২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নিজামীর ফাঁসি যুদ্ধাপরাধের, ‘ইসলামিস্ট লিডার’ হিসেবে নয়


নিজামী ওরফে ‘মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী’ ওরফে ‘মইত্যা রাজাকারের’ ফাঁসি হয়েছে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জঘন্য যুদ্ধাপরাধের বিচারে- মুসলিম কিংবা তথাকথিত ‘ইসলামিস্ট লিডার’ হিসেবে নয়। যেসব যুদ্ধাপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর তার ফাঁসির দ- হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে :

১. রাউসগাড়ি ও ডেমরা গ্রামের ৪৫০ জনকে নির্বিচারে হত্যা, ২. ধুলাউড়ি গ্রামের ৫২ জনকে হত্যা, ৩. বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা (যে আলবদর বাহিনী বিজয়ের পূর্ব মুহূর্ত একাত্তরের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, নিজামী ছিল সেই আলবদর বাহিনীর প্রধান বা কমান্ডার)। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ, পাঁচ লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ও হত্যা এবং সর্বোপরি তখনকার পাকিস্তানী সামরিক জান্তার গণহত্যা, নারী নির্যাতন, মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, বাড়িছাড়া করা ইত্যাদি জঘন্য যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে নিজামী গংরা সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। নিজামী তখন ছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদা গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন ‘জামায়াতে ইসলামীর’ ছাত্র সংগঠন পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি এবং সেই সুবাদে ভয়ঙ্কর কিলিং স্কোয়ার্ড ‘আলবদর বাহিনীর’ও প্রধান বা কমান্ডার।

অবশ্য এরই মধ্যে নিজামীর সহযোগী বা কিলিং স্কোয়াডের সদস্য মুজাহিদী, কামারুজ্জামান, কাদের মোল্লা ও মুসলিম লীগ-বিএনপির সাকা চৌধুরীর রায় তথা ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। গোলাম আযমের ৯০ বছর এবং আলীমের আমৃত্যু সাজা হওয়ার পর মৃত্যু হয়। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বদর নেতা চৌধুরী মঈন উদ্দিন ও আশরাফ-উজ্জামান খান এবং বাচ্চু রাজাকার পলাতক। তাদেরও যুদ্ধাপরাধী হিসেবেই বিচার হয়েছে, মুসলিম বা ইসলামিস্ট লিডার হিসেবে নয়।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল’ আইন প্রণয়ন ও দেশব্যাপী ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন। ৩৯ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার মধ্যে ১১ হাজারের বিরুদ্ধে চার্জশীট প্রদান করা হয় ও তাদের মধ্যে ৪ জনের ফাঁসির দ- এবং যাবজ্জীবনসহ মেয়াদী সাজা হয় সাড়ে ৬ শতাধিক। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করে জিয়া-মোশতাক দালাল আইন বাতিল করে দেয় এবং সকল যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়। এরপর জিয়া গর্ত থেকে তুলে এনে জামায়াতকে আবার রাজনীতি করার সুযোগ দেয় (বঙ্গবন্ধু সরকার জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন)। এই পথে জামায়াতের সঙ্গে সঙ্গে নিষিদ্ধ ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ ইসলামী ছাত্রশিবির নাম দিয়ে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলে আসে। শিবির একটি গেস্টাপো বাহিনী এবং আজও গুপ্তহত্যা নাশকতা সৃষ্টিকারী হিযবুল মুজাহিদীন, হিযবুত তাহ্রীর, আনসারুল্লা প্রভৃতি টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশন শিবিরেরই ভিন্নরূপ। এসব টেরোরিস্ট অর্গনাইজেশনেও আন্তর্জাতিক টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশন আল কায়েদা, আইএস, তালেবান প্রভৃতির আদর্শে ও আদলে গড়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আপোসহীন ও সাহসী নেতৃত্বে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষ তৎপরতায় শিকড় গাড়তে পারছে না। শেখ হাসিনা কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বা যুদ্ধাপরাধের বিচার করে বসে থাকেননি, বরং বিশ্বব্যাপী সম্মান অর্জনকারী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন। আজ বাংলাদেশ বিদেশে চাল রফতানি করছে, জিডিপি ৭%-এর ওপরে, মানুষের গড় মাথাপিছু আয় ১৪৬৬ মার্কিন ডলার, মূল্যস্ফীতি ৮%-এর নিচে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি এবং সর্বোপরি শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এখন বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রনায়কদের কাছে ঈর্ষার ব্যাপার। এই অদম্য শক্তি শেখ হাসিনা কোথায় পান? এমন প্রশ্নেœর জবাবে আমি সব সময় বলি শেখ হাসিনা পিতার মতোই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও রসুল (সা)-এর প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং বাংলার জনগণের প্রতি অকৃত্রিম আস্থাই তার শক্তি। কিছু ‘সো কলড সিভিল সোসাইটি’ সদস্য তাকে তার দল ও সরকার থেকে আলাদা করে দেখাতে চায়। এরা মতলববাজ। এর আড়ালে তারা শেখ হাসিনাকে দুর্বল করতে চায়। এটা ঠিক শেখ হাসিনার সরকার বা দলে অনেক দুর্বলতা আছে, কোন কোন নেতা-এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তারপরও শেখ হাসিনা বিচক্ষণ নেতৃত্ব দিয়ে তাদের নিয়েই দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিচ্ছেন।

এ পর্যায়ে একটা বিষয় অর্থাৎ জামায়াত সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা দরকার। বিশেষ করে যখন তথাকথিত কিছু মানবাধিকার সংগঠন ও দেশ নিজামীদের বিচারের বিরোধিতা করছে। জামায়াত বা ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ মূলত পবিত্র ইসলামের নামাবলি গায়ে একটি পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক দল। দলটি ধর্মের কথা বলে বা ধর্মের লেবাস পরে ঘুরে বেড়ায়; কিন্তু ইসলামের অন্যতম মৌলনীতি মানবতাবাদের পক্ষে তো নয়ই, বরং সরাসরি বিরোধিতা করে চলেছে ১৯৪১ সালে জন্মের পর থেকেই। এটির জন্ম এবং গড়ে ওঠা ‘মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর আদর্শে ও আদলে। যে কারণে একাত্তরের নজিরবিহীন গণহত্যাকারী পাকিদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করছে তুরস্কের বর্তমান মুসলিম ব্রাদারহুডের এরদোগান সরকার। সর্বশেষ জানা গেল বাংলাদেশের প্রতিবাদের মুখে ঢাকায় তুরস্কের রাষ্ট্রদূতকে তার দেশে ডাকা হয়েছে।

নিজামীর বিরুদ্ধে সর্বমোট ১৬টি অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে আপীল, রিভিউ, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা- এভাবে প্রতিটি বিচারিক প্রক্রিয়ার পরই রায় কার্যকর করা হয়। ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় এবং তার মধ্যে ৩টিতে মৃত্যুদ- ও অন্যগুলোতে যাবজ্জীবনসহ মেয়াদী সাজা বহাল থাকে। এই বিচার প্রক্রিয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত নুরেমবার্গ ট্রায়াল বা টোকিও ট্রায়ালের চেয়েও অনেক বেশি ট্রান্সফারেন্স এবং আইনানুগ। টোকিও বা নুরেমবার্গ ট্রায়ালে আপীল, রিভিউর কোন সুযোগ দেয়া হয়নি, হচ্ছেও না। এখনও সেভাবেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ৩-৪ বছর আগেও আর্জেটিনায় পলাতক অবস্থা থেকে ধরে জার্মানিতে এনে ৯৩ বছর বয়স্ক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। তখন কিন্তু ওইসব মানবতার ধ্বজাধারী কথা বলে না। তাদের প্রতি প্রশ্ন পৃথিবীর কোথায় মাত্র ৯ মাসে একটি স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা এবং অর্ধমিলিয়ন নারীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণ করতে করতে হত্যা করা হয়েছে বা বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যেন মেধাশূন্য থাকে সে লক্ষ্যে দেশের তিন শতাধিক বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে? এর জবাব কি তথাকথিত মানবতাবাদীরা দেবেন? তারপরও তারা নিজামীকে ‘ইসলামিস্ট লিডার’ বলবেই। নিজামীর অপরাধের বিচারে কোন তাড়াহুড়াও করা হয়নি। তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী :

১. গ্রেফতার - ২৯ জুন ২০১০, ২. আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন ১১ ডিসেম্বর ২০১১, ৩. অভিযোগ উত্থাপন বা indictment ২৮ মে ২০১২, ৪. আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের রায় (মৃত্যুদ-সহ) ২৯ অক্টোবর ২০১৪, ৫. সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের রায় (মৃত্যুদ-) ৬ জানুয়ারি ২০১৬, ৬. সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে রিভিউ পিটিশন গ্রহণ না করা বা জবলবপঃবফ ৫ মে ২০১৬, ৭. নিজামী কর্তৃক মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা না করার পর, ৮. ফাঁসি কার্যকর ১১ মে প্রথম প্রহর জিরো ১০ মিনিটে। অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে পালন করেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এমনকি প্রতিটি স্তরে নিজামীর ডিফেন্স ল’য়্যার ছিল যথারীতি। তারপরও বিবিসি প্রধান শিরোনাম করেছে:

ক..BBC-Matiur Rahman Nizami : Bangladesh Islamist leader hanged (BBC News) তবে এ কথাও বলতে হয়েছে- An Islamist Leader has been hanged in Bangladesh for crimes during the war of independence from Pakistan in 1971.

খ. ব্রিটেনের The Guardian তার world Newsএ বলেছে -Bangladesh executes leader of largest Islamist Party.

আরেকটি হেডিং করেছে- world News-বলেছে -Bangladesh executes leader of largest Islamist Party.

আরেকটি হেডিং করেছে- matiur Rahman Niazami Hanged for crimes commited during 1971 war of independence with Pakistan.

গ. পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ফাঁসির বিরোধিতা করলেও সেখানকার দৈনিক উঅডঘ পত্রিকার ঙহষরহব ইস্যুতে হেডিং করা হয়েছে- Matiur Rahman Niazami hanged for crimes committed during 1971 war of independence with Pakistan.

তাকে ‘মাওলানাও বলেনি, নামের শেষে ‘নিজামী’ও লাগায়নি।

ঘ. আল জাজিরার প্রধান শিরোনাম হলোÑ ইধহমষধফবংয বীবপঁঃবং গধঃরঁৎ জধযসধহ ঘরুধসর ভড়ৎ ডধৎ পৎরসবং. সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ১১ মে বলেছে Bangladesh executes Matiur Rahman Nizami for War crimes.

এই উদ্ধৃতিগুলো এজন্য দিলাম যাতে বিশ্ব মোড়ল ও তাদের অর্থে লালিত সাপ্তাহিক ইকোনমিস্টসহ মিডিয়া জগত, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সত্যিকার ব্যাপারটি বুঝতে ও অনুধাবন করতে পারে।

তাদের জানা দরকার, বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে বড় বড় ফৌজদারি অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-। এটি দেশের প্রচলিত আইন। আর নিজামী কতখানি হিংস্র্রতার নেতৃত্ব দিয়েছেন তার ছোট্ট একটি উদাহরণ দিতে চাই। বিজয়ের পূর্বক্ষণে অর্থাৎ ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ বাসা থেকে চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে যেসব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে যিনি শিক্ষক ছিলেন তার জিহ্বা কাটা হয়, যিনি চোখের ডাক্তার তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়, যিনি লেখক বা সাংবাদিক তার হাতের আঙ্গুল কেটে তারপর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বা গুলি করে হত্যা করা হয়। যারা বলেন, অপরাধ যত বড়ই হোক আজকের সমাজে মৃত্যুদ- থাকা উচিত নয়। তাদের উদ্দেশে এটুকুই বলব এখনও মোড়লদের অনেক দেশেই মৃত্যুদ-ের সাজা বলবত রয়েছে। কাজেই ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’। আর চোখ রাঙানি, সে আমরা অনেক দেখেছি। ভুলে গেলে চলবে না, এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও সমমনা দল, জিয়া-এরশাদের সামরিক বা খালেদা জিয়ার আর্মি উদ্দিষ্ট দল নয়। সর্বোপরি নেতৃত্বে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সাহসী, আপোসহীন ও দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা।

ঢাকা : ১২ মে ২০১৬

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি জাতীয় প্রেসক্লাব

balisshafiq@gmail.com