২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিলুপ্ত ছিটমহল ॥ উন্নয়ন প্রকল্পে নয়ছয়


রাজু মোস্তাফিজ, কুড়িগ্রাম ॥ ভুরুঙ্গামারীতে সদ্যবিলুপ্ত ১০টি ছিটমহলের উন্নয়ন প্রকল্পের ২৫ লাখ টাকার এডিপির বিশেষ বরাদ্দের নয়ছয় কাজে ক্ষিপ্ত ছিটমহলবাসীরা। একাধিক প্রকল্প চেয়ারম্যান কিছুই জানেন না। নামে-বেনামে এসব প্রকল্পের নামমাত্র কাজ করাসহ রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে ৪০ দিনের শ্রমিক দিয়ে কাজ করারও অভিযোগ উঠেছে।

ভুরুঙ্গামারী উপজেলার অভ্যন্তরে ভারতীয় ১০টি ছিটমহলের উন্নয়নে গেল বছরের ২৩ ডিসেম্বর উপজেলা সভাকক্ষে মাসিক সমন্বয় সভায় ৫টি ছিটমহলের ১১টি উন্নয়ন প্রকল্পে এডিপির অর্থ থেকে বরাদ্দ করা হয় ২৫ লাখ টাকা। তিন লাখ টাকা সদর ইউনিয়নের কালামাটি ছিটমহলের উন্নয়নে রেখে ২২ লাখ টাকা ১১টি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্পগুলোর মধ্যে পাথরডুবি ইউনিয়নে দিঘলটারী ছিটমহলে কাঁচা রাস্তা নির্মাণ কাজে বরাদ্দ এক লাখ ৯৭ হাজার টাকা। এ প্রকল্পের চেয়ারম্যান জয়মনিরহাট ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে রাস্তাটিতে মাটি না ফেলে পুরাতন রাস্তার উপরের মাটি সরানো হয়েছে। একই ইউনিয়নের ক্যাম্পের মোড় হতে ছিট সেউতি কুরশার বাংলাবাজার হয়ে কাদেরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্প চেয়ারম্যান ইউপি চেয়ারম্যান শাহাদৎ হোসেন ভোলা ৪০ দিনের কর্মসূচীর শ্রমিক দিয়ে কিছু মাটি ফেলেছেন। স্থানীয় চাঁন মিয়া, মবিয়া বেগম, আবু সামা, শামসুল হক বলেন, রাস্তাটিতে ৪০ দিনের কামলা দিয়ে কয়ডালি মাটি ফেলাইছে। আর কোন কাজ করেনি। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান শাহাদৎ হোসেন ভোলা বলেন, ৪০ দিনের শ্রমিক ছাড়াও ওখানে মাটি কাটা হয়েছে। সেউতি কুরশা ছিটমহলে বাংলাবাজার চত্বরে মাটি ভরাট ও ল্যাট্রিন নির্মাণে একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কাগজপত্রে পাথরডুবি ইউপি সদস্য মফিজুল ইসলাম প্রকল্পের চেয়ারম্যান উল্লেখ করা হলেও এ নামে কোন সদস্য নেই ওই ইউনিয়নে। সরেজমিনে গিয়ে খুঁজেও মফিজুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ভোলা বলেন, আমার ইউনিয়নে মফিজুল নামের কোন সদস্য নেই। যারা প্রকল্প বণ্টন করেছে তারা ভাল জানে। ওই প্রকল্পের কাজ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহাজান সিরাজ করছেন বলে জানা গেছে। শাজাহান সিরাজ বলেন, আমি কাজ করছি এ কথা ঠিক নয়। আমার সুপারিশে বাজারটা হচ্ছে। সেউতি কুরশা ছিটমহলের কাদেরের মোড় হতে সাহেবগঞ্জ ছিটমহলের হায়দারের বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ এক লাখ ৯৭ হাজার। সমপরিমাণ বরাদ্দে সেউতি কুরশা প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘর মেরামত, একটি নলকূপ ও সোলার প্যানেল স্থাপন সবই ফাঁকি দেয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। প্রস্তাবিত সাইনবোর্ডে থেকে দূরে একটি বাড়ির আঙ্গিনায় ২০ হাত একটি ঘর তোলা হয়েছে। তাতে কোন আসবাবপত্র নেই।

এক লাখ ৯৭ হাজার বরাদ্দে শিলখুড়ি ইউনিয়নের ছোট গাড়ালঝড়া ২য় খ-ে ছিটমহলগামী মাটির রাস্তা নির্মাণ কাজে চার ফুট একটি রাস্তায় মাটি ফেলা হয়েছে, ছোট গাড়লঝোড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নলকূপ ও সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ইউপি ও প্রকল্প চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, কাজ কিছুটা হয়েছে। শিলখুড়ি ইউনিয়নের ছোট গাড়ালঝোড়া ২য় খ-ে সেচ সুবিধায় ইরিগেশন পাইপ স্থাপন করার কথা থাকলেও পাইপের হদিস পাওয়া যায়নি। সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রহিমা বেগমকে নামেমাত্র প্রকল্প চেয়ারম্যান করে ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান সুবিধা নিয়েছেন। ছোট গাড়ালঝোড়া ২য় খ-ে প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘর মেরামত ও স্কুলগামী রাস্তা মাটি দ্বারা নির্মাণ কাজে ভুট্টা ক্ষেতের মধ্যে একটি ২০ হাত লম্বা টিনের ঘর তোলা হয়েছে। এর ভিতর ২০টি ব্রেঞ্চ সাজানো। ১০টি ছিটমহলে কৃষকদের মাঝে স্প্রে মেশিন সরবরাহ প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা এছাড়া। প্রায় সব ছিটমহলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কয়েকটি পরিবারকে স্প্রে মেশিন দেয়া হয়েছে। তাও নিম্নমানের। এ প্রকল্পের চেয়ারম্যান উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম ইয়াসিন। তার দাবি ৮০টি স্প্রে মেশিন বিতরণ করেছেন। কিন্তু ছিটমহলে ঘুরে জানা গেছে ২৩ জন স্প্রে মেশিন পেয়েছেন। ছোট গাড়ালঝোড়া ও সেউতি কুরশা ছিটমহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসবাবপত্র সরবরাহ ও সেউতি কুরশা ছিটমহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাট্রিন ও প্রসাবখানা নির্মাণ বরাদ্দ ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫শ’ টাকা।

ল্যাট্টিন প্রসাবখানা দেখা যায়নি। পুরো টাকায় নিম্নমানের কাঠ দিয়ে ২০টি ব্রেঞ্চ বানানো হয়েছে। এর প্রকল্প চেয়ারম্যান শিলখুড়ি ইউপি সদস্য আব্দুল কাদের হলেও কাজ করেছেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম ইয়াসিন। এসব প্রকল্পের কাজের তদারকি ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ১২ হাজার ৫শ’ টাকা অন্যান্য খরচ ধরা হয়েছে এর সঙ্গে। বিশেষ সভার কার্যবিবরণীতে দেখা গেছে সদর ইউনিয়নের উন্নয়নে তিন লাখ টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন সরকারী সুবিধাবঞ্চিত ছিটমহলবাসীদের উন্নয়ন প্রকল্পে এমন নয়ছয় জানতে পেরে তারা উপজেলা প্রকৌশলী এন্তাজুর রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর সরেজমিন তদন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের পুরো কাজ না হলে বাকি বিল ছাড় দেয়া হবে না। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম বলেন, নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বরাদ্দের বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। অভিযোগ পেয়ে সরেজমিন তদন্ত করা হচ্ছে।

দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে কিছুই জানেন না উপজেলা শিক্ষা অফিস। এমন অস্তিত্বহীন দুটি প্রতিষ্ঠানে সরকারের এডিপির বরাদ্দ থেকে ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।