মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সান ক্যাচার

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৬
  • জাকারিয়া স্বপন

আমার তিপ্পান্ন তলা এ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে মেঘ ছোঁয়া যায়। গত দু’দিন ধরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘেরা বিশাল আকারে এসে দক্ষিণের পুরো বড় কাঁচের জানালা ভিজিয়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে যায়। কাঁচের সেই জানালা খুলে দিলেই পুরো ঘর ভিজে যাবে। যখন হাত দিয়ে মেঘ ধরার শখ হয়, তখন ছোট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। হাত দিয়ে হাল্কা মেঘ ছুঁয়ে তাদের অংশ হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু চেষ্টা আমি যতই করি, মেঘরা তো আর আমাকে তাদের দলে নেয় না। আমার বাড়িয়ে দেয়া হাত ভিজিয়ে দিয়েই চলে যায় দূরে কোথাও!

মেঘদের সাথে আমার এই লুকোচুরি অনেক দিনের। রোদ আসলে তারা যেমন কোথায় পালিয়ে যায়, কিংবা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার আমি যখন মন খারাপ করে বিকেল বেলা বারান্দায় বসে থাকি, তখন ঠিক কোথা থেকে যেন এসে হাজির হয়। মাঝে মাঝে তারা আর যেতেই চায় না। কেমন একটা অন্ধকার করে আমাকে ঘিরে রাখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এমনকি আকাশ তো অনেক দূরে, সূর্যের চেহারা পর্যন্ত দেখতে দেয় না। আমার মন খারাপ কি মেঘেদের মাঝে সঞ্চারিত হয়, তা বুঝতে পারি না। শুধু ভাবি, এরাও বুঝি আমার মনের খোঁজ রাখতে শুরু করেছে। এদেরও হয়ত মন আছে!

গত দু’দিন বৃষ্টির পর আকাশ যখন একদম ধোয়া-মোছা হয়ে গেছে, সেই সকাল থেকেই ভাবছিলাম বাইরে যাব। পরোটা-ডিম দিয়ে সকালের নাস্তা করে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে তাকিয়ে দেখি আকাশের অবস্থা। এখন বের হলে আবার ভিজতে হবে কি-না! মেঘদের নিয়ন্ত্রণ তো আর আমার কাছে নেই। কফিটা শেষ করে ইজি চেয়ারে বসে আছি। ঘরের বড় পর্দায় আবহাওয়ার তথ্য দেখা যাচ্ছে। বাইরে তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। তবে মাটির কাছাকাছি ২৮ ডিগ্রী। হাল্কা জ্যাকেট পরে নিচে নেমে যেতে পারলে, তারপর আর অসুবিধা হবে না।

॥ দুই ॥

ঘণ্টাখানেক পর যখন বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, তখন ঘরের সাউন্ড সিস্টেমে শব্দ হলো- তোমার লুবিলুবি এখনও প্রস্তুত হয়নি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

আবার উত্তর এলো, ওটাকে চার্জ করার মতো সূর্য পাওয়া যায়নি।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আমি যে বাইরে যাব তোমরা সেটা বুঝতে পারনি?

মেশিন উত্তর দিল, জি পেরেছি। আপনি কফি খাওয়ার সময় আমাদের কাছে ইনস্ট্রাকশন এসেছে। আমরা বিদ্যুত দিয়ে কিছুটা চার্জ করে রেখেছি। কিন্তু আপনি অনেক দূরে যাবেন বলে তথ্য আছে। তাই আরেকটু চার্জ হয়ে নিক। সূর্য এখন ভালই আছে।

- আর কতক্ষণ লাগতে পারে?

- আশা করছি আর ত্রিশ মিনিটের ভেতরই আপনার লুবিলুবি প্রস্তুত হয়ে যাবে।

- এই সময়টা আমি কী করব?

- আপনি তো দু’দিন ধরে কোন সংবাদ নিচ্ছেন না। ওই প্রটোকলটা বন্ধ আছে। বাইরে যাওয়ার আগে কিছু জেনে নিতে পারেন।

- আমি জানব কেন, তোমরা জানো না?

- জি, আমরা সবই জানি। সেটা নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। তবে, যেহেতু সময় হাতে আছে, আপনি চাইলে কিছু সংবাদ আপনাকে দিতে পারি।

- আচ্ছা দাও, আমি বললাম।

ঘরের কন্ট্রোল সিস্টেম আমাকে খবর পড়ে শোনাচ্ছে। ঘরের সাউন্ড সিস্টেমে সুন্দর গলায় পড়ে যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ল্যাব একটি নতুন ওষুধ বানিয়েছে, যা দিয়ে মানুষের আলজাইমার রোগ নিরাময় করা যাবে। ব্রেইনের যে সকল সেল স্মৃতিশক্তিকে ধারণ করে, সেগুলোর স্থান পরিবর্তন করে সক্রিয় স্থানে সংযোগ ঘটানোর মতো প্রযুক্তি তারা আবিষ্কার করতে সমর্থ হয়েছেন। এই বছরের শেষ নাগাদ এটা বাজারে পাওয়া যাবে। ধানে এখন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট নির্ধারণ করে দেয়া যাবে। ভাত যেহেতু মানুষের প্রিয় খাবার, তাই এর খাদ্যের পরিমাণ কমানোর চেয়ে এর ভেতর কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে মানুষ ইচ্ছেমতো ভাত খেতে পারবে কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের কোন সমস্যা হবে না। কক্সবাজারে সাগরের নিচের এ্যাকুয়ারিয়ামে আজ মারা গেছে পুরনো একটি সোনালি মাছ। সেই মাছ দেখার জন্য পুরো এলাকার মানুষ ভিড় জমিয়েছে। মাছটি বৃদ্ধ হয়ে পড়ায় এ্যাকুয়ারিয়াম কর্তৃপক্ষ এতদিন তাকে হাসপাতালে রেখে দিয়েছিল। আগামী...

কথা শেষ করতে পারে না যন্ত্র। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি, কী ব্যাপার তুমি সব কঠিন কঠিন সংবাদ দিচ্ছ কেন?

যন্ত্রটি বলে, এগুলোই তো আপনি বেশি শোনেন। আমরা কি একটু টপিক পরিবর্তন করে দেব?

আমি বললাম, যদি তোমার দয়া হয়।

যন্ত্রটির দয়া হলো। সে পড়তে থাকে সঙ্গীত শিল্পী কানিজের জন্মদিন আজ। আপনি কি তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে চান?

প্রশ্নটি করে যন্ত্র বিরতি নিচ্ছে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, আপনি কি শুভেচ্ছা জানাতে চান?

আমি চমকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি আমাকে প্রশ্ন করছ?

- জি আপনাকে করছি।

- আমি ভ্রƒ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কেন শুভেচ্ছা জানাব?

- কারো জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানো তো খারাপ কিছু না!

- ভাল-খারাপের সংজ্ঞা কী?

- যে কাজে অন্যের ক্ষতি হয়, সেটাই খারাপ কাজ। এর বাইরে বাকি সব কাজই ভাল কাজ। এই পৃথিবীতে ভাল কাজের সংখ্যাই বেশি।

- কিন্তু কানিজের মতো অসংখ্য মানুষের জন্মদিন আজ। আমি তো তাদের শুভেচ্ছা পাঠাচ্ছি না। তাহলে কানিজ কেন?

- আজ দুই কোটি এগারো লাখ ত্রিশ হাজার একশ’ বারোজন মানুষের জন্মদিন। আপনি চাইলেও সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতে পারবেন না। সবাই আমাদের নেটওয়ার্কের ভেতর নেই। কানিজ এই সময়ের সবচে বড় সেলিব্রেটি। তাকে আপনি শুভেচ্ছা পাঠাতে পারেন। তিনি আপনার শুভেচ্ছা পেলে খুশি হবেন।

- তিনি খুশি হবেন, তুমি জানলে কিভাবে? তুমি কি তার ড্রাইভারকে চেন?

- কে কিসে খুশি হয়, তা জানার জন্য আমাদের ড্রাইভারের কাছে খোঁজ নিতে হয় না। তিনি আমাদের নেটওয়ার্কে আছেন। আমরা তার প্রোফাইল এনালাইসিস করে বলে দিতে পারি।

- সেই প্রোফাইল এনালাইসিস করে তোমাদের মনে হলো আমার শুভেচ্ছায় তিনি খুশি হবেন!

- জি।

- আরে ভাই, আমি তো তাকে চিনিই না। কখনও যোগাযোগ হয়েছে বলে তো মনে পড়ছে না। একজন অচেনা মানুষকে আমি তার জন্মদিনে শুভেচ্ছা পাঠিয়ে বসে থাকব? এই তোমাদের বুদ্ধি! তিনি যদি উল্টো বিরক্ত হন?

- এমনও তো হতে পারে যে, তিনি খুবই খুশি হয়ে গেলেন।

- খুশি হওয়ার কোন কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। বরং ঝামেলা হতে পারে!

- কিসের ঝামেলা?

- এটা করে হয়ত আমি তার বয়ফ্রেন্ডকে বিরক্ত করব। তিনি হয়ত ভ্রƒ কুঁচকাবেন।

- দাস প্রথা অনেক আগেই এই গ্রহ থেকে মুক্ত হয়েছে। মানুষ এখন স্বাধীন। এখন কেউ কারও জীবন কিনে নিতে পারে না। মানুষ কাউকে ভালবাসতে পারে। তবে তাতে কেউ কেনা হয়ে যায় না। সবারই নিজস্ব জীবন আছে।

- সেটা মন্দ বলোনি। তাহলে কিভাবে শুভেচ্ছা পাঠাতে পারি?

- আপনি চাইলে লুবিলুবি আপনাকে তার কাছে নিয়ে যেতে পারে। আর আপনি চাইলে আমাদের এজেন্ট ফুল কিনে দিয়ে আসতে পারে।

- নাহ্, আজকে কোন সেলিব্রেটিকে দেখতে যাওয়ার মতো মনের অবস্থা আমার নেই। তুমি বরং এই শহরের সবচেয়ে ভাল ফুলের তোড়াটি পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর।

- জি, ধন্যবাদ। তিনি তার প্রিয় মুহূর্তে আপনার শুভেচ্ছাটি পেয়ে যাবেন। আমরা তার জন্মদিনটিকে বিশেষভাবে রঙিন করে দেব।

- তোমাকেও ধন্যবাদ। কিন্তু তোমার খবর কি শেষ হয়েছে। লুবিলুবি কখন বের হতে পারবে?

- আমাদের হাতে আরও সাত মিনিট সময় আছে। আপনাকে কি আরও কিছু সংবাদ দিতে পারি?

- দাও। অনেকদিন কোন দুঃসংবাদ শুনি না।

- কেমন দুঃসংবাদ শুনতে চান আপনি?

- এই ধর কেউ কাউকে মেরে ফেলছে। মতের অমিল, সম্পদের লোভ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, হিংসা, প্রভাব, কৃতজ্ঞতা এগুলো আর কি!

- আপনি হাসালেন। এত পুরনো সংবাদ শুনতে চাইছেন কেন? এই গ্রহ অনেক ইস্যু ইতোমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছে। এখন আর ওই সব কারণে কাউকে মরতে হয় না। তবে পিছিয়ে পড়া কিছু এলাকা এখনও আছে। সেগুলোর খবর আমরা আর সংগ্রহ করি না। আমাদের নেটওয়ার্ক থেকে সেগুলোকে বাদ দেয়া হয়েছে।

- মাঝে মাঝে পুরনো সংবাদ শুনে বিনোদিত হই এই ভেবে যে, এখন আর এগুলো হয় না। কিছুদিন আগেও মানুষ বাদশাহ আকবরের জীবনযাপন নিয়ে কেমন বিনোদন পেত মনে আছে?

- তা ঠিক বলেছেন। তবে এখন পৃথিবী তো পুরো দুইভাবে ভাগ হয়ে গেছে। যারা আমাদের নেটওয়ার্কে আছে, আর যারা নেই। যারা নেই তাদের খোঁজ আমরা রাখতে পারি না। আমাদের নেটওয়ার্কে তাদের আমরা জায়গাও দেই না।

- হুম। ভাবছি, তোমাদের নেটওয়ার্কে কবে অশান্তি এসে ভর করবে। সুখ তো এই গ্রহের মানুষের বেশিদিন সহ্য হয় না। আমরা কোন না কোনভাবে আনস্ট্যাবল হতে চাই। আমরা স্ট্যাবল জীবন পছন্দ করি না।

- তা ঠিকই বলেছেন। এমনও হতে পারে, আমাদের এই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে গেছে। মানুষ একই অবস্থায় বেশিদিন থাকতে পারে না। তারা পরিবর্তনশীল।

- সেইজন্যই তো আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

- আরও অনেক দূর বাকি। আপনার লুবিলুবি অপেক্ষা করছে। আপনার যাত্রা সুন্দর হোক।

- ধন্যবাদ।

॥ তিন ॥

আমার লুবিলুবিটা মাঝারি আকারের। গোল চাকতির মতো একটা ভাসমান পরিবহন, যার ওপর বসে আরাম করেই ঘুরে বেড়ানো যায়। এটা চলে মূলত সৌরশক্তিতে। তবে বিদ্যুত দিয়েও চার্জ করে রাখা যায়। ব্যাটারির পরিমাণ খুবই ছোট। এর নিজের তেমন ওজন নেই। আমাকে ভাসিয়ে রাখার মতো ক্ষমতা ওর আছে। একটি লুবিলুবিতে একজনই চড়তে পারে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নিজের এ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে খুব সহজেই উড়তে এবং সেখানে এসে আবার নামতে পারে। একটা সময়ে ড্রোনের খুব প্রচলন হয়েছিল। সেই ড্রোনেরই পরের ভার্সন হলো এই লুবিলুবি।

তেপ্পান্ন তলা থেকে খুব দ্রুত আমি নেমে এলাম বিশ তলা ভবনের সমান দূরত্বে। লুবিলুবি চালানোর জন্য এটা সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। এটা ঢাকা শহরের বেশিরভাগ ভবনেরই ওপরে এবং মনিটরে পুরো সড়কপথও দেখা যায়। তাছাড়া এই লেভেলে তাপমাত্রা খুব ভাল নিয়ন্ত্রিত থাকে। খুব বেশি ওপরে চলাফেরা করার বড় অসুবিধা হলো বাতাস। জোরে বাতাস এলে লুবিলুবিকে উড়িয়ে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে। তখন নেভিগেশনের জন্য বাড়তি শক্তি খরচ হয়।

বৃষ্টির পর ধুয়ে-মুছে রাখা শহর। চমৎকার সূর্য উঠেছে। সেই আলোতে চার্জ হয়ে যাচ্ছে লুবিলুবিটা। আজকে আকাশে ভিড় একটু বেশি। দু’দিন পর অনেকেই আকাশে বেড়িয়েছে। কেউ বাজার করতে, কেউ এমনি ঘুরতে, কেউ কাউকে দেখতে কোথাও যাচ্ছে। প্রতিটি লুবিলুবির সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। মোবাইল কমিউনিকেশন ডিভাইস। কোন্টা কোন্ পথে যাচ্ছে তারা নিজেরা ঠিক করে নিতে পারে। কারও সঙ্গে আরেকটা এসে ধাক্কা লাগার সম্ভবনা নেই। অনেক বছর আগে ড্রাইভার ছাড়া যে গাড়ি মানুষ তৈরি করেছিল সেটার পরের এলগরিদম এখানে বসানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত তেমন কোন দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

আমার টি-শার্ট কিনতে হবে। অনলাইনে অর্ডার করা যায়। তবে এখনও আমি নিজে গিয়ে কিনতে পছন্দ করি। লুবিলুবিটাকে চট করেই ঢাকা কলেজের সামনের বড় ভবনটিতে পার্ক করে দিলাম। ছাদে চমৎকার জায়গা করে রেখেছে ওরা। এখানে আরেকটু সূর্য নিয়ে নিক। লিফট দিয়ে পনেরো তলায় নেমে এলাম। এই ভবনটিতে অনেক আগে থেকেই কাপড় বিক্রি হতো। এতকাল পরেও তারা সেই ব্যবসা ধরে রেখেছে। তবে এখন অবশ্য অনেক বেশি রকমফের হয়েছে। লুবিলুবিতে পরার জন্য বিশেষ পোশাক বাজারে এসেছে। তার বিশাল একটা কালেকশন এখানে পাওয়া যায়। কিন্তু আমি এসেছি নিজে পরার জন্য টি-শার্টের জন্য। এক রঙের টি-শার্ট।

এখন আর এক রঙা টি-শার্ট পাওয়া যায় না। বিশেষ ধরনের টি-শার্ট বাজারে এসে ভরে গেছে, যেগুলো ইচ্ছেমতো রং পরিবর্তন করতে পারে। যখন যা ইচ্ছে সেভাবেই রং পাল্টে যাবে, যেভাবে রাজনৈতিক নেতারা এবং তাদের আশপাশের মানুষজন করে থাকেন। এভাবে রং পাল্টানোর আইডিয়া তাদের কাছ থেকেই এসেছে। এত চাহিদার কারণে ইলেক্ট্রনিক টি-শার্ট বানিয়ে বাজারে ছাড়া হয়েছে। কখনও নীল, কখনও লাল আবার কখনও সাদা রং- যখন যা প্রয়োজন হয়ে যাবে। কিন্তু আমি চাইছি এক রঙের টি-শার্ট, যার রং পাল্টাবে না। আমি আমার পছন্দের রংটি অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম। কিন্তু সাপ্লাই নেই। চাহিদা নেই বলে কেউ বানাচ্ছে না। দামও বেড়ে গেছে। একটি দোকান মাঝে মাঝে কিছু যোগাড় করতে পারে। ওই একমাত্র ভরসা।

রংমহল গিয়ে দেখি মাত্র তিনটা টি-শার্ট আছে। রংটা আমার পছন্দ। এ্যাশ রঙের তিনটি টি-শার্টই নিয়ে দোকানিকে বললাম, আর কোন রঙের টি-শার্ট আসেনি?

দোকানি হাসতে হাসতে বললেন, জি স্যার এসেছিল। আরেকজন কালকে কিছু নিয়ে গেছে। আপনাকে আগামী সপ্তাহে এনে দেব।

দোকানি আমার পেমেন্ট আইডিটা চার্জ করে টি-শার্টগুলো প্যাকেট করে দিয়ে বলল, যদি যোগাড় করতে না পারি তাহলে স্পেশাল অর্ডার করে রাখব। দাম আরও বেশি হবে। দিয়ে রাখব?

আমি উপায় না দেখে বললাম, জি করে রাখেন। ওই একটা জিনিসই তো আমি পরি। তাও এত ঝামেলা।

ঢাকা কলেজ এলাকা ছেড়ে বাইরে এসে দেখি চমৎকার দিন। এখন আর বাসায় যেতে মন চাইল না। কোথাও বাইরে বসে দুপুরের খাবারটা খেতে পারলে মন্দ হতো না। লুবিলুবিতে উঠে কন্ট্রোল সিস্টেমকে বললাম, বাইরে লাঞ্চ করা যাবে?

কন্ট্রোল সিস্টেম পাল্টা জিজ্ঞেস করল, বাইরে মানে কি খোলা জায়গায়? আমি বললাম, হুম, খোলা আকাশের নিচে, রোদে বসে। কোথায় পাওয়া যাবে?

উত্তর এলোÑ শীতলক্ষ্যার তীরে কিছু রেস্টুরেন্টে পাওয়া যাবে। তবে ওইদিকে ট্রাফিক বেশি। যেতেও সময় লাগবেÑ ২৫ মিনিটের মতো। যেতে চাও?

আমি একটু ভেবে বললাম, আশপাশে কিছু নেই?

কন্ট্রোল সিস্টেম একটু সময় নিয়ে জানাল, পুরোটা সার্চ করলাম। যেগুলো আছে তা তোমার পছন্দ হবে না। তুমি নদীর পাড়ের ওই জায়গাটা পছন্দ করবে।

আমি বললাম, চলো।

॥ চার ॥

ঢাকা থেকে শীতলক্ষ্যার তীরে আসতে সময় লাগল ২২ মিনিট ৩২ সেকেন্ড। আমরা ইচ্ছে করেই আস্তে আস্তে এসেছি। উঁচু উঁচু ভবনগুলোকে পাশ কাটিয়ে ঝকঝকে দিনের সূর্যের কোমল আলো গায়ে লাগিয়ে এখানে আসা। ক্যাম্পাসগুলোর মাঠে ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। কেউ কেউ অফিস থেকে ছুটিও নিয়েছে মনে হচ্ছে। অনেক বয়স্ক মানুষও দেখলাম। সবুজ ঘাসের পাশ দিয়ে সুন্দর লাল ইটের রাস্তা দিয়ে এমনি এমনি হাঁটছেন। কিছু কিছু রাস্তায় এখনও বাস চলছে। তবে কোথাও ট্রাফিক জ্যাম নেই। আসার সময় একটা জায়গায় একটু ময়লার গন্ধ নাকে এসেছে বটে; তবে সেটা হয়ত সাময়িক। আগে যেভাবে রাস্তার ওপর ময়লা ফেলে রেখে যেত, আর সেটা নিয়েই ময়লার ট্রাক ছুটে যেত পুরো শহরকে আরও ময়লাযুক্ত করে- সেই উৎপাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।

শীতলক্ষ্যার ঠিক পাড়েই মাটিতে নামল লুবিলুবি। খুব সুন্দর করেই পার্ক করল সে। কোনরকম ঝক্কি পোহাতে হলো না। ওখানে খুব সুন্দর একটা ল্যান্ডিং স্টেশন করা হয়েছে। শত শত লুবিলুবি ওখানে এসে নামছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। আমি ওটাকে অটো পার্কিংয়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুব সুন্দর একটি খাবারের দোকান চোখে পড়ল। একদম পানির ওপর ব্রিজ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কাঠের সেই ব্রিজের ওপর বসে দুপুরের ক্ষুধা আরও চাঙ্গা হয়ে উঠল যেন। ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে ঠিক শেষ মাথায় গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলাম।

শীতলক্ষ্যার পানির ঠা-া বাতাস, আর চারদিকের ঝলমলে সূর্য আমাকে পাগল করে ফেলছে। পাটাতনের ওপর কাঠের চেয়ারে বসে অনেক দূর দেখা যাচ্ছে। আশপাশে অসংখ্য মানুষ দুপুরের খাবার খেতে এসেছে। অনেক দিন এই এলাকায় আসা হয় না। এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। ইমি নামের একটি মেয়ে সুন্দর ট্রেতে করে খাবার রেখে গেল। হাসতে হাসতে বলল, তোমার পছন্দ আমরা জানি। সিস্টেম থেকে তথ্য নিয়ে আমাদের বিশেষ রাঁধুনি তোমার জন্য বিশেষভাবে রান্না করেছে। আশা করছি তুমি এটা উপভোগ করবে।

পাস্তা রান্না করার বিশেষ একটি উপায় আছে। সঠিক তাপমাত্রা আর সঠিক মসলা না দিলে পাস্তা ঠিক ভাল লাগে না। শীতলক্ষ্যার মাছ আর প্রচুর সবজি দিয়ে সাদা পাস্তা রান্না করে দিয়েছে। সঙ্গে কাঁচা সবজি। মুখে এক চামচ পাস্তা দিয়েই বুঝে ফেললাম, এর জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম। মেয়েটিকে আরেকটা হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, এর থেকে সুন্দর খাবার আর হতে পারে না।

ইমি মাথা নিচু করে বলল, তোমার দিনটা ভাল কাটুক।

ইমি চলে গেল। আমি আরাম করে পাস্তা শেষ করছি। প্রতিটি চামচ মুখে নেয়ার পর যেন তৃপ্তিতে ভরে যাচ্ছে আমার মনপ্রাণ। ঝকঝকে নীল আকাশের ওপর দিয়ে সাদা রঙের ভেসে যাওয়া মেঘগুলো আমাকে দেখছে। নদীর শান্ত পানির ওপর দিয়ে আলত করে ভেসে যাচ্ছে বড় বড় জাহাজ। কখনও সেই জাহাজে চড়ে দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি। অনেক দিন ভেবেছি ওই জাহাজে চড়ে ভিন দেশে চলে যাই। একা একা ওই জাহাজে চড়া আর হয়ে ওঠে না। জাহাজের পেছনে পানির যে দুরন্ত প্রবাহ থাকে, সেইদিকে তাকিয়ে থেকে পাস্তা খেতে থাকি। মনে মনে ভাবি, ওই পানির ওপর যদি ঝাঁপ দেই, তাহলে কেমন হয়? জাহাজের ইঞ্জিন কি আমাকে মেরে ফেলবে? দূরে কোথাও ছিটকে ফেলে দেবে? নাকি পানির উত্তাল চাপে হয়ে উঠবে একটি চমৎকার সাঁতারের অভিজ্ঞতা। শীতলক্ষ্যার ওই পারে সুন্দর ছোট ছোট বাড়ি তৈরি হয়েছে। ওখানে একটা বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন থাকতে পারলে মন্দ হতো না।

পাস্তা খেতে খেতে এমন যখন ভাবছি তখুনি শব্দটা কানে এলো। একদল মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে নদীর পাড় দিয়ে ছুটে আসছে। তারা কিছু ভাঙচুরও করছে। কিছু মানুষ দৌড়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ তাদের লুবিলুবিকে নিয়ে জায়গা ছেড়ে যাচ্ছে। আমি বিড় বিড় করে সিস্টেমকে বললাম, এটা কী হচ্ছে?

সিস্টেম আমাকে বলল, একদল মানুষ জমি দখল করতে আসছে।

আমি অবাক হয়ে বললাম, মানুষ এখনও জমি দখল করে?

সিস্টেম বলল, জি। এখনও কিছু মানুষ আছে যারা জোর করে অন্যের জমি দখল করে নেয়। তারা এই খাতে বিনিয়োগ করে। বিনে পয়সায় জমি নিয়ে তারপর চড়া দামে বিক্রি করে দেয়। এই ব্যবসা এখনও বন্ধ হয়নি।

আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কি এই পুরো জমি দখল করে নেবে?

সিস্টেম বলল, নাহ্, নিতে পারবে না। প্রশাসন খুব শক্ত হয়ে গেছে। একটু পর ব্রাশ ফায়ার করা হবে।

আমি আঁতকে উঠে বললাম, মানে কি?

সিস্টেম বলল, আমাদের কাছে তথ্য আছে। একটু পরেই ব্র্যাশ ফায়ার করবে প্রশাসন। জোর করে জমি দখল বন্ধ করার জন্য এর চেয়ে আর ভাল উপায় নেই।

আমি বললাম, মানুষ মারা যাবে না?

সিস্টেম বলল, নাহ্ মারা যাবে না।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ব্রাশ ফায়ারে মারা যাবে না কেন?

সিস্টেম বলল, ওরা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে যাবে। মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। তারপর পুলিশ ওদের নিয়ে যাবে। কিন্তু মারা যাবে না।

আমি আশ্বস্ত হয়ে বললাম, যাক তাও ভাল। কিন্তু এই অন্যায়টা কিছুতেই কমানো গেল না।

সিস্টেম উত্তর দিল, কিছু অন্যায় এই গ্রহে থেকেই যাবে। সেটা মেনে নিয়েই আপনাকে চলতে হবে। আপনি ফেরার জন্য প্রস্তুত হন।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, এখনই ফিরব কেন?

সিস্টেম বলল, আপনার গায়েও গুলি লাগতে পারে। এলোমেলো মানুষ কোন্দিকে যাবে ঠিক নেই।

আমি বললাম, আমি যাব না। দেখি কী হয়।

সিস্টেম বলল, আপনার ইচ্ছে। আমার কাজ আপনাকে জানানো।

একটু পর পুরো জায়গাটা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। কিছু মানুষ পোকামাকড়ের মতো লাঠিসোঁটা নিয়ে রেস্টুরেন্টগুলো ভেঙ্গে দিচ্ছে। তারা একটা সাইনবোর্ড টানানোর চেষ্টা করছিল। কোথা থেকে পুলিশ এসে সত্যি সত্যি ব্রাশ ফায়ার করতে শুরু করল। যে যেদিকে পারছে ছুটছে। আমি মানুষের দৌড় দেখতে থাকলাম। মানুষ কিভাবে পতঙ্গ হয়ে যায়, তা দেখার সবচেয়ে ভাল সময় এটা। কিছু একটা এসে আমার গায়েও লাগল। একটা সময়ে আমি জ্ঞান হারালাম।

॥ পাঁচ ॥

আমার যখন জ্ঞান ফিরে তখন আমি হাসপাতালে। গায়ে বেশ কয়েকটি বুলেট লেগেছিল। এগুলো মূলত ঘুম পাড়িয়ে দেয়ার ওষুধ লাগানো বুলেট। তেমন ক্ষতি করে না। পুলিশের জন্য বেশ কাজের। কাউকে আটক করার জন্য যথেষ্ট। তবে এর সঙ্গে অনেক নিরীহ মানুষ জড়িয়ে যায়, যা কাম্য নয়। যদিও আইন নিরীহ মানুষকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা নিরীহ ভদ্র মানুষের ওপর নাজিল হয়। সেই কালচার অবশ্য এখনও রয়ে গেছে।

হাসপাতালে এসে জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারি, আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে লুবিলুবি। ব্রাশ ফায়ার শুরু হয়ে গেলে সবাই যখন ছুটে চলে যাচ্ছিল, তখন আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। এটা আমার কন্ট্রোল সিস্টেম জানতে পারে। তারা লুবিলুবিকে বিষয়টি জানালে সে স্টার্ট দিয়ে আমার কাছে চলে আসে। ওর নিচে হুক লাগানা আছে। সেই হুক খুললে নিচের দিকে মুখটা হা করে যায়, অনেকটা বার-বি-কিউ করার সময় গরম মাংস ধরার যন্ত্রের মতো। আমাকে সেভাবে ধরে আটকে ফেলে লুবিলুবি। তারপর খুব জোরে আকাশে উড়াল দিয়ে এক টানে চলে যায় পূর্বাচল সিটি সেন্টার হাসপাতালে। এই হাসপাতালটি নতুন হয়েছে। এখানে ডাক্তারদের কমিশনের ওপর চলতে হয় না। তাই কিছুটা বিশ্বাস রাখা যায়।

দু’দিন হাসপাতালে থাকার পর বেশ সুস্থ হয়েই বাসায় ফিরলাম। ফেরার সময় আর লুবিলুবি ব্যবহার করলাম না। তার মূল কারণ হলো কানিজ। গুলি খাওয়ার সংবাদ শুনে আমাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছেন। জীবনে প্রথম এমন একজন বিখ্যাত গানের শিল্পীকে কাছ থেকে দেখা। কিন্তু তিনি এমনভাবে ব্যবহার করছেন, যেন সেই ছোটবেলা থেকে চিনি। তিনি বললেন, এই শরীর নিয়ে লুবিলুবি ব্যবহার করা ঠিক হবে না। অনেক ওপরে ওঠার সময় ঝামেলা হতে পারে। তাই এ্যাম্বুলেন্সে করে বাসায় দিয়ে গেল। তারপর লিফটে করে সোজা তিপ্পান্ন তলায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আবারো আকাশ দেখি। মেঘদের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবি, একটা সময়ে আমি থাকব না; কিন্তু মেঘেরা ঠিকই থাকবে। ওরা কি কোনদিন কাউকে বলে দেবে, এই তলায় আমিও ছিলাম!

পরিশেষ :

উপরের গল্পটা আমার মনে ভেতরের অনেকগুলো গল্পের একটি। আমি বিশ্বাস করি, এই শতাব্দীতেই এই ঘটনাগুলো ঘটতে থাকবে। তখন আমরা অনেকেই থাকব না; কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েরা থাকবে। তারা এমন সুন্দর একটি সময় দেখে যেতে পারবে। আমার মেয়ে তার খুব ছোট বেলায় ‘সান ক্যাচার’ বানাত। প্লাস্টিকের নকশা করা বিশেষ বস্তুতে রং করে সেটা সুতা দিয়ে জানালায় ঝুলিয়ে দিত। সূর্যের আলো এসে সেখানে আটকে যেত। তাই নাম হয়েছে সান ক্যাচার। আমিও যেন একটা অদ্ভুত সান ক্যাচার বানিয়ে বসে আছি। বাংলাদেশের ছেলেমেয়েগুলো এমন একটি সুন্দর সময় দেখে যাবে, সেই স্বপ্নে আটকে গেছে আমার জীবন। ভাল থাকো বাংলাদেশ!

১৪ মে, ২০১৬

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৬

১৬/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: