মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

পণ্যের মজুদ পর্যাপ্ত, রমজানে কোন সঙ্কট হবে না

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৬
  • গোয়েন্দাদের তীক্ষ্ন নজর থাকবে বাজারের দিকে

এম শাহজাহান ॥ আসন্ন রমজানে বেশি চাহিদা তৈরি হবে এমন সব ভোগ্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ দেশে রয়েছে। ওই সময় চাহিদা অনুযায়ী ভোগ্যপণ্যের যোগান দেয়া সম্ভব বলে মূল্য পরিস্থিতিও স্বাভাবিক থাকবে। তাই রমজানে ন্যায্যদামেই সব ধরনের ভোগ্যপণ্য কিনতে পারবেন ভোক্তারা। রমজান সামনে রেখে ভোক্তাদের জন্য এ সুখবর দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বিপণন ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে ভোক্তাদের জন্য এ সুখবর দিয়ে আরও বলা হয়েছে, রমজানে চাহিদাকে পুঁজি করে কেউ যাতে অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা সংস্থার তীক্ষè নজর থাকবে বাজারের দিকে। এছাড়া সরকার নিয়ন্ত্রিত সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে চিনি, মসুর ডাল, সয়াবিন তেল, ছোলা ও খেজুর বিক্রি করা হবে। রোজা সামনে রেখে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে করা প্রতিবেদনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির কাছেও হস্তান্তর করা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, রমজান সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর এবং পেঁয়াজের। এই ছয় পণ্যের যাতে কোন সঙ্কট না হয় সেজন্য ইতোমধ্যে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিন্ডিকেশন করে যাতে কোন পণ্যের দাম বাড়ানো না হয় সে লক্ষ্যে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করাসহ টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন, রমজানে কোন পণ্যের সঙ্কট তৈরি হবে না। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এছাড়া ওই সময় কেউ যদি পণ্যের দাম বাড়ানোর কারসাজি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। যদিও বাণিজ্যমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরও ইতোমধ্যে ছোলা, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে গেছে। ভোক্তারা দাম বাড়া নিয়ে কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে রয়েছেন।

ভোজ্যতেল ॥ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত এবং পরিশোধিত সয়াবিন ও পামঅয়েল আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ১০ হাজার টন সয়াবিন ও পামঅয়েলের দেশীয় চাহিদা ছাড়াও রমজান ও ঈদ-উল-আযহায় বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হয়। গত বছরের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল ও নিম্নমুখী থাকায় দেশীয় বাজারে দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। এছাড়া রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৯ লাখ ১৯ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ১৭ লাখ ১ হাজার টন ভোজ্যতেল দেশে আনা হয়েছে। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের খুচরা মূল্য প্রতি লিটার ৭৯-৮৪ এবং বোতলজাত ৯০-৯৫ টাকা। খোলা পামঅয়েলের দাম প্রতি লিটার ৬৪-৬৬ টাকার মধ্যে রয়েছে। ফলে মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, গত বছরের রমজানে জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি, এ বছরও বাড়বে না। ভোগ্যপণ্যের মজুদ, আমদানি এবং এলসি নিষ্পত্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, চাহিদামতো দেশে রয়েছে। তাই দাম বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। এছাড়া বেসরকারী খাতের পাশাপাশি রমজানে টিসিবিও ট্রাকসেলে বিক্রি কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। তাই দ্রব্যমূল্য নিয়ে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

চিনি ॥ বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন পরিশোধিত চিনির চাহিদা রয়েছে। গত তিন বছর যাবত আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির মূল্য নিম্নমুখী হওয়ায় দেশীয় বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বর্তমানে চিনির বাজার স্থিতিশীল এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ১৭ লাখ ৯৪ হাজার টন চিনি দেশে আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ১২ লাখ ২১ হাজার টন চিনি এসেছে। আমদানিকৃত চিনির ওপর ট্যারিফ মূল্য ৩৫০ মার্কিন ডলার এবং প্রতি টনে আরোপিত দুই হাজার টাকা স্পেসিফিক শুল্কের সঙ্গে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক কর আরোপ করায় চিনির মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৫২-৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে চিনির বাজার ও মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

তবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার পাইকারি ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ হাজী মোহাম্মদ আলী ভুট্টো জনকণ্ঠকে বলেন, অভ্যন্তরীণ মার্কেটে চিনির বাজার বাড়তির দিকে রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে সিন্ডিকেটচক্র। ফলে দেশে চিনির কোন ঘাটতি না থাকলেও বহির্বিশ্বে দাম বাড়লে দেশেও দাম বেড়ে যাবে। তবে খুচরা পর্যায়ে যে হারে দাম বাড়ছে তাতে সরকারী মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

ছোলা ॥ অভ্যন্তরীণ মার্কেটে আস্ত ছোলার চাহিদা ৬০ হাজার টন। এর মধ্যে ৭ হাজার টন দেশে উৎপাদিত হয়ে থাকে। বাকিটা আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডালসহ ছোলা ৩ লাখ ৫৫ হাজার টন দেশে আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৪৫ হাজার টন ডালসহ ছোলা আমদানি হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ১ লাখ ৪ হাজার টন আস্ত ছোলার এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমান খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোলা ৭৯-৮৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে ছোলার মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পেঁয়াজ ॥ দেশে প্রায় ২২ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার এবং রমজান ও ঈদ-উল-আযহায় বাড়তি চাহিদার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ ৪ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন হয়ে থাকে। বাকিটার সিংহভাগ ভারত থেকে আমদানি করা হয়। তাই ভারতে পেঁয়াজ উৎপাদন ও আমদানি মূল্যের ওপর বাংলাদেশের পেঁয়াজের মূল্য অনেকাংশে নির্ভর করে। গত বছর অতিবৃষ্টির কারণে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে দেশেও এর প্রভাব পড়ে, যা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৪ লাখ ৯৮ হাজার টন পেঁয়াজ দেশে আমদানি হয়েছে। উৎপাদন, আমদানি প্রবাহের কারণে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২০-৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা যথেষ্ট স্বাভাবিক ও দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

মসুর ডাল ॥ দেশের মসুর ডালের চাহিদা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে দেশীয় উৎপাদন প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টন। এনবিআরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ১ লাখ ৯২ হাজার টন মসুর ডাল দেশে এসেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার টন মসুর ডাল দেশে আমদানি হয়েছে। আমদানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মসুর ডালের স্থানীয় বাজারমূল্য ১০০-১৫০ টাকা। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে প্রদিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খেজুর ॥ দেশে প্রায় ১৫ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার টন। এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৩শ’ টন খেজুর দেশে আমদানি হয়েছে। মানের ভিন্নতা থাকায় বর্তমানে প্রতি কেজি খেজুর ৮০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুরের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। তাই রমজানেও খেজুরের দাম বাড়বে না।

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৬

১৪/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: