মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বিএনপির রাজনীতিতে সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হন আসলাম

প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৬

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ বিএনপির রাজনীতিতে সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হয়েছেন আসলাম চৌধুরী। এখন তার অনেক নাম, অনেক পরিচিতি। বর্তমানে দলের যুগ্ম-মহাসচিব তিনি। দলের সর্বশেষ কমিটিতে তার এই পদোন্নতি। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর আগেও ক’জনই বা জানত এই নামটি। ছাত্রজীবনে রাজনীতির ধারেকাছে ছিলেন না। তবে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল বলে চাউর রয়েছে। সেই আসলাম চৌধুরী এখন বিএনপির বড় নেতা। রাতারাতি এমন উত্থানে হতবাক খোদ বিএনপিরই অনেক নেতাকর্মী। কারণ দীর্ঘ সময় মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেও কেন্দ্রীয় পদ জোটেনি তাদের। তাহলে এমন কী ভূমিকা আসলাম চৌধুরীর ছিল, যার জন্য বড় পদ দিয়ে তাকে এভাবে পুরস্কৃত করা হলো? আন্দোলনের নামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকু- এলাকায় নাশকতা এবং সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লবিং মেইনটেইন করার পুরস্কার নয় তো? এমন অনেক প্রশ্ন এখন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে।

একদা অপরিচিত আসলাম চৌধুরী নামটি এখন দেশজুড়ে আলোচিত। ভারতে একাধিক দফায় তিনি বৈঠক করেছেন ইসরাইলের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি এ্যান্ড এ্যাডভোকেসির প্রধান মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে। তিনি লিকুদ পার্টির একজন নেতাও। মোসাদ প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাত ও বৈঠকের ছবি প্রকাশিত হয়েছে ইসরাইলের ‘জেরুজালেম অনলাইন ডটকম’-এর প্রতিবেদনে। সেই থেকে আসলাম চৌধুরীকে নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। এ দেশে ক্ষমতা দখল ও সরকার হটাতে ষড়যন্ত্রের ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেও হাত মেলানো! এ বৈঠক একান্ত ব্যক্তিগত নাকি দলের হাইকমান্ডের জ্ঞাতসারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, বিএনপির রাজনীতিতে অনেকটাই নবাগত আসলাম চৌধুরী সেই পর্যায়ের লোক নন, যিনি দলকে না জানিয়ে বা দলের পরামর্শ ছাড়া স্বউদ্যোগে এমন সাহস দেখাবেন। বরং এ ধরনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বলেই আসলাম চৌধুরীকে এক লাফে দলের যুগ্ম-মহাসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে বলে অভিমত অনেক নেতার। তবে আসলাম চৌধুরী নিজেও অস্বীকার করেননি ‘মোসাদ কানেকশন’। যেভাবে ছবি, ভিডিওসহ প্রমাণ রয়েছে তাতে অস্বীকার করার সুযোগও নেই। বলেছেন, তার দল সব জানে।

বিএনপির আসলাম চৌধুরীর এই পর্যায়ে উত্থান বিস্ময়কর। তিনি ২০০২ সালে জিয়া পরিষদের মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। জিয়া পরিষদ সেই অর্থে বিএনপির স্বীকৃত কোন অঙ্গসংগঠন নয়। পাওয়ার পলিটিক্সে আছে এমন দলগুলোর নেতার নামে এমন অনেক সংগঠনই থাকে। তিনি হন সংগঠনটির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক। বিএনপির রাজনীতিতে মূলত তার অনুপ্রবেশ ঘটে দলটির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর হাত ধরে। এর পর তিনি ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য ও সহযোগিতা পান দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব তারেক রহমানের। এশিয়ার বৃহত্তম আদমজী জুটমিল ভাঙ্গার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি। এত অল্প সময়ের মধ্যে ওই পর্যায়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি অবাকই করার কথা। ২০০৪ সালে বিএনপিতে ঢুকে মাত্র তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০০৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। এটিও দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের অবাক করে দেয়ার মতো। এর পর উত্তর জেলা কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলে আসলাম চৌধুরীকে প্রদান করা হয় শীর্ষপদ। শুধু তাই নয়, সকল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেয়ার কর্তৃত্বও প্রদান করা হয় তাকে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকু-ে দু’বছর আগেও প্রায় প্রতিদিনই যে জ্বালাও-পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে তার নেপথ্যের অর্থ যোগানদাতা ছিলেন আসলাম চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগে মামলাও রয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ মোসাদ কানেকশন প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর পরিষ্কার যে, তার দৌড় শুধুমাত্র যানবাহনে নাশকতা পর্যন্ত নয়; তিনি আরও অনেক উচ্চমার্গীয়। ধারণা করা হচ্ছে, দলের এ্যাসাইনমেন্ট নিয়েই তিনি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে দেশীয় গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত পৌঁছেছেন। দলের সর্বশেষ কাউন্সিলে তাকে কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব করাও এরই পুরস্কার হয়ে থাকতে পারে। বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর টাকার কুমির বনে যাওয়াটাও বিস্ময়কর। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে চাকরির মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল তার কর্মজীবন। এর পর তিনি এফসিএ সম্পন্ন করেন। ক্ষমতাসীন দলের সংস্পর্শে থাকায় তার বিত্ত-বৈভবও বেড়ে ওঠে বেশ দ্রুত। উত্থান শুরু হয় সরকারী মালিকানার রুগ্ন শিল্পগুলো হস্তগত করার মাধ্যমে। সরকার ও ব্যাংকের সহায়তায় একের পর এক তিনি কিনে নেন রুগ্ন শিল্প। শিল্পগুলো নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি যেমন ব্যাংকঋণ নিয়েছেন তেমনিভাবে চালু করার নামেও ব্যাংকগুলো থেকে নিয়েছেন অর্থ। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকায় ব্যাংকঋণ পেতে তার সমস্যা হয়নি। দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংকে তার ঋণ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। রুগ্ন শিল্পগুলো তিনি চালু করতে পারেননি, ব্যাংকঋণও রয়ে গেছে অনাদায়ী।

শর্তসাপেক্ষে নেয়া ব্যাংকঋণের অর্থ তিনি যথাযথ খাতে ব্যয় না করে মনোনিবেশ করেন অন্যান্য ব্যবসায়। গড়ে তোলেন রাইজিং গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তার রয়েছে একাধিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে রয়েছে ‘কনফিডেন্স সল্ট’ নামের একটি লবণ কারখানা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার হারবাংয়ে গড়েছেন ‘ইনানী রিসোর্ট’। আছে মৎস্য কারখানা এবং বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি।

ব্যাংকের অর্থে ধনী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী। শিল্প কিনেছেন ব্যাংকঋণ দিয়ে, শিল্প চালুর নামেও ব্যাংকঋণ। কিন্তু তার মালিকানার প্রায় সকল শিল্পই রুগ্ন। দলে তার এমন বিস্ময়কর উত্থান নিয়ে নানা আলোচনা। কিন্তু সর্বশেষ মোসাদ কানেকশন ধরা পড়ার পর প্রশ্নÑ ‘তলে তলে এত?’ সেই আসলাম চৌধুরী এখন নিজেই যেমন গ্যাঁড়াকলে, তেমনিভাবে তার দলও আক্রান্ত মোসাদ ঝড়ে।

প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৬

১৭/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: