২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

পদ্মার পলিদ্বীপ ॥ সংগ্রামী জীবনের আলেখ্য


কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের খ্যাতি প্রধানত ‘সূর্য দীখল বাড়ী’র লেখক হিসেবে। ১৯৫৫ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর অল্প দিনের ভেতর তিনি কথাশিল্পী হিসেবে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেন। এর তিন দশক পরে বেরোয় তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’। ১৯৮৬-এর এপ্রিল এই বইয়ের প্রকাশকাল। প্রকাশক মুক্তধারা।

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ব্যাধি ও দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশের গ্রাম। এই উপন্যাসের মতো লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাসটিও পল্লীজীবন কেন্দ্রিক। বাস্তবতার যে চিত্র এখানে উঠে এসেছে তা অকৃত্রিম, তথ্যনিষ্ঠ। লেখকের পরিবেশন দক্ষতার জন্য সেই জীবনছবি জ্যান্ত মনে হয়। ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র চেয়ে এই উপন্যাসটির ভাবপরিম-ল বৃহত্তর। পরিবেশ এবং কাহিনীর পটভূমি আলাদা। জীবন সংগ্রামের ছবি এখানে অনেক বেশি দ্বন্দ্বময়।

পদ্মানদীর চরের মানুষজনের জীবনযুদ্ধ নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’। চরের জীবন রৌদ্র-কঠোর, প্লাবন চিহ্নিত এক অনিঃশেষ সংগ্রামী জীবন। চর দখলের লড়াই এই জীবনের অন্যতম প্রধান একটি বিষয়। হিংস্রতার নেশা নয়, এর পেছনে আছে বেঁচে থাকার অনিবার্য তাগিদ।

সুতরাং চরের জীবনে লাঠালাঠি, খুন-জখম অবধারিত। এর সঙ্গে আছে পুলিশ ও জমিদারের লোকজনদের খুশি রাখা, মহাজনের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা, আরও নানা রকম ঝুটঝামেলা। আবু ইসহাক তার সক্ষম কলেমে, ভাষার মনোতোষ প্রয়োগ নৈপুণ্যের ভেতর দিয়ে কৃষিজীবী

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের যে হর্ষ-বিষাদ এঁকে তুলেছেন, এক কথায় তা অনবদ্য।

‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসে দুটি দিক বেশ স্পষ্ট। এক, জীবনের সংগ্রামশীলতা; যা যুযুধান দুটি পক্ষের সামাজিক দ্বন্দ্ব ও বিবাদের মধ্য দিয়ে প্রতিভাসিত। দুই, নিঃস্বার্থ, স্নিগ্ধ প্রেমের ফল্গুধারা। গ্রন্থে আশ্রিত প্রেমের উপাখ্যান আবার প্রবাহিত হয়েছে দুটি খাতে। দুই উপগল্পের নায়িকা যথাক্রমে জরিনা ও রূপজান। এই দুজন ছাড়াও অন্য প্রধান চরিত্রগুলো হচ্ছে ফজল-জরিনার প্রাক্তন এবং রূপজানের বর্তমান স্বামী; ফজলের বাবা এরফান মাতবর এবং জঙ্গুরুল্লা। জঙ্গুরুল্লা এরফান-ফজলদের প্রতিপক্ষ, প্রধান শক্র। এই লোক ভয়ানক দাঙ্গাবাজ। লাঠি-সড়কি সহযোগে চর দখলের কাজে সে খুবই ওস্তাদ।

উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে খুনের চর। ডাকাতের চর, ডাকাত মারার চর এ ধরনের নামের সঙ্গে আমরা পরিচিত। সুতরাং ‘খুনের চর’, নামটিও বাস্তবসম্মত মনে হয়। কিন্তু এই চরের আদি নাম ছিল লটাবনিয়া। চরের দখল নিয়ে একবার প্রচ- বিবাদ হয়। তাতে পাঁচজন লোক মারা পড়ে। তারপর থেকে আস্তে আস্তে জায়গাটির নাম হয়ে যায় খুনের চর। মারামারিতে জয়ী এরফান মাতবর ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা চর দখলে নিয়ে নেয়। দুই মাস যেতে না যেতেই চেরাগ সর্দার তার লোক-লস্কর নিয়ে হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। এতে এরফানের বড় ছেলে রশীদ নিহত হয়। ফলে পরিস্থিতি জটিলতর হয়ে ওঠে। চেরাগ সর্দার চর দখল করে নিতে পারে না। সরকার চর ক্রোক করে এবং থানা-পুলিশের বিস্তর ঝামেলা শেষে এরফান মাতবরই চরের জমি ফিরে পায়। কিন্তু যে মাটি নিয়ে এত কাজিয়া-কোন্দল সেই চর পদ্মার গ্রাসে পরিণত হয় বছর তিনেকের মধ্যে। এসব নিয়ে গ্রাম্য কবি গান বেঁধেছে এভাবেÑ ‘লাঠির জোরে মাটিরে ভাই/ লাঠির জোরে মাটি।/লাঠালাঠি কাটাকাটি/আদালতে হাঁটাহাঁটি/এই না হলে চরের মাটি/ হয় কবে খাঁটি।’

সরকারী খাতাপত্রে খুনের চরের মালিকানা আছে এরফান মাতবরের নামে। কাজেই ওই চর জেগে ওঠার পর এরফান ও তার লোকজন সেই জায়গার দখল নেয়। ইতোমধ্যে জঙ্গুরুল্লার আবির্ভাব ঘটে। এই লোভী ধনী ব্যক্তি এক দুর্ধর্ষ দাঙ্গাবাজ। সে এক সময় জমিদারের নায়েবের পেয়াদা ছিল। তখনই জমিজমা সংক্রান্ত নানা ফন্দি-ফিকির রপ্ত করে। অপেক্ষা করতে থাকে। তার সুদিন ফিরিয়ে আনতেই যেন পদ্মা অল্প দিনের ভেতর অনেকগুলো চর উপহার দেয়। জঙ্গুরুল্লা লোকজন নিয়ে তার কয়েকটা দখল করে নেয়। অবিলম্বে জমিদারের কাছারি থেকে অনুমতি এনে সেই জায়গাগুলোতে নিজেদের লোক বসিয়ে দেয়। কয়েকটি ভিটিতে তোলা নতুন ঘরের টিনের চাল দিনের বেলা রোদে চোখ জলসে দেয়। রাতের বেলা ওই সব স্থাপনা চাঁদের আলোয় ঝলমল করে।

জঙ্গুরুল্লা এক সময় খুনের চর ছিনিয়ে নেয়ার কৌশল আঁটে। ডাকাতির মিথ্যা অভিযোগে ফজলকে ফাঁসিয়ে দেয় সে। এতে করে মারামারি ছাড়াই চরটা সে দখলে নিতে পারে। অবশ্য কারাবাস ও আরও নানা রকমের দুর্ভোগ শেষে ফজল ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা চর পুনর্দখলের পরিকল্পনা করে। রীতিমতো রণকৌশল অবলম্বন করে তারা। প্রচ- লড়াই হয় দুই দলে। ফজলরা লাঠি, শড়কি, রাম দা তো ব্যবহার করেই। তা ছাড়াও গুলেল বাঁশ এবং ভীষণ জ্বালা ধরানো রামচোতরা পাতাকেও তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সুকৌশলে। জঙ্গুরুল্লার দল পালাতে বাধ্য হয়। ফজলরা আবার ফিরে পায় খুনের চর। এভাবে দখল-পুর্নদখলের অনিঃশেষ যুদ্ধ চলে ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’-এ।

এই উপন্যাস কি তাই বলে শুধুই চর দখলের লড়াইয়ের গল্প তুলে ধরেছে? না, জমি-জমার ব্যাপার– স্যাপার ছাড়াও এখানে আছে নর-নারীর হৃদয়ের গভীর কথা। স্নেহশীলা দুঃখী নারী জরিনা মানসিকভাবে ফজলের আশ্রয় পায়; তার সান্নিধ্যেও আসে। কিন্তু বিরূপ পরিস্থিতি তাদের একত্রে থাকতে দেয় না। অন্যদিকে দেখতে পাই, অপূর্ব সুন্দরী রূপজানকে তার পিতা ও শ্বশুরের দ্বন্দ্বজনিত মনোমালিন্যের কারণে ফজলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। অবশ্য এই বিচ্ছেদ সাময়িক। শেষ পর্যন্ত ফজল-রূপজান শান্তিপূর্ণ মিলনের পরিবেশ ফিরে পায়। রূপজান যখন স্বামী থেকে আলাদা সেই সময় জঙ্গুরুল্লা রূপজানকে বিয়ে করার জন্য এক পীর বাবাকে ব্যবহার করে। সেটা কাহিনীর আরেক পর্ব। গ্রামাঞ্চলে ধর্ম ভাঙিয়ে যে শোষণ চলে আসছে তার একটি চিত্র আছে এখানে। চিত্রটি খুবই খ-িত, ইঙ্গিত প্রধান, কিন্তু গুরুত্ববহ।

‘পদ্মার পলিদ্বীপ’-এ বেশ কয়েকটি শাখা-গল্প পাওয়া যায়। গল্পগুলো মোটামুটি প্রাসঙ্গিকভাবে যুক্ত হয়েছে একটির সঙ্গে আরেকটি। সার্থক উপন্যাসের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হচ্ছে কাহিনীর যোগসূত্র রক্ষা করা। সেটা যতেœর সঙ্গেই রক্ষিত হয়েছে। এই উপন্যাসে আবু ইসহাকের রাজনীতিচেতন মনের পরিচয় মেলে। কাহিনীর একটি পর্বে রাজনীতি পরিষ্কার আলো ফেলেছে। ফজল যখন জেলে, সেই সময় মতি ভাইয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাত ঘটে। মতি একজন রাজনৈতিক কর্মী। ফজল তার কাছ থেকে উদারতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবিকতার দীক্ষা পায়। ভিনদেশী শোষকদের (তারা শাসকও বটে) বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে। উপলব্ধি করে নিজের ভেতরের সদর্থক পরিবর্তন। আর এসব কিছুই ঘটে চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে। ততদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢেউ ভারতবর্ষ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

‘পদ্মার পলিদ্বীপকে এপিকধর্মী উপন্যাস বলা যাবে না। কিন্তু এপিকমাত্রা দেয়ার সচেতন প্রয়াস এতে লক্ষণীয়। জঙ্গুরুল্লার কাছ থেকে খুুনের চর পুনর্দখলের বৃত্তান্ত আছে যেখানে, সেই পর্বে লেখক সচেতনভাবেই প্রাচীন মহাকাব্যের স্টাইল অনুসরণ করেছেন। লড়াইয়ের পূর্বে লোকজ অস্ত্র-শস্ত্র তৈরির যে বিবরণ, যুদ্ধের প্রাক্কালে প্রস্তুতির যে টানটান বর্ণনা আমরা পাই তা মহাকাব্যসুলভই বটে। নিবিষ্ট পাঠক এই উপন্যাসে এ্যাডভেঞ্চারেরও স্বাদ পাবেন। কাহিনীর শেষ দিকে ফজল ছদ্মবেশে রূপজানকে ডাকাতি করে তার পিতৃগৃহ থেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে। এই ঘটনার মধ্যে কেবল রোমান্টিক এ্যাডভেঞ্চার নয়, খানিকটা অতিনাটকীয়তাও বর্তমান। কিন্তু এগুলো উপন্যাসের মূল সুরকে ক্ষুণœ করে না। এসব জিনিস বরং গল্পে নতুন ধাঁচের আমেজ উপহার দেয়। প্রসঙ্গত, মুখোশ ব্যবহারের বিষয়টি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে আমার। ফজলের লোকজন হাটে এক মুখোশ বিক্রেতার দেখা পায় এবং তার কাছ থেকে মুখোশগুলো নিয়ে নেয়। প্রতিপক্ষের আক্রমণের একটা পর্যায়ে এসব ভয়ঙ্কর মুখোশ নিজেদের মুখে সেঁটে শত্রুপক্ষকে হতচকিত করে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। এই জায়গায় এসে মনে পড়ে যায় ‘দ্য ম্যাজিক মাউনটেইন’ উপন্যাসের কথা। এই উপন্যাসে টমাস মান ছদ্মবেশের অপূর্ব প্রয়োগ দেখিয়েছেন। বইয়ের ‘কার্নিভ্যাল’ অধ্যায়ে ধিষঢ়ঁৎমরং ঘরমযঃ নামে একটি রাতের বর্ণনা আছে। সেই রাতে যক্ষ্মা হাসপাতালের রোগীরা কেউ থার্মোমিটার, কেউ বা রেখা চিহ্নিত ওষুধের শিশি সেজে অদ্ভুত তামাশায় মেতে ওঠে। এভাবে তারা অনিবার্য মৃত্যুকে উপেক্ষা করতে চায়।

পদ্মার পলিদ্বীপের প্রধান উপজীব্য পদ্মা নদীর চরের মানুষের জীবনের অনিঃশেষ সংগ্রামশীলতা। কিন্তু মারামারি, খুনোখুনি, থানা-পুলিশ, আইন-আদালতই এর শেষ কথা নয়। চরের জীবনে পশুপালন, হা-ডু-ডু, ষোলো ঘুঁটি খেলা এসবও আছে। আছে প্রেম-ভালবাসা, মান-অভিমান, বিরহ-মিলন এসবও। হর্ষ-বিষাদ মেশানো শ্রমজীবী মানুষদের কঠিন জীবনের এই ছবি আবু ইসহাক এঁকেছেন রীতিমতো নৈপুণ্যের সঙ্গে; যথেষ্ট দরদ দিয়ে। ঔপন্যাসিক যে জীবনের বিশ্বাস্য ছবি, যেসব পাত্র-পাত্রীর কথা তুলে এনেছেন তা খুবই বাস্তবানুগ। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সহযোগতিা ছাড়া এ ধরনের উপন্যাস লেখা একেবারেই অসম্ভব। কেননা লেখক এখানে সফলভাবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। রক্তক্ষয়ী জীবন সংগ্রামের সমান্তরালে স্থান পেয়েছে স্নিগ্ধ গীতিময়তা। যেমন তালের পিঠা বানানোর সময়কার গীত যা বইয়ে সুপ্রযুক্ত হয়েছে- ‘তাল গোলগাল যেমুন তেমুন, /আইটা দেখলে ভর করে/ তার চুল দাড়িরে ভয় করে/ অ-বুজান, আমি তাল খাই না ডরে গো,/ তাল খাই না ডরে।’ একই গ্রন্থে চক্রান্ত, জমিজমার লড়াই এবং ধু ধু বালু, চাঁদের আলোয় পুুঁথি পাঠ এবং প্রেম, বিরহ-মিলন এসবের সার্থক সহাবস্থান একজন লেখকের বিরল দক্ষণতারই প্রমাণ; যে দক্ষতা কথাসাহিত্যিকের শিল্পীর।