১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

স্মরণ ॥ ‘মৃত্যু জীবনের শেষ নহে’


সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন (মানখিন) ১১ মে বুধবার, ভারতের মুম্বাইয়ের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। স্ত্রী মমতা আরেং, ৫ কন্যা, ১ পুত্র রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, ‘জাতি হারাল দেশপ্রেমিক আর দল হারাল পরীক্ষিত নেতা।’ খ্রীস্টানদের ধর্মগুরু আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি’রোজারিও সিএসসি, রমনা ক্যাথিড্রালে অনুষ্ঠিত প্রার্থনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, “মাননীয় প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন উত্তম উপাসক ছিলেন। তার মধ্যে ছিল ঈশ্বর ও দেশপ্রেমবোধ। তিনি দেশকে ভালবেসেছেন এবং মানুষের সেবা করেছেন। কিন্তু ঈশ্বরকে ভুলে যাননি। তিনি প্রার্থনা করতেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। তিনি ঈশ্বর, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনযাপন ও সেবা করেছেন। তিনি সমন্বিত মানুষ ছিলেন।’

প্রমোদ মানকিনের জন্ম ১৯৩৯ খ্রিঃ ১৮ এপ্রিল নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার বাকালজোড়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে। তার বাবা মেঘা তজু ও মা শিশিলিয়া (হৃদয়) মানকিন। তিনি ৮ ভাই বোনের মধ্যে ৫ম ছিলেন। তিনি ১৯৬৩-তে নটর ডেম থেকে বিএ, ১৯৬৮-তে বিএড এবং ১৯৮২ সালে এলএলবি পাস করেন। তারপর তিনি বিড়ইডাকুনী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দান করেন। ১৯৯১ সালে তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। সেই থেকে আড়াই দশকের বেশি সময় রাজনীনিতে সক্রিয় থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সংগঠক ও সমাজসেবক হিসেবে তিনি বিভিন্নভাবে সেবা দিয়েছেন। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ খ্রীস্টান এ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক এবং পরে প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় সভাপতিও হয়েছিলেন, হালুয়াঘাট উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি, ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য, বিড়ইডাকুনী স্কুলের শিক্ষক, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট, আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের অন্যতম সদস্য, বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি, খ্রীস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মানবাধিকার কমিশনের সদস্য, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সদস্য, হালুয়াঘাট গোবরাকুড়া আমদানি-রফতানিকারক সমিতির সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত কারিতাসের ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় কাউন্সিল ও বাংলাদেশ সমবায় ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। তিনি শহীদ আব্দুল জব্বার স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয় ও হালুয়াঘাট কারিগরি ও বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন সংগঠক হিসেবে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ভারতের মেঘালয় শিববাড়ি উদ্বাস্তু শিবিরে ৫০ হাজার শরণার্থী দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে ৪ বার নির্বাচিত হয়েছেন ১৯৯১, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৩ সালে। ২০০৮ ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ২০০৯ খিঃ জুলাই থেকে ২০১২-এর ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, পরে ২০১২-এর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আমৃত্যু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার মৃত্যুতে খ্রীস্টান সমাজ ও গারো জাতির অপূরণীয় ক্ষতি ও শূন্যতা সৃষ্টি হলো। পোপ কিংবা বিশপের মৃত্যুতেও যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় না, প্রমোদ মানকিনের মৃত্যুতে তারও অধিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতা কি দিয়ে ঢাকব? জাতীয় সংসদ হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান নিয়ে গঠিত ছিল। বিশ্বে অসাম্প্রদায়িকতার দৃষ্টান্ত ছিল। এ শূন্যতা কবে পূরণ হবে জানি না। তাই আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিশেষ অনুরোধ রাখি তিনি যেন এই শূন্যতায় দৃষ্টি দেন।

প্রমোদ মানকিন ছিলেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং গারো জাতির অভিভাবক। তিনি একজন খ্রীস্টান হিসেবে খ্রীস্টানদেরও প্রতিনিধি। যে কথা খ্রীস্টানরা সরকারকে বলতে পারে না, সেই কথা প্রমোদ মানকিন বলতে পারতেন। তিনি খ্রীস্টানদের প্রতিনিধি হিসেবে খ্রীস্টানদের সুখ-দুঃখের কথা কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখের কথা সংসদে বলতে পারতেন। এখন এ কথা কে বলবে? তিনি বঞ্চিত ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং দুস্থ, পঙ্গু, অটিজম শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি সংসদে কথা বলেছেন ও সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ছিল না সহিংসতা কিংবা অস্ত্রের খেলা। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে অধিকার আদায় করার জন্য কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন শান্তিপ্রিয় ও নির্লোভ সমাজসেবক। তিনি খ্রীস্টানদের যে কোন সমস্যা হলে ছুটে যেতেন। স্কুল-কলেজ কিংবা যে কোন প্রতিষ্ঠানে ভাল-মন্দ দেখাশোনা করতেন। স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। নিজ দেশ-জাতি, কৃষ্টি সংস্কৃতি ভালবাসতেন।

তিনি সময় সুযোগ পেলেই গান করতেন। তার প্রিয় গান ছিল : ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা।’ আর এই গানটি রমনা ক্যাথিড্রালে আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি’রোজারিও সিএসসি, উপদেশের আগে গেয়ে প্রতিমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। দরিদ্রতার মধ্যেও ধনী হওয়ার অসৎ উপায় অবলম্বন করেননি। দেশ ও জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। মৃত্যুর পরেও আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। সেবার মধ্যে অমর হয়ে থাকবেন। তিনি মৃত্যুর ওপার থেকে যেন অমাদের বলছেন, ‘মৃত্যু জীবনের শেষ নহে- অনন্ত জীবন প্রবাহ বহে।’

মড়ঁৎড়নপংপ@মসধরষ.পড়স