১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

জুলহাস-তনয় হত্যাকারী শিহাব রিমান্ডে


জুলহাস-তনয় হত্যাকারী  শিহাব রিমান্ডে

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ রাজধানীর কলাবাগানে জুলহাস মান্নান ও মাহবুব রাব্বী তনয় খুনের অভিযোগে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য শরিফুল ইসলাম ওরফে শিহাবকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩

দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। কুষ্টিয়া থেকে আটক শিহাবকে গ্রেফতারের পর আদালতে পাঠিয়ে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায় পুলিশ। হত্যাকারীরা এই হত্যাকা-ের প্রায় ২ মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছিল, যা মূলত এপ্রিল মাসকেই কাজের টার্গেট হিসেবে ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুর্বৃত্তরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী সেদিন হামলায় অংশ নিয়েছিল অন্তত পাঁচ থেকে সাত জন। হামলাকারীদের অস্ত্রাঘাতে ওই বাড়ির দারোয়ান পারভেজ মোল্লা আহত হন। খুনীদের বাধা দিতে গিয়ে আহত হন মমতাজ নামের এক এএসআই। খুনীরা পালানোর সময় তাদের কাছ থেকে একটি ব্যাগ ছিনিয়ে রেখেছিলেন মমতাজ, যেখানে ছিল একটি পিস্তল, একটি শাটারগান, গুলি ও মোবাইল ফোন। গ্রেফতারকৃত শিহাব ১৯৯৮ সাল থেকে হরকাতুল জিহাদের (হুজি) সদস্য হিসেবে সিলেট এলাকায় কাজ করত বলে পুলিশের দাবি। মুফতি হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয় এবং কুষ্টিয়া এলাকায় কাজ শুরু করে। বর্তমানে কুষ্টিয়ায় এই সংগঠনটির একটি ইউনিট পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে শিহাব।

রবিবার ডিএমপি মিডিয়া সেলের অতিরিক্ত কমিশনার এবং কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, শিহাব জানিয়েছে, হত্যাকারীরা গত এপ্রিল মাসকে টার্গেট করে ২ মাস আগে এই হত্যাকা-ের প্রস্তুতি নেয়। শিহাব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। হত্যার পর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা দুটি অস্ত্রের একটি (শাটারগান) নিজের বলে জানিয়েছে সে। এই খুনের ঘটনায় ‘অপারেশনের’ নেতাসহ তিনজনকে শনাক্ত করা গেছে উল্লেখ করে কাউন্টার টেররিজম বিভাগের এডিসি মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, “এখন পর্যন্ত আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি এই হত্যাকা-ে অস্ত্র সরবরাহের দায়িত্বে ছিল শিহাব। খুনীরা পালানোর সময় তাদের একজনের কাছ থেকে একটি ব্যাগ ছিনিয়ে রাখেন মমতাজ, যেখানে একটি পিস্তল, একটি দেশী আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও মোবাইল ফোন পায় পুলিশ। ডিএমপির নবগঠিত কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একটি দল কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ছয় রাস্তা মোড় থেকে শিহাবকে গ্রেফতার করেছে।

ঢাকায় ইউএসসএআইডির কর্মসূচী কর্মকর্তা জুলহাস মান্নান সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনির খালাত ভাই। তিনি সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাময়িকী ‘রূপবান’ সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন। তার বন্ধু তনয় ছিলেন লোকনাট্য দলের কর্মী। পিটিএ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে শিশু নাট্য প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন তিনি। গত ২৫ এপ্রিল কলাবাগানে বাড়িতে ঢুকে জুলহাস ও তনয়কে কুপিয়ে হত্যার পর আনসার আল ইসলামের নামে দায় স্বীকারের খবর আসে। জুলহাসের বড় ভাই মিনহাজ মান্নান ইমন ঘটনার দিনই কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যাতে অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়। আর এএসআই মমতাজের ওপর হামলা এবং অস্ত্র পাওয়ার ঘটনায় অন্য মামলাটি করেন কলাবাগান থানার এসআই শমীম আহমেদ। দুটি মামলারই তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ।

৩ দিনের জন্য রিমান্ডে ॥ জুলহাস মান্নান ও তনয় হত্যা মামলায় গ্রেফতার আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য শরিফুল ইসলাম ওরফে শিহাবকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। রবিবার দুপুরে শিহাবকে ঢাকার হাকিম আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের হেফাজতে নেয়ার আবেদন করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক বাহাউদ্দিন ফারুকী। শুনানি শেষে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম কায়সারুল ইসলাম ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন বলে জানান প্রসিকিউশন পুলিশের সহকারী কমিশনার মিরাশ উদ্দিন।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, এই শরিফুল ইসলাম শিহাব আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। সে দলীয় কর্মকা-ের জন্য অস্ত্র, গুলি ও ধারালো অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। ওই ঘটনায় আর কারা জড়িত তা জানতে শিহাবকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

দায় স্বীকারের বার্তা ॥ জুলহাস মান্নান ও তনয় হত্যার পর দায় স্বীকার করে আলকায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা ‘আনসার আল ইসলাম’। আনসার আল ইসলামের নামে খোলা টুইটার এ্যাকাউন্ট থেকে বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় এ দায় স্বীকারের বার্তা প্রচার করা হয়। আনসার আল ইসলামের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ শাখার মুজাহিদীনরা বাংলাদেশে সমকামিতা প্রসারের পথিকৃৎ, সমকামীদের গুপ্ত সংগঠন রূপবানের পরিচালক জুলহাস মান্নান ও তার সহযোগী মাহবুব তনয়কে হত্যা করেছে।’

আনসার আল ইসলাম রূপবানকে গুপ্ত সংগঠন দাবি করলেও এটি গুপ্ত সংগঠন নয়, এটি মূলত সমকামীদের অধিকারবিষয়ক একটি সাময়িকী। এটি ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম বের হয়। এরপর মাত্র একটি সংখ্যা বের হয়েছিল। জুলহাস ছিলেন সাময়িকীটির একজন সম্পাদক।

ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ছবি ॥ কলাবাগানে জোড়া খুনের ঘটনার তদন্তে ভিডিও ফুটেজ কাজ করবে বলে দাবি করেছিল পুলিশ। কিন্তু গ্রেফতারকৃত শিহাব ভিডিও ফুটেজে আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। খুনীরা খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে অন্তত ৩ জনকে হেঁটে যেতে দেখা যায় পাশের বিল্ডিংয়ের সিসি ক্যামেরায়। তবে সিসি ক্যামেরার ছবিতে যাদের দেখা যাচ্ছে তাদের ছবি স্পষ্ট না হওয়ায় খুনী চিহ্নিত করাটা কঠিন হচ্ছে। গ্রেফতারকৃত শিহাবকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেও এই বিষয়ে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।