২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

অশনি সঙ্কেত!


বৈশাখের তীব্র দাবদাহ ও অসহনীয় গরমে হাঁসফাঁসের পর গত ক’দিনের অকস্মাৎ ঝড়-বৃষ্টি মানুষের মধ্যে কিছু স্বস্তি এনে দিলেও বজ্রপাতে এত বেশি মৃত্যুর ঘটনা রীতিমতো উদ্বেগজনক। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এবং শুক্রবার সকালে বজ্রপাতে এ পর্যন্ত ৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহতের সংখ্যা বহু। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদদের এত বেশি বজ্রপাত এবং মৃত্যুর ঘটনা রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০১০ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বজ্রপাতে মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ ঘটে থাকে বাংলাদেশে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে এত বেশি মৃত্যু, যাদের মধ্যে ৭৬ ভাগ পুরুষ ও শিশু। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর তথ্যমতে, প্রতিবছর ৩০০ থেকে ৩৫০ জনের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে।

দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণের ফলে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মেঘ-বৃষ্টির সময় বায়ুম-লে ঋণাত্মক ও ধনাত্মক তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হয়। আর এর প্রভাবে তথা সংঘর্ষে প্রচ- বিস্ফোরণে উৎপত্তি হয় শক্তি, শব্দ ও আলো। স্বভাবতই আলোর গতিবেগ অনেক বেশি হওয়ায় আমরা আগে দেখি বিদ্যুত। পরে বজ্র তথা শব্দ। বজ্রপাতে মানুষ ও জীবজন্তুর মৃত্যু ঘটে প্রচ- তড়িৎপ্রবাহে। এক একটি বজ্রে তাপের পরিমাণ থাকে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিগ্রী ফারেনহাইট। গতি প্রতি সেকেন্ডে ৬০ হাজার মিটার। ফলে এর প্রচ- শক্তি সহজেই অনুমেয়।

আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে বজ্রপাতের আধিক্য। বাতাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন, ওজোন গ্যাস ইত্যাদির পরিমাণ বাড়ছে দিন দিন, যাকে বলা হচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। বাংলাদেশও এই বৃত্তের বাইরে নয়। এর মধ্যে রয়েছে উষ্ণ ও ক্ষতিকর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত এল নিনোর প্রভাব। মাত্রাতিরিক্ত গাছপালা কর্তন, নদ-নদীর ভরাট হয়ে যাওয়া, জলাভূমি হ্রাস, বনাঞ্চল ধ্বংস, মুঠোফোনের ব্যবহার বৃদ্ধিও বজ্রপাতের আধিক্যের কারণ। জীবনযাত্রার প্রয়োজনে আজকাল নর-নারী নির্বিশেষে মানুষকে ঘরের বাইরে থাকতে হচ্ছে। চলাচল অথবা কাজ করতে হচ্ছে হাটে-মাঠে-ঘাটে, হাওড়ে-বাঁওড়ে। ঝড়-বৃষ্টি হলেই শিশুরা ছোটে আমবাগানে আম কুড়াতে। এতেও বাড়ছে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা। বজ্রপাতের আরও একটি দিক হলো, এতে টিভি, ফ্রিজ, শীতাতপসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সমূহ ক্ষতি হয়ে থাকে।

বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় হলো, এ সম্পর্কে সাবধান ও সতর্ক থাকা। যেমন- ঝড়বৃষ্টির সময় উঁচু গাছপালার নিচে না দাঁড়ানো, বিদ্যুতের খুঁটি, লাইন, মোবাইল টাওয়ার ও উঁচু জায়গা থেকে দূরে থাকা। ফাঁকা জায়গা, মাঠ, ক্ষেত ও যাত্রী ছাউনিতে আশ্রয় না নেয়া। যানবাহনে বা গাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া। পানি থেকে দূরে থাকা। নৌকার ছাউনিতে ঢুকে পড়া। টিনশেড বাড়ি থেকে দূরে থাকা এবং পাকা বাড়িতে অবস্থান করা। সর্বোপরি বাড়ির জানালা বন্ধ করা এবং টিভি-ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ রাখা। বজ্র-ঝড়-বৃষ্টি সম্পর্কে আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস জানাও জরুরী।

আগে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে প্রায়ই বজ্রপাত নিরোধক ব্যবস্থা নেয়া হতো। ভবন নির্মাণে এটি বাধ্যতামূলক করা বাঞ্ছনীয়। শহর-নগর-গ্রাম-গঞ্জ-স্কুল-কলেজ সর্বত্র। এক তথ্যে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে জেলার সীমানা ও সীমান্ত চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত পিলারে শক্তিশালী চুম্বক স্থাপন করা হতো। সেগুলো সম্ভবত বজ্রপাতও আকর্ষণ করত। সে সবের অধিকাংশ বর্তমানে অরক্ষিত অথবা চুরি হয়ে গেছে। এর সঙ্গে বজ্রপাতের আধিক্য ও মৃত্যুর হার বাড়ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বজ্রপাতজনিত কারণে মৃত মানুষের লাশ চুরি যাওয়ার বিষয়টিও উপেক্ষণীয় নয়। এ বিষয়েও মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করা আবশ্যক।