২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভুল নক্সার খেসারত ॥ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের প্রত্যাশিত সুফল পাবে না রাজধানীবাসী


ভুল নক্সার খেসারত ॥ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের প্রত্যাশিত সুফল পাবে না রাজধানীবাসী

রাজন ভট্টাচার্য ॥ ত্রুটিপূর্ণ নক্সা এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের সুফল পাবে না রাজধানীবাসী। মতিঝিল-গুলিস্তান থেকে মহাখালীমুখী যানবাহনে সৃষ্ট মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার এলাকার যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হলেও ত্রুটিপূর্ণ নক্সার কারণে এটি সুফল হচ্ছে না। রাজারবাগ-শান্তিনগর থেকে উঠে আসা ফ্লাইওভারটি মগবাজারে ডানে মোড় না থাকায় এই স্থাপনার প্রত্যাশিত সুফল মিলবে না। উপরন্তু অপরিকল্পিতভাবে রাজারবাগ প্রান্ত নামিয়ে দেয়ার কারণে খিলগাঁও-গোড়ান, বাসাবো এলাকার লাখ লাখ মানুষকে পড়তে হবে চরম দুর্ভোগে। তবে রমনা-সাতরাস্তা অংশটুকু (ইতোমধ্যে খুলে দেয়া) রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণগামী যানবাহনের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

রাজধানীর যানজট নিরসনের মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্প অন্যতম। কাকরাইল-মালিবাগ-রাজারবাগ-রামপুরা-মগবাজার-বাংলামটর-রমনা-মহাখালীসহ আশপাশের এলাকার যানজট সমস্যা সমাধানে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। আগামী বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বাস্তবতা হলো পুরো কাজ শেষ হলেও যানজটের কবল থেকে মুক্তি মিলেবে না। এর কারণ হলো-শান্তিনগর-রাজারবাগ পয়েন্ট থেকে উড়াল সড়ক হয়ে সরাসরি সাতরাস্তা যাওয়ার কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মূলত এই রাস্তা দিয়েই চলাচল করে গোটা প্রকল্পের অধিকাংশ যানবাহন। দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি মগবাজার ক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে বাংলামটরের কাছে নেমে যাবে। এ রাস্তায় চলাচল করে খুবই কমসংখ্যক যানবাহন। স্বল্পসংখ্যক যানবাহনের জন্য এত অর্থ ব্যয় করে ফ্লাইওভার নির্মাণের কি প্রয়োজন ছিল এ নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। রমনা-সাতরাস্তা এবং শান্তিনগর-রাজারবাগ থেকে মালিবাগ অংশ নির্মাণ করলেই যথেষ্ট ছিল। এজন্য এত অর্থেরও প্রয়োজন হতো না। এছাড়া বাসাবো, খিলগাঁও গোড়ান এলকার লাখ লাখ মানুষের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনবে ফ্লাইওভারের রাজারবাগ প্রান্ত। মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার ছাড়াও এই প্রান্তে একই সঙ্গে জমা হবে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের যানবাহন। দুই ফ্লাইওভারের যানবাহনে রাজারবাগ সিগন্যালে সৃষ্টি হবে স্থায়ী যানজট। অথচ রাজারবাগ প্রান্তটি আর কিছুদূর বর্ধিত করে পুলিশ লাইনের মোড় অতিক্রম করে দিলেই এ সমস্যার সমাধান করা যেত। দুর্ভোগ থেকে বেঁচে যেত রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা।

নগর পরিকল্পনাবীদরা বলছেন, ভুল নক্সা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ না করে কাজ করায় এ সমস্যা হয়েছে। এ কারণে যানজটের ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলছে না যানবাহন ও পথচারীদের। ভুল নক্সা কি জানতে চাইলে একজন নগর বিশেষজ্ঞ জানান, বিদেশী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে মূলত বাম হাতে চালিত গাড়ির জন্যই তৈরি হয়েছে নক্সাটি। সংশ্লিষ্টদের অগোচরেই অনেক দূর এগিয়ে যায় প্রকল্পের কাজ। বিষয়টি নজরে এলে কিছুটা সংশোধন করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মূল ত্রুটি সংশোধন করা যায়নি। বাম হাতে চালিত গাড়ির জন্য মগবাজার মোড়ে যে ডানে মোড়টি করা হয়েছিল তা এখন সাতরাস্তা থেকে মালিবাগগামী যানবাহনের জন্য বামে মোড় পরিণত করা হয়েছে যার কোন প্রয়োজনই ছিল না। এছাড়া রাজারবাগ প্রান্তে সিগন্যালটি অতিক্রম করে দেয়া যায়নি সঠিক পরিকল্পনার অভাবে।

রাজধানীর ট্রাফিক বিভাগ বলছে, রাজারবাগ-শান্তিনগর থেকে সরাসরি গাড়িগুলো সাতরাস্তা পর্যন্ত না যেতে পারলে যানজটের ভোগান্তি তো হবেই। সবচেয়ে বেশি হবে মগবাজার মোড়ে। মৌচাক ও মালিবাগ মোড়েও কমবেশি ভোগান্তি পোহাতে হবে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাকরাইল-রাজারবাগ থেকে মৌচাক হয়ে মহাখালী যাওয়া সহজ। রামপুরা হয়ে গেলে অনেক বেশি রাস্তা অতিক্রম করতে হবে। এক্ষেত্রে হয়ত দেখা যাবে অনেক গাড়ি ফ্লাইওভার ব্যবহার না করেই নিচ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে যানজট লেগেই থাকবে মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার এলাকায়।

প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলম বলেন, প্রকৌশলগত সদস্যার কারণে শান্তিনগর ও রাজারবাগ থেকে সরাসরি সাতরাস্তা পর্যন্ত গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এ দুই পয়েন্ট থেকে গাড়িগুলো মৌচাক মোড়ে এসে রাইট ট্রার্ন করে আবুল হোটেল পর্যন্ত নামবে। সেখান থেকে সহজেই হাতিরঝিল হয়ে মহাখালী যেতে পারবে। এতে কোন গাড়ি যানজটের মুখে পরবে না।

উড়াল সড়কে যত সমস্যা ॥ মতিঝিল ও পল্টন হয়ে কাকরাইলের দিকে আসা গাড়িগুলো শান্তিনগরের আগেই যানজটের মুখে পড়তে হয়। আবার শাজাহানপুর ও কমলাপুর এলাকা থেকে আসা পরিবহনগুলোতে রাজারবাগ-মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার থেকে মহাখালী পর্যন্ত যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এসব গাড়িগুলোর চলাচলের সুবিধার্থে উড়াল সড়ক ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আবার রামপুরা হয়ে যেসব পরিবহন মহাখালী যাবে সেগুলোর দুর্ভোগও কম নয়। এই উড়াল সড়কের নক্সার সময় এ বিষয়টি কিভাবে সবার চোখ ফাঁকি দিল এ নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই।

প্রকল্প নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, শান্তিনগর-রাজারবাগ ও রামপুরা থেকে আসা পরিবহনগুলো সরাসরি মহাখালী অর্থাৎ সাতরাস্তা পর্যন্ত যাওয়ার কোন সুযোগ উড়াল সড়কটিতে থাকছে না! তবে অনেক আলোচনা সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত মহাখালী থেকে মৌচাক আসতে একটি লুপ রাখা হয়েছে। তাও আবার লুপটি মগবাজার চৌরাস্তা হয়ে নেমেছে রাশমনো হাসপাতাল অর্থাৎ ওয়্যারলেস গেট পর্যন্ত। এখানে নামার পর পরিবহনগুলো মৌচাক-মালিবাগমুখী হওয়ার পর যানজটের মুখে পড়তে হবে।

প্রকৌশলীরা বলছেন, যানজট এড়াতে মহাখালীমুখী পরিবহনগুলোকে কাকরাইল হয়ে হলিফ্যামেলি হাসপাতালের সামনের লুপ ব্যবহার করতে হবে। তবে রাস্তা সরু হওয়ায় ও ভিআইপি সড়কের কারণে এটি সম্ভব নয় বলে মনে করে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিউ ইস্কাটন সড়কের গাড়ি ফ্লাইওভারে উঠলে শান্তিনগর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের তিন নম্বর গেটের সামনে গিয়ে নামতে পারবে। এছাড়া নিউ ইস্কাটনের সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনের রাস্তা দিয়ে যে কোন গাড়ি রামপুরা সড়কের আবুল হোটেল পর্যন্ত গিয়ে নামতে পারবে।

তিন ধাপে চালু হবে পুরো উড়াল সড়ক ॥ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তিনটি ধাপের মধ্যে মগবাজার সাতরাস্তা থেকে হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত মূল অংশ হিসেবে ধরা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ইস্কাটন থেকে মৌচাক পর্যন্ত অংশের কাজ শেষ হয়েছে ৮৫ শতাংশ। যা আগামী জুন-জুলাইয়ে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হতে পারে। আর শেষ ধাপ রামপুরা থেকে মালিবাগ-মৌচাক হয়ে রাজারবাগ-শান্তিনগরের কাজের মাত্র ৪৫ শতাংশ শেষ হয়েছে, যা এ বছরের ডিসেম্বরে চালু করার আশাবাদ প্রকল্প কর্মকর্তাদের। তবে আগামী বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়েছে।

২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। সমন্বিত এ ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের মধ্যে। পরে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করে চালু করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাও হয়নি। আর এ সড়কে চলাচলকারী জনসাধারণের দুর্ভোগও সীমা ছাড়িয়েছে।

রাজধানীর যানজট নিরসনে সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক এই প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে ঠিকাদার ও তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণে তিন দফায় সময় বাড়ানোর পর এখন ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৫৮ শতাংশ বাড়িয়ে এক হাজার ২১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও নাভানার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ‘সিমপ্লেক্স নাভানা জেভি’ এবং চীনা প্রতিষ্ঠান দ্য নাম্বার ফোর মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন ওভারসিজ কোম্পানি (এমসিসিসি) ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড উড়াল সড়কটির নির্মাণ কাজ করছে। তবে এখন বেশিরভাগ অংশের কাজই করছে তমা।

ভুলের প্রকল্প ॥ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদেশী প্রতিষ্ঠান দিয়ে নক্সা করানোর কারণে এক পর্যায়ে উড়াল সড়কের জটিল ত্রুটি ধরা পড়ে। আমেরিকান প্রকৌশলীরা নিজ দেশে বাম হাতে চালকদের স্টিয়ারিং ধরার বিষয়টি মাথায় এই উড়াল সড়কের নক্সা করেন। কিন্তু আমাদের দেশে ডান হাতে থাকে পরিবহন চালকদের স্টিয়ারিং। এ নিয়ে জটিলতা বাধে। এক পর্যায়ে ১২২ বার প্রকল্পের নক্সা বদলানো হয়। তাছাড়া ফ্লাইওভারে ওঠা ও নামার অংশের ত্রুটি সমাধান করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম জনকণ্ঠ’কে বলেন, দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কোন আলোচনা বা পরামর্শ না করায় উড়াল সড়কটির নানা ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি কিছু সমস্যা সমাধান করার। তিনি বলেন, দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সহযোগিতা সবক্ষেত্রে চাওয়া হলে এত সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না।

সূত্রে জানা গেছে, নক্সার ভুলের কারণে ৬০টি পিলার ভাঙ্গার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল এলজিইডিকে। জবাবে প্রকল্প পরিচালক মোঃ নাজমুল আলম বলেন, ফ্লাইওভারে ডানহাতি স্টিয়ারিংয়ের কথা মাথায় রেখেই ডিজাইন করা হয়েছে। নির্মাণ কাজও চলছে সেভাবে। কাজেই ডানহাতি স্টিয়ারিং অনুযায়ী যান চলাচলে ঝুঁকির কোন কারণ নেই। তিনি বলেন, অনেকে না জেনে সমালোচনা করছেন। ইতোমধ্যে উড়াল সড়কের একাংশ গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। প্রায় নয় কিলোমিটার আয়তনের ফ্লাইওভারের মধ্যে সাতরাস্তা-মগবাজারের হলিফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত দুই কিলোমিটার সড়ক খুলে দেয়ার কথা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: