২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বেলস্ পার্ক থেকে বঙ্গবন্ধু উদ্যান


খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ ইতিহাস আর ঐতিহ্য মিশে আছে বরিশাল নগরীর বর্তমান বঙ্গবন্ধু উদ্যান ও সাবেক বেলস্ পার্ককে ঘিরে। এই উদ্যানটি যেমন ব্রিটিশ উদ্যোগের স্মারক। তেমনি এর সঙ্গে মিশে আছে আমাদের জাতীয় জীবনের নানা ঘটনা প্রবাহের ধারাবাহিক অনুষঙ্গ।

সূত্রমতে, ১৮৯৬ সালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এনডি বিটসেন বেল বরিশালে আসেন। ব্রিটিশ এই কর্মকর্তা নানা কারণেই বরিশালে স্মরণীয় হয়ে আছেন। বিটসেন বেল ও খান বাহাদুর হেমায়েত উদ্দিনের প্রচেষ্টায় বরিশালের মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার জন্য বেল ইসলামিয়া হোস্টেল নামে একটি ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। বেল সাহেবের আরও অনেক অবদান রয়েছে। বরিশালে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হলে তিনি এর নির্মূলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে তার নাম মিশে আছে বঙ্গবন্ধু উদ্যান ঘিরে। এই উদ্যান নির্মাণে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বিটসেন বেলের অনন্য প্রচেষ্টার নিদর্শনস্বরূপ। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এটি ‘বেলস্ পার্ক’ নামে পরিচিত ছিল। জনশ্রুতি রয়েছে, রাজা পঞ্চম জর্জের বরিশাল শুভাগমনকে স্মরণীয় করতে এই মাঠটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন বেল সাহেব। কিন্তু কোন এক কারণে সে সময় এই কর্মসূচী বাতিল হয়ে যায়। তারপর থেকে সরকারী-বেসরকারী সকল বৃহৎ কর্মকা- এই মাঠকে ঘিরেই সম্পন্ন হয়। এ মাঠটি গড়ে তুলতে বিটসেন বেল বেশ দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। সে সময়ে কীর্তনখোলা নদী আরও এগিয়ে ছিল। কীর্তনখোলার তীর ঘেঁষে সবুজের এই গালিচা এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ রচনা করেছিল।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু উদ্যান ॥ সূত্রে আরও জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এই পার্কের নামকরণ করে ‘বঙ্গবন্ধু উদ্যান’। সেই থেকে দাফতরিকভাবে এটি ‘বঙ্গবন্ধু উদ্যান’ নাম হলেও সাধারণের কাছে এটি আজও ‘বেলস্ পার্ক’ নামে সুপরিচিত। বঙ্গবন্ধু উদ্যানটি সব মিলিয়ে লম্বায় ৭৫০ ফুট। প্রস্থে এটি ৫৫০ ফুট। তবে এটি উদ্যান ও পাশের লেকসহ সম্পূর্ণ হিসাব। শুধু উদ্যানটি লম্বায় ৫৫০ ফুট ও পাশে ৪৫০ ফুট। উদ্যানটি ঘিরে রয়েছে ওয়াকওয়ে। রয়েছে অসংখ্য বাহারি বৃক্ষ। উদ্যানের পাশে বাহারি লেক এর সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাতে সবুজ ঘাসের পরে নান্দনিক আলো উদ্যানের সৌন্দর্যকে শুধু বাড়ায়নি, তাকে অনন্য করে তুলেছে। বঙ্গবন্ধু উদ্যানের মাঝে সবুজ ঘাসের গালিচা ছাড়াও এর চারদিকে রয়েছে ফুলের বাগান ও ছায়াদানকারী বৃক্ষ। রয়েছে বসার বেঞ্চ ও ছাতি। উদ্যানের পাশে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে অতিসম্প্রতি নির্মাণ করা হয়েছে গ্রীন সিটি পার্ক। যা উদ্যানকে আরও নান্দনিক করেছে। গ্রীন সিটি পার্কের সামনের পরিত্যক্ত লেকটি রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও দৃষ্টিনন্দন করার দাবি করেছেন নগরবাসী। বঙ্গবন্ধু উদ্যানের পাশে (সড়কের পাশে) রয়েছে বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে বড় ম্যুরাল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর এই ম্যুরালটি শিল্পী আমিনুল হাসান লিটু ও শিল্পী হাফিজ উদ্দিন বাবুর তৈরি। বর্তমানে এই বৃহৎ উদ্যানের ওয়াকওয়েতে সকাল-সন্ধ্যায় হেঁটে ভ্রমণ করেন কয়েক হাজার মানুষ। সন্ধ্যায় আলোক উদ্ভাসিত এই উদ্যানটি এখন নগরবাসীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র।

উদ্যানে জনসভা ॥ বঙ্গবন্ধু উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের নেতা-নেত্রীরা জনসভা করেছেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে ভাষণ দিয়েছেন। এ সময় তার (বঙ্গবন্ধু) আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে এখানে একটি ‘মুক্ত মঞ্চ’ করা হয় যা আজও দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু উদ্যানে জনসমাবেশ বা যে কোন উৎসব ঘিরে এখানে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধু উদ্যানে কৃষি ও শিল্প প্রদর্শনী, বৃক্ষমেলা, বাণিজ্যমেলা, কুচকাওয়াজসহ সকল পর্যায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বরিশালের সকল বৃহৎ সমাবেশ, ঘোষণা, মেলা, উৎসব এই উদ্যানকে ঘিরেই। উদ্যানটির মালিকানা গণপূর্ত বিভাগের হলেও এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)।

বঙ্গবন্ধু উদ্যানে ওয়াকওয়ে জায়গা ॥ বিসিসি সূত্রে জানা গেছে, উদ্যানটি যাতে সুন্দর থাকে সে জন্য নানা পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখানে দেখভালের জন্য সিটি কর্পোরেশনের আলাদা লোক রয়েছে। তারা পানি ছিটায়, গাছ ছেঁটে দেয়। বঙ্গবন্ধু উদ্যান ঘিরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল বরিশালের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরণের সময়ে। ২০১১ সালে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে আলোকসজ্জা ও সোন্দর্য বর্ধনের কাজ করা হয়। বর্তমানে পার্কটি একটি আদর্শ সবুজ উদ্যানে পরিণত হয়েছে। ফলে বঙ্গবন্ধু উদ্যান বরিশালে এক পর্যটন কেন্দ্রের রূপ নিয়েছে। সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রায় সোয়াশো বছর আগে বেল সাহেব যে সৌন্দর্যের পত্তন ঘটিয়েছিলেন তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সমর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ৯নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর এমএ জলিল। এ উদ্যানের সঙ্গে জাতীয় সকল সংগ্রাম ও ঘটনা প্রবাহ ঘিরে উদ্যানটিকে একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।