১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিশ্বের ৫২ দেশে দশ উপায়ে কার্যকর করা হয় মৃত্যুদণ্ড


বিশ্বের ৫২ দেশে দশ উপায়ে কার্যকর করা হয় মৃত্যুদণ্ড

শংকর কুমার দে ॥ এই বিশ্বের ৫২ দেশে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- কার্যকর করা হচ্ছে ১০টি পন্থায়। তবে একেক দেশে একেক পদ্ধতিতে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। কোন কোন দেশের মৃত্যুদ- কার্যকর পদ্ধতি খুবই বীভৎস। বাংলাদেশে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সর্বশেষ যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদ- ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়েছে। কোন দেশে কি পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় তা এ্যামনেস্টির ইন্টারন্যাশনালের তৈরি করা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন যে ১০টি পন্থায় মৃত্যুদ- কার্যকর করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে দড়িতে ঝুলিয়ে ফাঁসি, লেথাল ইনজেকশন, ফায়ারিং স্কোয়াড, ফায়ারিং, শিরচ্ছেদ, বৈদ্যুতিক চেয়ার, গ্যাস চেম্বার, পাথর ছোড়া, উঁচু জায়গা থেকে ফেলে দেয়া। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যে ৫২ দেশে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, ইরাক, জাপান, মালয়েশিয়া ও কুয়েত।

কোন দেশের মৃত্যুদ- হচ্ছে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি। এই শাস্তির বিধান পৃথিবীতে যতগুলো আইনী শাস্তির বিধান আছে তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। অতিতে বীভৎস পন্থায় মৃত্যুদ- কার্যকর করা হতো। যুগের আধুনিকতার সঙ্গে অনেক দেশেই মৃত্যুদ- কার্যকরের প্রক্রিয়ায়ও আধুনিকতার ছাপ দেখা যায়। বিশ্বের সব দেশে মৃত্যুদ- কার্যকরের প্রক্রিয়া এক নয়। কোন্ কোন্ দেশে কিভাবে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় তার পক্রিয়া তুলে ধরা হলো।

দড়িতে ঝুলিয়ে ফাঁসি ॥ বাংলাদেশসহ আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, ইরাক, জাপান, মালয়েশিয়া ও কুয়েতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের প্রচলন রয়েছে? মৃত্যুদ-ে দ-িত ব্যক্তিকে দড়িতে ঝুলিয়ে (ফাঁসি দিয়ে) রাখা হয় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। দড়িতে ঝুলন্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময় পরে নামিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার হাত পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়।

ইনজেকশন ॥ মৃত্যুদ- কার্যকর করার জন্য একটি উপায় হচ্ছে ইনজেকশন। তিনটি রাসায়নিক উপাদানে তৈরি এই ইনজেকশন মানবদেহে পুশ করলে তার মৃত্যু ঘটে। এ্যানেস্থেশিয়ার জন্য সোডিয়াম পেন্টোনাল, সম্পূর্ণ অক্ষম করার জন্য প্যানকিউরোনিয়াম ব্রোমাইড আর হৃদযন্ত্র থামিয়ে দেয়ার জন্য পটাশিয়াম ক্লোরাইড নামের তিনটি রাসায়নিক উপাদান ইনজেকশন তৈরি হয়। এই ইনজেকশন মানবদেহে ঢুকিয়ে যেসব দেশে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় তার মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভিয়েতনাম ইত্যাদি।

ফায়ারিং স্কোয়াড ॥ মৃত্যুদ- কার্যকরের আরেকটি উপায় হচ্ছে ফায়ারিং স্কোয়াড। মৃত্যুদ-ে দ-িত কয়েদিকে একটি ঘরের মধ্যে একটি চেয়ারে বসানো হয়। তার হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় থাকে। মৃত্যুদ-ে দ-িত কয়েদি থেকে ২০ ফুট দূরে একটা দেয়াল থাকে যাতে ফাঁকা জায়গা করা থাকে। এখান থেকেই গুলি করা হয়। পরপর পাঁচবার গুলি করা হয়। এ জন্য থাকে পাঁচটি রাইফেল। পাঁচটি রাইফেলের চারটিতে থাকে তাজা গুলি। আর একটিতে ফাঁকা গুলি। অর্থাৎ নিহত ব্যক্তি চারটি গুলির আঘাতে মারা যায়। অন্যদিকে পাঁচজন শূটারের মাঝে একজন শূটার তার হত্যাকারী নয়। কে হত্যাকারী নয় তা নির্ণয় করাও সম্ভব নয়। ফলে সবাই দাবি করতে পারে নিহত ব্যক্তি অন্তত তার গুলিতে মারা যায়নি। এটা যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদ- কার্যকরের পুরনো পদ্ধতি।

গুলি ॥ মৃত্যুদ- কার্যকর করার আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে গুলি। মৃত্যুদ-ে দ-িত ব্যক্তির চোখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে তাকে বসিয়ে বা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এরপর সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য একের পর এক গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করেন। চীন, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তাইওয়ান, উত্তর কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশে গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

বৈদ্যুতিক চেয়ার ॥ বৈদ্যুতিক চেয়ার হচ্ছে মৃত্যুদ- কার্যকর করার আরেক পদ্ধতি। এতে কাঠের চেয়ার ব্যবহার করা হয়, যাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ইলেকট্রিক লাইন দেয়া থাকে। মৃত্যুদ-ে দ-িতকে সে চেয়ারে বসিয়ে হাত-পা-বুক ফিতা দিয়ে বাঁধা হয়। তার মাথায় মেটালিক হেলমেট পরানো হয়। ১০০০ থেকে ২৩০০ ভোল্ট বিদ্যুত প্রবাহিত করা হয়। প্রতিবার ৩০ সেকেন্ড করে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কয়েকবার এভাবে বিদ্যুত প্রবাহিত করা হয়। এই পদ্ধতিটা প্রচলিত আছে যুক্তরাষ্ট্রে ?

গ্যাস চেম্বার ॥ গ্যাস চেম্বারে আবদ্ধ করে মৃত্যুদ-ে দ-িত ব্যক্তির মৃত্যু কার্যকর করার একটি পদ্ধতি। গ্যাস চেম্বার দিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার জন্য আবদ্ধ ঘরের মতো যাতে একটি চেয়ার ও একটি সিলিন্ডার থাকে। সিলিন্ডারে সায়ানাইডের বড়ি থাকে এবং নিচে একটি পাত্রে সালফিউরিক এ্যাসিড থাকে। চেয়ারে বসিয়ে দ-িতের হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়। এবার বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে সিলিন্ডারের সায়ানাইড, সালফিউরিক এ্যাসিডে পড়ে। মুহূর্তেই বিষাক্ত গ্যাস তৈার হয়, যা মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যে অচেতন করে ফেলে। খিঁচুনি শুরু হয় এবং মৃত্যু ঘটে। আসামির মৃত্যু নিশ্চিত হবার পর সেই চেম্বার বিষাক্ত গ্যাস মুক্ত করা হয়। ৩০ মিনিট পর সেই চেম্বার খুলে মৃতদেহ বের করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চাশটি রাজ্যের মধ্যে কয়েকটিতে এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

শিরñেদ ॥ কয়েক হাজার বছর ধরেই শিরñেদের মাধ্যমে মৃত্যুদ- কার্যকরের পদ্ধতি প্রচলিত আছে? তবে বর্তমানে শুধু সৌদি আরবে এই পদ্ধতিটি চালু রয়েছে? সাধারণত শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রকাশ্যে শিরñেদ করা হয়। এই পদ্ধতিতে একবারে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এটা নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া, তবে ধর্মীয় বিধান থেকে এই ধরনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

পাথর ছুড়ে মারা ॥ মাটিতে পুঁতে বা কোন কিছুর সঙ্গে বেঁধে পাথর ছুড়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার আরেকটি পদ্ধতি। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানে এই পদ্ধতি আংশিকভাবে চালু আছে। মৃত্যুদ- কার্যকরের এই পদ্ধতিকেও কার্যকরকারীরা ধর্মীয় বিধান বলেই প্রচার করেন।

উঁচু থেকে ফেলে দিয়ে ॥ মৃত্যুদ- কার্যকর করার উপায়ের মধ্যে উঁচু থেকে ফেলে দেয়া একটি পদ্ধতি। অনেক উঁচু থেকে অভিযুক্তকে নিচে ফেলে দেয়ার মাধ্যমেও মৃত্যুদ- কার্যকর করার পদ্বতিটি খুবই পুরাতন। এই পদ্ধতির কথা ইরানে প্রচলিত থাকার কথা জনশ্রুতি আছে।

হত্যার বদলা হত্যা ॥ কাউকে হত্যা করা হলে তার বদলে অনুরূপভাবে হতা করাটা হচ্ছে মৃত্যুদ- কার্যকর করার একটি পদ্ধতি। কাউকে যে ভাবে হত্যা করা হয়, অভিযুক্তকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুদ- কার্যকরের এই পদ্ধতিটির প্রচলন আছে সুদানে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৃত্যুদ- বিধানের প্রচলন আছে এমন দেশের সংখ্যা ৫২টি। তবে মৃত্যুদ- বিধান থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ নেই, এমন দেশের সংখ্যা ৪২টি। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই ধরনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশ্বে কতটি দেশে মৃত্যুদ- নেই, কতটি দেশে মৃত্যুদ- বাতিল করা হয়েছে, কতটি দেশে মৃত্যুদ-ের বিধান আছে আবার কতটি দেশে মৃত্যুদ-ের প্রয়োগ নেই, এমন ধরনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ যা ফায়ারিং স্কোয়াড, ইলেকট্রিক চেয়ার, গ্যাস চেম্বারÑএই তিন পদ্ধতিই ব্যবহার করে।

পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার নিজের দেশে তিন ধরনের মৃত্যুদ- কার্যকর করার পদ্ধতি আছে যেটা বন্ধ করতে পারে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্বগণ নিজ দেশে মৃত্যুদ- রহিত করতে না পারলেও বাংলাদেশের বেলায় বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের নির্লজ্জ পক্ষাবলম্বন করে তাদের মৃত্যুদ-ের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিতে দেখা যায়।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: