মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বিমানে সফটওয়্যারের বদলে ম্যানুয়াল পাইলট সিডিউল

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৬
  • নেপথ্যে সোনা চোরাচালান ও পছন্দের এয়ারহোস্টেসদের সান্নিধ্য

আজাদ সুলায়মান ॥ দু’বছর পর ফের বিমানের পাইলটদের ডিউটি সিডিউল নিয়ে শুরু হয়েছে জালিয়াতি, অনিয়ম ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। ছয় কোটি টাকার সফটওয়্যার ব্যবহার না করে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে পাইলটদের ডিউটি বন্টন করা হচ্ছে। মূলত সোনা চোরাচালান ও পছন্দের এয়ারহোস্টেসদের সঙ্গে থাকার জন্যই এতবড় জালিয়াতি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এ ধরনের অপকর্ম করতে গিয়ে বছর দুয়েক আগে একজন সিনিয়র পাইলট সোনা চোরাচালানের দায়ে এখনও কারাবন্দী। ওই ঘটনায় ক’জন পাইলট ও কর্মকর্তা এখনও গ্রেফতার আতঙ্কে থাকলেও শিক্ষা নেয়নি বাপা নেতৃবৃন্দ। পাইলটদের সংগঠন বাপার শীর্ষনেতৃবৃন্দের অযাচিত হস্তক্ষেপের দরুন এখন চরম ক্ষোভের সঞ্চার করেছে যোগ্য ও মেধাবীদের মধ্যে। হঠাৎ সোনা চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যেও এই সিডিউল জালিয়াতির মুখ্য ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবি পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে বিমানে বর্তমান পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ারমার্শাল ইনামুল বারী জনকণ্ঠকে বলেন, এভাবে চলতে পারে না। আগামী পনেরো দিনের মধ্যে এগুলো সফটওয়্যারের মাধ্যমে করার নির্দেশ দিয়েছি। আশা করা যায়, এটা ঠিক হয়ে যাবে।

বিমান সূত্র জানায়, পাইলটদের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও বার বার ঘটছে এহেন জালিয়াতির কা-। এর আগেও একই ধরনের অপকর্ম করে সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ায় একজন সিনিয়র পাইলট এখনও জেল হাজতে আটক রয়েছেন। চাঞ্চল্যকর ওই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, সফটওয়্যারের পরিবর্তে ম্যানুয়েলে নিজেদের পছন্দমতো কয়েকজন পাইলট আকর্ষণীয় ফ্লাইটে বার বার ডিউটি পাওয়ার অন্যতম কারণ সোনা চোরাচালান ও অনৈতিক কর্মকা-ের সুযোগ সৃষ্টি। বছর দেড়েক আগে ওই ঘটনায় বিমানের তৎকালীন চীফ অব প্ল্যান এ্যান্ড সিডিউল ক্যাপ্টেন শহিদ, ডিজিএম এমদাদ ও পলাশসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই মামলার তদন্তে বাপা বর্তমান সভাপতিসহ বেশ ক’জন পাইলট, কেবিন ক্রু ও অন্যান্য কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা ওই ঘটনার পরদিনই বিমান পর্ষদ জরুরী বৈঠক ডেকে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে পাইলটদের ডিডটি সিডিউল নিষিদ্ধ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে অটোমেশান পদ্ধতিতে ফ্লাইট পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত হয়। গত এক বছর সেভাবেই চলে আসছিল। কিন্তু এরই মধ্যে গত মাসে বিমান পর্ষদ পরিবর্তন হওয়ায় পাইলটদের সংগঠন বাপা আবারও সফটওয়ারের পরিবর্তে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে নিজস্ব পছন্দের পাইলটদের ডিউটি দিতে শুরু করে। বাপার সভাপতি চীফ অব প্ল্যানিং এ্যান্ড সিডিউল বিভাগে বসে থেকে সফটওয়্যারের তালিকা কেটে ম্যানুয়েল তালিকা তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দুনিয়ার সব এয়ারলাইন্সে এমনকি পাশের নেপালেও পাইলটদের ডিডটি সিডিউল করা হয় অটোমেশান পদ্ধতিতে। কিন্তু বিমানে তা চলছিল ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে। এ অবস্থায় ব্রিটিশ এমডি কেভিন যোগদানের পর বিমানের প্ল্যানিং ও সিডিউলের ম্যানুয়েল পদ্ধতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে জরুরী ভিত্তিতে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ক্রু সিডিউলিং সফটওয়্যার কিনেন। তিনি থাকাবস্থায় সেটা অনুসরণ করা হতো। তিনি চলে যাওয়ার পর বিমানে শুরু হয় ম্যানুয়েল পদ্ধতির সিডিউল। ওই সময় চীফ অব প্ল্যান এ্যান্ড সিডিউল বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমানে কারাবন্দী সিনিয়র পাইলট আবু হাসান শহিদ। অভিযোগ ছিল- তিনি সফটওয়্যার ব্যবহার না করে নিজ হাতে নিজের পছন্দসই পাইলটদের ও এয়ারহোস্টেসদের সোনা চোরাচালান রুটের ফ্লাইটে ডিউটি দিতেন। তার এ কাজে সহায়তা করতেন বিমানের তৎকালীন ডিজিএম এমদাদ, ম্যানেজার তোজাম্মেল ও বিমানবালা নূরজাহানের স্বামী মাহমুদুল হক পলাশ নামের এক বহিরাগত দালাল। এক পর্যায়ে কেবিন ক্রু রাসেল সোনাসহ শাহজালালে আটকের পর তাকে ডিবিতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ডিবি পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হয় যে বাপার সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুব, ক্যাপ্টেন শহিদ, ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরান, ক্যাপ্টেন ইশরাত, ক্যাপ্টেন হাসান, ক্যাপ্টেন ইশতিয়াক, ক্যাপ্টেন রেজওয়ান, ক্যাপ্টেন রফিক, ক্যাপ্টেন মতিন, ক্যাপ্টেন সারওযার, ক্যাপ্টেন নাসির ক্যাপ্টেন রিয়াজ, ডিজিএম এমদাদ, ম্যানেজার তোজাম্মেল, ৩৪ জন কেবিন ক্রু, পলাশ, হারুনসহ সিডিউলের মিরন, লিয়াকতসহ বেশ কর্মকর্তা এ রোস্টার বাণিজ্যের সুবিধাভোগী। পরে ওই মামলায় ডিবি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়। ওই সময় লিয়াকত ও মিরনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিএফও অফিসে হানা দেয় ডিবি। পরে তারা বিষয়টি ম্যানেজ করে অফিসে বসার সুযোগ পায়।

গত সোমবার ওই শাখায় গিয়ে দেখা যায়, বিগত কয়েকদিনের বেশ কয়েকটি সিডিউলের সফটওয়্যারে এক রকম আর ম্যানুয়েল তালিকায় অন্য রকম। সফট ওয়্যারের অটোমেশানে লেখা এক পাইলটের নাম, আর ডিউটিতে হাজিরা দিয়েছেন আরেক জন পাইলট। কেন এমন হলো জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, বাপার সভাপতি মাহবুরের ইচ্ছা অনিচ্ছায় ক্যাপ্টেন নাদিম এমনটি করছেন।

জানতে চাইলে বিমান চেয়ারম্যান এয়ারমার্শাল ইনামুল বারী জনকণ্ঠকে বলেন, এমনটি হলে তো গুরুতর অন্যায়। তবে আমি নিজে যেটুকু জানি সেটা হলো সফটওয়্যারের কপি হাতে ম্যানুয়েলে পরিবর্তন করা হচ্ছে। দেখা যায়, অনেক পাইলট শেষ মুুহূর্তে ব্যক্তিগত কারণে ডিউটি বাতিল করে। তখন ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে হাতে লিখে যে যাদের নাম পরিবর্তন করা হয় সেটা সফটওয়্যারে এন্ট্রি করলেই চলে। কিন্তু তারা সেটা করছে না।

কেন করছে না প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অজুহাত দেখাচ্ছে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নেই। তবে আমার কথা হচ্ছে, যিনি হাতে লিখে কাটাকাটি করে নাম পরিবর্তন করছেন- তিনিই তো তাৎক্ষণিক ডাটা এনট্রির কাজও করে ফেলতে পারেন। এমনটি করলে তো পরে সফটওয়্যারে সেভাবেই এ্যাডজাস্ট হয়ে যেত।

এ বিষয়ে বিমানের সাবেক একজন ডিএফও জানান, এর আগেও চার কোটি টাকায় একটি ক্রু সিডিউলিং সফটওয়্যার কেনা হয়েছিল। কিন্তু তখনও বাপা তা চালু করতে দেয়নি।

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৬

১৫/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: