ বছর আগে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ইতিহাসের এক জটিল সময়ে তাঁকে জাতির পরিত্রাণকর্তার দায়িত্ব নিতে হয়।

শেখ হাসিনা বোধ হয় একমাত্র নেতা যিনি জীবনবোধের কথা বলতে গিয়ে অকপটে নিজেকে মেলে ধরেছেন। কোন বাঁধাধরা তত্ত্বে নিজেকে তিনি আটকে রাখেননি। খোলা মনে খোলা চোখে শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়ে সবকিছু তিনি যাচাই করে দেখেছেন আর সেইসঙ্গে পুরনোকে ছাড়িয়ে নতুনের দিকে বাড়িয়েছেন তাঁর হাত। শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১৯৮১ সালের ১৬ মে) আগের দিন পত্রিকায় সংবাদ ছিল ‘শেখ হাসিনার আগমন প্রতিরোধ কমিটি তাদের কর্মসূচী আপাতত স্থগিত করেছে।’ বাংলাদেশের এখনকার রাজনীতিও বলে দেয় সেই প্রতিরোধ কমিটির কুশীলব এবং উত্তরসূরিরা এখনও সক্রিয়। ১৯৮১ সালের ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে শেখ হাসিনা সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেই তিনি বাংলাদেশে যাচ্ছেন। শুধু ১৯৮১ সালে নয় ২০০৭ সালের ৭ মে আবারও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তখনও কোন ষড়যন্ত্র তাঁর গতিপথ রুদ্ধ করতে পারেনি। সত্য যেখানে বিপজ্জনক সেখানে সত্যকে তিনি ভয় করেননি, মিথ্যে যেখানে সুবিধাজনক সেখানে তিনি সহায়তা করেননি মিথ্যেকে। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে প্রকৃত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জোরালো নেতৃত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ফিলিপিন্সের ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ’ তাদের ৪৫৩ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতাকে ‘কনগ্রেশনাল মেডেল অব এ্যাচিভ্মেন্ট’ প্রদানের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২০০৫ সালের ৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে উল্লিখিত পুরস্কার প্রদান করা হয়। ‘এ্যাসোসিয়েশন অব এশিয়ান পার্লামেন্টস্ ফর পিস্’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এশিয়াকে একত্রিত করা, গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য তাঁকে উল্লিখিত পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তারপর তিনি যা-ই করেছেন তা হয়ে গেছে ইতিহাসের অঙ্গ। স্বৈরাচারী আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা, বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সফল আন্দোলন করা, প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তার ওপর আবার বিরোধী দলের নেত্রী, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং আবার প্রধানমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হওয়া। প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, তাঁর এই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাই তাঁকে অনেক প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের চাইতে সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনায় সাহায্য করেছে।

যার সঙ্গে স্কুল জীবন থেকে বন্ধুত্ব অটুট সেই সুলতানা কামাল কি সবসময় শেখ হাসিনার পক্ষে বলেন? কিন্তু প্রকৃত মূল্যায়নে যথার্থ অবস্থানে থাকেন। ‘শেখ হাসিনার ভিতরে অত্যন্ত আন্তরিক, বন্ধুবৎসল, মানবিক একটা সত্তা আছে, যেখানে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের কোন স্থান নেই। দরিদ্র, বঞ্চিত মানুষের জন্য তাঁর আছে গভীর মমতা। এ দেশের মাটির সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় সম্পর্ক তার প্রতিফলন পাওয়া যায় চলনে-বলনে, আচার-আচরণে। তাঁর বন্ধুত্বের স্পর্শ পাইনি এমন কথা আমরা বন্ধুরা বলতে পারব না। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নেতার জন্য যেমন জনসাধারণের থাকে নিঃশর্ত ভালবাসা ও বেহিসেবি আনুগত্য, একইভাবে নেতৃত্বে থাকলে তার দোষ-গুণের বিচার হয় অনবরত চুলচেরা হিসাবে। সেই হিসাবের কাছে নিজেকে তুলে ধরার যে সাহস নিয়ে হাসিনা নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছে তার জন্য রইল অভিবাদন।’

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল শিল্পী শাহাবুদ্দিন যেন পাবলো পিকাসোর মতো ছবি আঁকেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্যারিসে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর জবানীতে কথাগুলো উঠে এসেছে এভাবেÑ ‘আপা বিরোধী দলের নেত্রী থাকাকালে মিন্টো রোডে বাসভবনে এক ফরাসী সাংবাদিককে নিয়ে যাই। প্যারিসের নামকরা ম্যাগাজিন ‘নুভেল অবজারভেতর’-এর সাংবাদিক মহিলার নাম শার্লট। ঢাকার ফরাসী রাষ্ট্রদূত আপাকে টেলিফোন করে অনুরোধ করেছিলেন শার্লটকে সাহায্যের জন্য। জানতেন আপার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা। মিন্টো রোডে আপার সাক্ষাৎকার হয়েছিল এক ঘণ্টার। নিতে নিতে দুপুরে খাবার সময় হয়ে যায় । আপা আমাকে বললেন: এখন কোথায় যাবে? দুপুরে খেয়ে যাবে। আর সাংবাদিককে বল আমাদের সঙ্গে খাবে কি-না। আমার এখনও মনে পড়ে শার্লট খুবই অবাক হয়েছিল। একজন নেত্রীর অনাড়ম্বরতায়। খাবার টেবিলে উনি নিজেই সবাইকে দেখাশোনা করেছেন। পরিবেশন করেছেন বাঙালী মা-বোনেরা যেভাবে করেন। পরে রিক্সায় শার্লট বলেছিল- রাজনীতিবিদ পরিচয়ের বাইরে একজন নারীর মাতৃসুলভ ব্যবহার দেখে সে মুগ্ধ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্যাটার্নের সাদৃশ্য খুব বেশি। ত্যাগ, প্রজ্ঞা, ঐক্যচেষ্টা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, ভাবাদর্শের যুগোপযোগী সমন্বয় ইত্যাদি দিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পিতা-কন্যার মধ্যে অদ্ভুদ মিল। পার্থক্য শুধু প্রেক্ষাপটগত। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছিল বিজাতীয় পশ্চিমা পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, আর শেখ হাসিনাকে লড়তে হয়েছে ১৯৭৫-এর খুনী আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী প্রতিবিপ্লবের বেনিফিসিয়ারীদের বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার সর্বাত্মক অপচেষ্টার বিরুদ্ধে।

শেখ হাসিনাকে সকল প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে আওয়ামী লীগ নামক দলটিকে টিকিয়ে রাখতে হয়েছে। এই কাজটিই যে কতটা কঠিন ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর মধ্যে তো একবার আওয়ামী লীগ ভেঙেও গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তখনকার আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই মনে করেছিলেন যে, শেখ মুজিবের মেয়ে হিসেবে শেখ হাসিনা এই দেশে এসেছেন, তাঁকে সামনে শিখ-ী রেখে তারা আওয়ামী লীগ চালাবেন। দলকে এগিয়ে নিয়ে একটু শক্ত অবস্থানে পৌঁছার পর শেখ হাসিনাকে মাইনাস করে তারাই হবেন সর্বময় কর্তা। আসলে মাইনাসের এই থিওরি সেটা নতুন কিছু নয়, বহু পূর্বে সেই আশির দশকে এর শুরু। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করা অনেক রাজনীতিবিদই মনে মনে একথা পোষণ করতেন যে, শেখ হাসিনা কী জানেন? তারা শেখ হাসিনাকে নিছক নারী এবং শেখ মুজিবের কন্যা ছাড়া আর কোন স্থান দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। দলের প্রথম সারির নেতারা অল্পদিনের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলেন তাদের এই চিন্তা আসলে ভুল, শেখ হাসিনা অন্য ধাতুতে গড়া। আধুনিককালের চলমান পটের ওপর তিনি নিত্যকালের চিত্র রেখে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনা পরিত্রাণকর্তা হয়েছিলেন বলে বাংলাদেশ বাংলাদেশেতেই আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক