মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে প্রত্যাশা

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৬
  • প্রফেসর ড. আবদুল খালেক

বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবগতভাবেই শান্তিপ্রিয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ দেশের শান্তি বিঘœকারী শক্তিকে মোটেই পছন্দ করে না। নিকট অতীত থেকেই তার উদাহরণ তুলে ধরা যায়। বিগত বছরগুলোতে যেসব রাজনৈতিক দল পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছিল, ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে বিঘœ ঘটিয়েছিল সেসব রাজনৈতিক দলকে সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। কিছু রাজনৈতিক দল ভেবে নিয়েছিল সন্ত্রাসের মাধ্যমে তারা সরকারের পতন ঘটাতে সমর্থ হবে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন না পাওয়ায় সন্ত্রাসীদের প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়ে গেছে। জনসমর্থন ছাড়া যে একটি বৈধ সরকারের পতন ঘটানো যায় না, ২০১৩-১৪ সালের ঘটনাবলী তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সন্ত্রাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব না হলেও ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই। সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে তারা নিত্যনতুন পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে। পেট্রোলবোমার পরিবর্তে সন্ত্রাসীরা এখন গুপ্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। প্রখ্যাত কলাম লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মতে ‘গুপ্তহত্যাকারীদের মূল লক্ষ্য শেখ হাসিনা।’ দেশের সাধারণ মানুষ এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিষয়টিকে তিনি ‘সন্ত্রাসীদের রিহার্সাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কথিত রিহার্সালকারীরা শুধু রাজধানী ঢাকা শহরে নয়, রাজশাহী মহানগরেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে তার বাসার কাছে সকালবেলায় চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে। হত্যা করা হয়েছে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক জিয়াউল হক টুকুকে, হোটেল নাইসে হত্যা করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীকে। এ ছাড়া সোনার দোকানে বোমা ফাটিয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সোনাদানা লুটপাট করে নেয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় রাজশাহীর মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

সমাজের প্রতিটি হত্যাকা-ই চরম দুঃখের এবং বেদনার, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে সমাজের সকল হত্যাকা-েরই প্রতিক্রিয়া যে একই রকম হয়, তা বলা যাবে না। ষাটের দশকে জেনারেল আইয়ুব খান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে দেশের অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন কিন্তু সেসব হত্যার প্রতিবাদে দেশে তেমন কোন তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তবে ১৯৬৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. জোহাকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে নির্মমভাবে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়, সেই হত্যার প্রতিবাদে মানুষ দলে দলে পথে নেমে আসে, শুরু হয় সরকার পতনের আন্দোলন। তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান কার্ফু জারি করেও সে আন্দোলনকে থামাতে পারেনি। ড. জোহার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশে ঘটে যায় এক গণঅভ্যুত্থান। পতন ঘটে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের। মনে রাখতে হবে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগ পতনের আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতাপরবর্তী জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ দেশের সব আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে।

সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে আন্দোলনের যে গতি-প্রকৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাকে হাল্কা করে দেখা মোটেই সমীচীন হবে না।

প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে যারা হত্যা করেছে, প্রত্যাশা করি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তাদেরকে ধরে ফেলবে এবং দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে। এখন পর্যন্ত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করবার ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি ও হতাশা বিরাজ করছে। ছাত্রছাত্রীদের এই হতাশা এবং ক্ষোভ নিরসনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক সমিতির সদস্য এবং অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সমবেদনা প্রকাশ করতে উদ্যোগী হতেন, সেক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের তীব্রতা সম্ভবত কমে যেত। তাদের মনে বিশ্বাস জন্মাত হত্যাকারীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আন্তরিকতার কোন অভাব নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন শিক্ষককে যদি এভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হতো, সরকারের অনেক মন্ত্রীই শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন, পরিবারের শোকাহত সদস্যদের সান্ত¡না দিতেন বলে আমাদের বিশ্বাস।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যাকারীদের শনাক্ত করার ব্যাপারে রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার মহোদয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তার আন্তরিকতার অভাব ঘটলে বড় রকমের সঙ্কট দেখা দিতে পারে। আমরা জানি, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর দক্ষতার অভাব নেই। তবে ক্ষেত্র বিশেষে তাদের আন্তরিকতার অভাব ঘটে যায়, দুশ্চিন্তা সেখানেই।

প্রসঙ্গক্রমে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ১৯৯৬ সালের কথা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। সে সময় আমাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের তখন দোর্দ- প্রতাপ। আমিনুল ইসলাম নামের এক ভদ্রলোক সে সময় রাজশাহী মহানগরের পুলিশ কমিশনার ছিলেন। পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের সামনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসীদের নানারকম ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চলতে থাকে। একপর্যায়ে শিবিরের সন্ত্রাসীরা আমার বাসা ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়, বোমা হামলা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলোর টায়ার কেটে পরিবহন ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়া হয়। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে আমাদের ধারণা জন্মে তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের পৃষ্ঠপোষক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি থেকে দাবি ওঠে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ কমিশনার আমিনুল ইসলামকে রাজশাহী থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। শিক্ষক সমিতির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমিনুল ইসলামকে রাজশাহী থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে পাঠানো হয় এ কে এম শামসুদ্দিন সাহেবকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর উপাচার্য ভবনে এসে আমার সঙ্গে যখন সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন, সেই সময় সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে সন্ত্রাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে কিছু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমার শব্দ শোনবার সঙ্গে সঙ্গে শামসুদ্দিন সাহেব মন্তব্য করেছিলেনÑ ‘সন্ত্রাসীদের কোমর আমি ভেঙ্গে দেব।’ তিনি তার কথা রেখেছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে সন্ত্রাসীদের কোমর তিনি সত্যিই ভেঙ্গে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার সময়কালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোন বোমার শব্দ শোনা যায়নি, ক্যাম্পাসে এক ফোঁটা রক্ত ঝরেনি, কোন রকম প্রাণহানিও ঘটেনি।

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, একে হাল্কা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ যখন কোন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করেন, তা কখনও ব্যর্থ হয় না। ক’দিন আগের একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন স্কেল নিয়ে যখন আন্দোলন শুরু হয়, অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে কটাক্ষ করতে থাকেন। কিন্তু শিক্ষকদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রীকে পিছু হটতে হয়েছে।

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর প্রকৃত হত্যাকারীদের ধরতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ শেষ পর্যন্ত হয়ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের ওপর দায়-দায়িত্ব চাপানোর চেষ্টা করবেন, এসব ক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাহারা দেয়ার দায়িত্ব ব্যাংক গবর্নর ড. আতিয়ার রহমানের ছিল না কিন্তু ব্যাংকের টাকা খোয়া যাওয়ার দায়িত্ব তাকে নিতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি পদত্যাগও করেছেন। অনুরূপভাবে বলা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীসহ দেশে যত রকমের খুন-গুপ্তহত্যা সংঘটিত হচ্ছে, তার দায়-দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কেই নিতে হবে। তিনি পাশ কাটিয়ে যেতে পারবেন না।

অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সে আন্দোলন দেশের সকল পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানা গেছে, দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একযোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনও প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার প্রতিবাদে নানা কর্মসূচী ঘোষণা করতে যাচ্ছে। পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে সে জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল-মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন কোন শিক্ষককে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তখন অনুমান করা যেতেই পারে ধর্মান্ধ জঙ্গী মৌলবাদীদেরই কাজ এটি। তবে প্রকৃত হত্যাকারীদের ধরে কঠোর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করতে না পারলে হত্যাকারীদের স্পর্ধা ক্রমেই বেড়ে যাবে এবং এ ধরনের হত্যাকা- চলতেই থাকবে। আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার দক্ষতার অভাব নেই, সে কথা আমরা জানি, তবে প্রশ্ন দেখা দেয় তাদের আন্তরিকতা নিয়ে। প্রফেসর ড. রেজাউল করিম সিদ্দিকীর প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যদি ব্যর্থ হয়, তাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের যোগ্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠবে, পাশাপাশি সরকারেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৬

১৪/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: