২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ভালবাসার দায়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় তোলপাড়


জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ পুরো পৃথিবী যেখানে ভালবাসার কাঙ্গালÑসেখানে উল্টো হেঁটে স্রেফ বিশুদ্ধ ভালবাসার প্রতিদানে ১১ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে ঢাকা কমার্স কলেজ কর্তৃপক্ষ। নিখুঁত পবিত্র ভালবাসার অপরাধে ২ শিক্ষার্থীকে কলেজ থেকে বহিষ্কার ও ৯ জনের ভর্তি বাতিল করায় এখন সমালোচনার ঝড় সর্বত্র। ক্ষোভে ফেটে পড়া প্রতিক্রিয়ায় সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ভার্চুয়াল দুনিয়া। কলেজের অভ্যন্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ আর অভিমান। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ভুল এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন অনেকেই। সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি অবশ্যই ঢাকা কমার্স কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি কলেজের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে একাদশ শ্রেণীতে পড়ুয়া মাসবুরা সামিহা কায়নাত ও শাফিন আহমেদ খানকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করে। শুধু তাই নয়, আরও ৯ জন শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করে প্রতিষ্ঠানটি। সামিহা ও শাফিনের অপরাধ দু’জন দু’জনকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। আর বাকি ৯ বন্ধুর অপরাধ ছিলÑনিখুঁত পবিত্র ভালবাসার প্রতি শুভ কামনা জানিয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠা!

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সামিহা ও শাফিন ভালবেসে আবেগী হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে একে অপরকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। এ সময় অন্য বন্ধুরা তাদের শুভ কামনা জানান, আর এই দৃশ্য কেউ একজন মোবাইলে ধারণ করেন। পরে ওই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে- যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়।

ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। একটু পরে বাকি শিক্ষার্থীরা হাতে হাত ধরে দুজনকে আলাদা করে মানববৃত্তের ভেতরে নিয়ে আসেন। বৃত্তের ভেতরে ছেলেটি হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটির হাতে একটি আংটি পরিয়ে প্রপোজ করেন। মেয়েটি ছেলের প্রপোজে সায় দেন ও পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেন।

আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। লঘু কোন শাস্তি নয়, পুরো জীবন নিয়ে খেলা! একটি নয়- ১১ টি! কেউ কেউ বলছেন, সাময়িক কোন শাস্তি দেয়া যেত বৈকিÑ তাই বলে ভবিষ্যত জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া এ আবার কেমন সিদ্ধান্ত!

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে হারুন উর রশিদ লিখেছেন, ‘অস্বাভাবিকতার বিরুদ্ধে কমার্স কলেজের ১১ শিক্ষার্থী এক নতুন আলো দেখিয়েছে। ভালবাসার বৃত্ত গড়েছে। মানবিক এক ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে তুলেছে লাভ সার্কেল। এই ভালবাসার বৃত্ত যত বাড়বে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম ততই প্রকৃত ভালবাসা শিখবে। ইভটিজিং নয়, এ্যাসিড ছুড়ে নয়, নরম হৃদয় দিয়ে হৃদয়কে জয় করতে হয়। প্লিজ এমন ভালবাসাকে শাস্তি দেবেন না। ওদের ভালবাসাকে বাঁচতে দিন।’

আর কলেজে থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক অফিস বিজ্ঞপ্তিটিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছবি শেয়ার দিয়ে ইফতেখার মাহমুদ নামে একজন লিখেছেন, ‘রাজনীতি আর ধূমপান মুক্ত লেখা ছিল, নোটিস দেখে মনে হচ্ছে এরপর প্রেমমুক্ত কলেজ ঘোষণা করবে।’ তার পাল্টা উত্তরে ফেরদৌস আহমেদ ফয়সাল নামে একজন মন্তব্য করেন, ‘রাজনীতি মুক্ত বলতে ৭১ এর চেতনা মুক্তও এদের উদ্দেশ্য। আর প্রেমমুক্ত মানে জঙ্গী তৈরি, যাদের মনে মানুষের প্রতি প্রেম থাকবে না।’ সত্যিই তাই- প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক কর্মকা- যেন ফয়সালের করা মন্তব্যের মতোই।

ফেসবুকে এক সাংবাদিক লিখেছেনÑ ‘খুনোখুনির দেশে ভালবাসাটা শিখে গেছে ওরা। আগে ভাগেই শিখে গেছে। স্রেফ এই কারণে ১১টি ছেলেমেয়ের ভবিষ্যত খুন করল কমার্স কলেজ কর্তৃপক্ষ। না, আমরা কান ধরে ওঠ-বস করানোর পক্ষে না। মাননীয় অধ্যক্ষ- অত মুরোদ আমাদের নেই। তবে হ্যা, ধিক্কারটুকু জানিয়ে রাখলাম। লেখা পড়া নিশ্চয়ই অনেক করেছেন। এখন পারলে একটু শিক্ষিত হন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসার মোঃ আবু সাঈদ জনকণ্ঠকে বলেন, ‘কলেজের শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করায় অমরা ২ জনকে বহিষ্কার ও ৯ জনের ভর্তি বাতিল করেছি। সিদ্ধান্তটি আমার একার নয়, কলেজের ৩টি কমিটির সম্মিলিত আলোচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়ায় এর কোন ভুল হতে পারে না।’ ফেসবুক ও ভার্চুয়াল দুনিয়ার সমালোচনার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি সমালোচনা করে তিনি যেন আমার সামনে এসে সমালোচনা করেন।’ অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘৯ জন শিক্ষার্থীর পরিবার যদি এসে উপযুক্ত মুচলেকা দেয় তাহলে হয়ত আমরা সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারি।’ তবে বহিষ্কার হওয়া শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সামাজিক ক্ষোভ বিরাজ থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ অনড়। আর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তিবর্গ কলেজ কর্তপক্ষকে ১১ শিক্ষার্থীকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: