২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

টেকনাফে আনসার ক্যাম্পে হামলা, কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা


টেকনাফে আনসার ক্যাম্পে হামলা, কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ টেকনাফে সশস্ত্র আরএসও জঙ্গীরা আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। তাদের গুলিতে এক আনসার কমান্ডার নিহত হয়েছেন। অস্ত্রধারী জঙ্গীরা লুট করে নিয়ে গেছে আনসারের ১১টি রাইফেল ও ৬৭০ রাউন্ড গুলি। নিহত আলী হোসেন (৫৫) টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর এলাকার মৃত শুক্কুর আলীর পুত্র ও চট্টগ্রামের মিরসরাই ২৯ আনসার ব্যাটালিয়নের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি)। বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটায় টেকনাফের মুচনী রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের শালবাগান আনসার ক্যাম্পে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে শুক্রবার সকালে জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন, পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ, বিজিবি কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তানবির আলম খান ও কক্সবাজার জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট দেওয়ান মাতলুবুর রহমান ঘটনাস্থল পরির্দশন করেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, মুচনী ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ের সন্নিকটে সি এবং ডি ব্লকে অবস্থিত শালবাগান আনসার ক্যাম্পে রাতে একটি সশস্ত্র গ্রুপ হামলা চালায়। আনসার ক্যাম্পে দায়িত্বরত প্লাটুন কমান্ডার আলী হোসেনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শরণার্থী ক্যাম্প হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা আনসার টুআইসি আলমগীর হোসেন বলেন, নিহত আলী হোসেনের বুকে এক রাউন্ড গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আনসার সদস্যরা অস্ত্রধারী কিছু সদস্যকে চিনতে পেরেছে। কেউ কেউ ঘটনাটি ডাকাতি বলে জানালেও সচেতন মহল তা মেনে নিতে পারছে না। অভিজ্ঞজনরা জানান, সরকারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটের ঘটনায় বিশেষ কোন মহলের উস্কানি থাকতে পারে। কেননা ডাকাতরা ডাকাতি করে লাভের আশায়। আনসার ক্যাম্পে নেই কোন টাকা, নেই স্বর্ণালঙ্কার, এমনকি বিক্রি করে নগদ টাকার পাওয়ার মতো কোন মূল্যবান সামগ্রীও নেই। শুধু অস্ত্র এবং গুলি লুটের ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে দাবি করেন তারা।

সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ২টা ২০মিনিটের দিকে এক অচেনা লোক এসে দায়িত্বরত আনসার সদস্যের সঙ্গে কথা বলছিল। পেছন থেকে এসে আনসার ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে অস্ত্রধারী দুষ্কৃতকারীরা। এমতাবস্থায় হঠাৎ আরও তিনজন লোক এসে ওই সিপাহীকে জাপটে ধরে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে বেঁধে ফেলে। ও সময় অন্তত ৩০ অস্ত্রধারী দুষ্কৃতকারী আনসার ক্যাম্পে প্রবেশ করে ঘুমন্ত আনসার সদস্যদের হাত-পা বেঁধে ফেলে। অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করে রাখে সকল সদস্যকে। প্লাটুন কমান্ডার আলী হোসেনের কাছে অস্ত্র ভা-ারের চাবি চাইলে তিনি চাবি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রোহিঙ্গা আরএসও জঙ্গীরা তার বুকে গুলি চালায়। পরবর্তীতে চাবি নিয়ে রুম খুলে সেখান থেকে ১০টি ও সেন্ট্রির কাছ থেকে কেড়ে নেয়া ১টিসহ মোট ১১টি অস্ত্র লুট করে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায় তারা। টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের আশপাশে ৪টি ক্যাম্পে ১০ জন করে মোট ৪০ আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য দায়িত্বে নিয়োজিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আনসার ক্যাম্পের এক সদস্য বলেন, মুচনী আনসার ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে রোহিঙ্গা ডাকাতদলের একটি আস্তানা রয়েছে। টহলদানকালে অস্ত্রধারী ওসব রোহিঙ্গাকে চিনে ফেলে আনসার সদস্যরা। হয়ত এজন্য রোহিঙ্গা ডাকাতরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট দেওয়ান মাতলুবুর রহমান জানান, অস্ত্রধারী প্রায় ২০জনের একটি সংঘবদ্ধ দল রাত ২টা ২০মিনিটে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ১১টি অস্ত্র লুট করেছে। তাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন এক আনসার সদস্য। অপরাধীদের ধরতে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আনসার ব্যারাক থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ৫টি চায়না রাইফেল, ২টি এসএমজি, ৪টি শটগান ও ৬৭০ রাউন্ড গুলি।

একাধিক সূত্র জানায়, কক্সবাজারে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে আরাকান বিদ্রোহী গ্রুপ রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) প্রশিক্ষিত জঙ্গীদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রামু বৌদ্ধ বিহারে হামলা, লুট ও অগ্নিসংযোগ, যুদ্ধাপরাধী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মুক্তি পরিষদের আন্দোলন এবং বিভিন্ন নাশকতায় জামায়াত-বিএনপি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও আরএসও জঙ্গীদের নিয়ে একত্রিত হয়ে যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, তার বহু নজির রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে জামায়াত-বিএনপি আরএসও জঙ্গীদের নিয়ে ২০১২সালের ১৩ নবেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলে পড়েছিল। ও সময় আরএসও জঙ্গীদের গুলিতে তিন গ্রামবাসী নিহত হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় পালিয়ে যাওয়ার সময় বাসটার্মিনাল এলাকা থেকে ২৫রোহিঙ্গাকে আটক করেছিল পুলিশ।

সূত্র আরও জানায়, আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতার মদদে আরএসও জঙ্গীরা কক্সবাজার ও বান্দরবানে নির্বিঘেœ চলাফেরা করে চলছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় তারা ধর্মীয় শিক্ষার আদলে গড়ে তুলেছে রোহিঙ্গা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রশাসন ওসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অভিযানে গেলে বাদ সাধে ওসব ধান্ধাবাজ নেতা। ইতোপূর্বে কক্সবাজার জেলা পুলিশ আরএসও কমান্ডার ছালাহুল ইসলাম, তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড আরএসও জঙ্গী আবু ছালেহসহ বহু রোহিঙ্গা জঙ্গীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। কিন্তু কতিপয় ধান্ধাবাজ দলীয় নেতার তদ্বিরে তাদের বেশিদিন জেলের ঘানি টানতে হয়নি। জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে ফের নাশকতায় জড়িয়ে পড়ে জঙ্গীরা। রোহিঙ্গা জঙ্গীরা এতই ভয়ঙ্কর যে খুন-খারাবি, স্থানীয়দের জানমালের ক্ষতি সাধনসহ সরকারী সম্পদ বিনষ্ট করতে একটুকুও ভেবে দেখে না।

ইতোপূর্বে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হওয়ায় একই পরিবারের ৫সদস্যকে (শরণার্থী) খুন করে একটি গর্তে পুঁতে রেখেছিল। হামলে পড়েছিল ক্যাম্পের তৎকালীন দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল আরএসও ক্যাডারদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের শারণার্থী নুরুল ইসলাম। প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ খুনের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এর আগে ২৭ মার্চ রাতে বস্তির কমিটি গঠনের বিরোধের জের ধরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আবুল বাছের (৪২) নামের এক রোহিঙ্গাকে। তার স্ত্রী ইছমত আরা জানায়, বস্তির ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আরএসও জঙ্গী আবু সিদ্দিক ও সাধারণ সম্পাদক জঙ্গী রাকিবুল ইসলাম তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে খুন করেছে।

স্থানীয়রা জানায়, একের পর এক রোহিঙ্গাদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ নিয়ে টেকনাফ ও উখিয়ার সামগ্রিক পরিবেশ বিনষ্ট হতে চলেছে। মিয়ানমারে কুশিক্ষা ও কুসংস্কারে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে পালিয়ে এসে এদেশে অনাকাক্সিক্ষত বহু ঘটনা ঘটিয়েছে। দল ভারি করতে আরাকান বিদ্রোহী গ্রুপ রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) ক্যাডাররা সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষিত করে বিশেষ মহলের ইন্ধনে এখনও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটিয়ে চলছে। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম শহরে কতিপয় রাজনৈতিক নেতার শেল্টারে আরএসও জঙ্গীরা ঘাপটি মেরে রয়েছে। বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আরএসও জঙ্গীদের বর্তমানে বাংলাদেশের সমন্বয়ক হচ্ছে ইব্রাহিম আতিক। তার সঙ্গে জামায়াত-বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতার সখ্য রয়েছে। তিনি ঢাকায় অফিস স্থাপন করে বসে আরএসও জঙ্গীদের দিয়ে নাশকতার কলকাঠি নাড়ছে বলে জানা গেছে। তার অধীনে কক্সবাজারে জঙ্গী ছলাহুল ইসলাম, মৌলভী আবু ছালেহ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আবু সিদ্দিক, সিরাজুল মোস্তফা, রাকিবুল ইসলাম, মোহাম্মদ জিয়া, আবদুস শুক্কুর, আবদুর হাফেজ, মান্নান, মোহাম্মদ নুর, মোঃ আমিন, শফিক, আবু তৈয়বসহ অসংখ্য আরএসও’র সক্রিয় ক্যাডার রয়েছে। পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ বলেন, এ ঘটনায় অপরাধীদের ধরতে অভিযান চলছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা, টাঙ্গাইল থেকে জানান, নিহত আনসার কমান্ডার আলী হোসেনের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের সখীপুরে এখন চলছে মাতম। একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছে এলাকাবাসী।

মৃত্যুর খবর তার গ্রামের বাড়ি জানাজানি হলে শোকের ছায়া নেমে আসে। এ খবরে তার পরিবারের লোকজন শোকে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে । এলাকাবাসী পরিবারটিকে সমবেদনা জানাতে বাড়িতে ভিড় করছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: