১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

৩১৯ পোশাক কারখানা বন্ধের পথে


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট ও ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে পোশাকশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও বিশ্ববাজারে পোশাকের দরপতনের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শিল্প উদ্যোক্তারা। এ কারণে গত তিন বছরে ৬১৮ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। নতুন করে ৩১৯ কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকতে না পেরে কারখানাগুলোর এই পরিণতি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পোশাক পণ্যের মূল্য ৪০ শতাংশ কমেছে। শনিবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিজিএমইএ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি মোঃ সিদ্দিকুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পোশাক শিল্প বর্তমানে একটি ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করছে। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে শিল্পকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিগত ৫ বছরে আমাদের গড় প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশ। আর ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানিতে পৌঁছতে হলে বছরে ১২ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বিগত ২২ মাসে আমাদের অর্জিত প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.৮১ শতাংশ। সুতরাং সে হিসেবে আমরা এখনও এযাবত গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় ৩.১৯ শতাংশ এবং ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির তুলনায় ৫.১৯ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছি। প্রবৃদ্ধির এই পিছিয়ে পড়ার হার কাটিয়ে উঠতে আগামী মাসগুলোতে আমাদের স্বাভাবিক গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে বলে তিনি জানান। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, পৃথিবীতে সবকিছুর দাম বাড়লেও একমাত্র তৈরি পোশাকের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালযের গবেষণা অনুযায়ী বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পোশাক পণ্যের মূল্য ৪০ শতাংশ কমেছে। চলতি অর্থবছরেও এই দরপতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। অপরদিকে, প্রতিবছর আমাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে ৮-১০ শতাংশ হারে। তিনি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত ৪ বছরে ডলারের বিপরীতে টাকা ৭.৬৬ শতাংশ হারে শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে ৪০.০১ শতাংশ হারে ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হওয়ায় পোশাক রফতানিতে ভারতের প্রতিযোগী সক্ষমতা বেড়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ভিয়েতনাম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। ২০১০ সালে ভিয়েতনাম এর রফতানি ছিল ১০.৮৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৫ সালে ২৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর গত মার্চ মাসে ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪.৩৭ শতাংশ। দেশটির এমন প্রবৃদ্ধি আমাদের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে তিনি মনে করেন। যদিও দেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ভিয়েতনাম ও চীনের শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম। বিজিমএইএ আরও সভাপতি বলেন, গ্যাস-বিদ্যুত সঙ্কট ও ব্যাংক সুদের হার বেশি থাকায় শিল্পে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে অর্থনীতিতে যথেষ্ট কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান নিরাপদ কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য কারখানা স্থানান্তর করতে চাইছেন। অনেক নতুন কারখানা গ্রীন হয়েছে, আবার অনেক কারখানা গ্রীন হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে কারখানা সচল করতে পারছে না। আবার, গাজীপুর জেলার, চান্দোরা, পূর্ব চান্দোরা, তেলিপাড়া, শালনা, শফিপুর, কাশিমপুর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া, ভাসন, মালেকের বাড়ি, গাজীপুর চৌরাস্তা ও গাজীপুর সদর এলাকায় তৈরি পোশাক শিল্পে গ্যাসের প্রেসার অত্যন্ত কম থাকায় উক্ত এলাকাসমূহে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কারখানাসমূহের মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের সঙ্কট নিরসনে একটি জ্বালানি নীতির প্রণোয়নের দাবি জানান তিনি। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, একইভাবে আমরা বিদ্যুত সমস্যাও মোকাবেলা করছি। আশুলিয়া, গাজীপুর, কোনাবাড়ী, সাভার, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় দৈনিক ৫ ঘণ্টা থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। নতুন বিদ্যুত লাইন সংযোগ ও বিদ্যুত লাইন স্থানান্তর নিয়েও আমরা যথেষ্ট হয়রানির শিকার হচ্ছি। সবমিলিয়ে আমরা শিল্পে প্রয়োজনীয় বিদ্যুত পাচ্ছি না এবং আমাদের ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে এই সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। পোশাকখাতে গ্যাস ও বিদ্যুত সমস্যা সমাধানের একটি ওয়ানস্টপ সেল গঠন করার দাবি জানান তিনি। সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সভাপতি বলেন, গত ৩ বছরে বিভিন্ন কারণে সক্ষমতা হারিয়ে ৬১৮টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও ৩১৯টি কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। তবে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও উদ্যোক্তারা গ্রীন ফ্যাক্টরি গড়ে তুলছেন। ইতোমধ্যে ২৮টি গ্রীন কারখানা স্থাপিত হয়েছে এবং আরও ১১৮টি কারখানা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ২০২১ সালে পোশাক রফতানি পাঁচ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যেতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে কয়েকটি দাবি বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি পোশাকশিল্পের জন্য ১০ শতাংশ হ্রাসকৃত হারে কর আরোপের সুবিধাটি আগামী পাঁচ বছরের জন্য বৃদ্ধি করার কথা বলেন। এ ছাড়া রফতানিমুখী এই শিল্পের উৎসেকর হার বর্তমানের মতো দশমিক ৩০ রাখা, পোশাকশিল্পের সহযোগী খাতগুলো মূল্য সংযোজন করমুক্ত (মূসক) এবং অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি আমদানি শুল্কমুক্ত করার দাবি করেন বিজিএমইএর সভাপতি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সহসভাপতি ফারুক হাসান, এসএম মান্নান, মাহমুদ হাসান খান, মোহাম্মদ নাছির, ফেরদৌস পারভেজ প্রমুখ।