২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শক্ত দেউলিয়া ও অর্থঋণ আদালত আইন দরকার


২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আর বেশি দেরি নেই। ক্লান্ত অর্থমন্ত্রী সম্ভবত তার বাজেট বক্তৃতা লিখতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কী করবেন, কী করবেন না তা নিয়ে তার চিন্তা-ভাবনার সম্ভবত একটা পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ইতোমধ্যে বাজেটের পূর্বেই কিন্তু বাজার উত্তপ্ত। এটা কী অর্থমন্ত্রীর সমস্যা, না বাণিজ্যমন্ত্রীর সমস্যা? জানি না, তবে এটা যে সরকারের সমস্যা তাতে কোন সন্দেহ নেই। ঢাকায় রিক্সা ভাড়া হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধির একটা সূচক। এই সূচক কিন্তু বেশ নড়াচড়া করছে। রিক্সা ভাড়ায় মধ্যবিত্ত আক্রান্ত। ছেলেমেয়ে এবং নিজেকে হিসাবে ধরে একজন মধ্যবিত্তকে রিক্সার শরণাপন্ন হতে হয় অনেকবার। এই রিক্সার ভাড়ায় উর্ধগতি পরিলক্ষিত, কাঁচা বাজারে শাক-সবজির মূল্য উর্ধমুখী। খাসির মাংস একটু ভাল হলে ৭০০ টাকা কেজি। রসুনের দামের কথা নাইবা বললাম। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যাই বলুন না কেন, টিসিবি যত তথ্যই দেয় না কেন বাজার কিন্তু অস্থিতিশীল। অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই বুঝবেন এই গরম বাজারে যদি তার ‘ভ্যাট’ পদক্ষেপ আরেকটু গরম যোগায় তাহলে পরিস্থিতি কী হবে? আমি কোন অগ্রিম কথা বলতে চাই না। তবে ব্যবসায়ীদের ‘ভাবসাবে’ ভাল মনে হচ্ছে না। রোজাও সামনে। ব্যবসায়ীদের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কা-, তারপর বাজেট, তার সঙ্গে রোজা সব মিলিয়ে সরকারের সামনে একটা বড় ‘বাজারযুদ্ধ’ অপেক্ষা করছে বলে মনে হয়। এমন অবস্থায় কী আর মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে অন্য কোন কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া যায়? সাধারণভাবে দেয়া যায় না। তবে অবস্থার বিপাকে পড়ে দু’-একটা কথা তাকে মনে করিয়েই দিতে হয়। আমি তাকে জেলা বাজেটের কথা মনে করিয়ে দেব না। এমন কি ‘ব্যাংকিং কমিশন’ সম্পর্কে কিছু বলব না। অথচ এটা তার অঙ্গীকার ছিল ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে। এ সম্পর্কে কিছুই হয়নি। অথচ এই খাতটি জ্বলছে। জ্বলছে যে তা অর্থমন্ত্রীর কথাতেই বোঝা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি সর্বশেষ ঘটনা। এতগুলো টাকা চোখের সামনে হাতছাড়া হয়ে গেল, অথচ এখন পর্যন্ত আমরা কেউ কিছু বুঝতেই পারছি না- কীভাবে এটা ঘটল। দেখা যাচ্ছে এখন পারস্পরিক দোষারোপ শুরু হয়েছে। আমরা দুষছি ‘সুইফটকে’ এবং ‘ফেডকে’ তারা দুষছে আমাদেরকে। ফিলিপাইনীরা ব্যস্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে। অচিরেই ‘রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের’ ওপর চূড়ান্ত কিছু পাব বলে আশা করা যাচ্ছে না। আর এই সম্পর্কেই বলি কেন, ব্যাংকিং খাতে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। কোন কূলকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। ‘হলমার্কের’ টাকার শেষ পরিণতি কী হবে কে জানে? মামলা চলছে। ‘বিসমিল্লাহ’র কী হবে তাও জানি না। ‘ব্যাসিক ব্যাংকের’ প্রাক্তন চেয়ারম্যান সাহেবের কী হবে তাও জানি না। তার কথা অর্থমন্ত্রী মহোদয় সংসদে বলেছেন। এদিকে চট্টগ্রামে বহু বড় বড় ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকেই পলাতক বলে খবরের কাগজে পড়েছি। ‘বিসমিল্লাহ’র মালিক দুবাই বসে ব্যবসা করছে বলে কথাবার্তা হচ্ছে। আরও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা নানাভাবে ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দিয়ে বুক উঁচিয়ে চলেছেন। যারা পেয়েছেন তারা নিজেদের বড় বড় ঋণ ‘রিস্ট্রাকচার’ বা পুনর্গঠন করে নিয়েছেন। ঋণের ওপর সুদের হার কমিয়ে নিয়েছেন, পরিশোধের সময় হ্রাস করিয়েছেন, গ্রেইস পিরিয়ড করিয়েছেন, আরও কত কী। এদিকে খবরের কাগজে এ নিয়ে বড় বড় স্টোরি ছাপা হচ্ছে। বলা হচ্ছে চারটি সরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক করের টাকায় চলছে। তাদেরকে সরকার প্রতি বছর পুঁজি সরবরাহ করছে। কারণ শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের জন্য তাদের আয় কম হচ্ছে। আয় কম হওয়ায় ‘প্রভিশন’ রাখতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে পুঁজি স্বল্পতা। মিডিয়ায় ওইসব ব্যাংকের সমস্যার সমাধান কী তার আলোচনা নেই। রোমহর্ষক সব ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছে। বলা হচ্ছে ওইসব ব্যাংকে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। আরও বলা হচ্ছে খেলাপী ঋণের পরিমাণ নিয়ে সরকার প্রতারণা করছে। প্রকৃতপক্ষে খেলাপী ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, তা কম করে দেখানো হয়। ব্যাংকগুলো ঋণ ‘অবলোপন’ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মেনে এবং তাদের নির্দেশে। ওইসব ‘ব্যাড-ডেট’ (কু ঋণ)-এর বিপরীতে ‘সম্পূর্ণ প্রভিশন’ করা আছে এবং প্রত্যেকটির বিরুদ্ধে মামলা করা আছে। মিডিয়া এসব মানতে রাজি নয়। মানুষকে মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে ব্যাংকের টাকা সমানে ‘লুট’ হচ্ছে। যেখানে যাওয়া যায় সেখানেই এক কথা। সুস্থভাবে কথা বলা যায় না। খেলাপী ঋণের সমস্যা যে পৃথিবীর সব দেশে আছে, তার কথা কেউ শুনতে চায় না। আমেরিকা ৭-৮ বছর আগে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন (এক হাজার বিলিয়ন) ডলার ঢেলে ব্যাংকের খেলাপী সমস্যার সমাধান করেছে তার কথা কেউ আমলে নিতে চায় না। লোক মুখে ব্যাংকের অনিয়মের কথাই শোনা যায়।

মাননীয় অর্থমন্ত্রী, এবার তাই আপনাকে আপনার বাজেটে এই সম্পর্কে কয়েক পাতা খরচ করার জন্য তাগিদ দিচ্ছি। মূল সমস্যা খেলাপী ঋণ, মূল সমস্যা বড় বড় ঋণ, মূল সমস্যা বড় বড় অবকাঠামো ঋণ। এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এর একটা বিহিত দরকার। সরকারী ব্যাংকের টাকা ‘গনিমতের মাল’। এ ধরনের ভাবনার ইতি হওয়া দরকার। আমরা মনে করেছিলাম অর্থঋণ আদালত আইন দিয়ে খেলাপী ঋণের টাকা আদায় করা হবে। এই আইন কার্যত অচল। অথচ দুই-তিনবার তার সংশোধন করা হয়েছে। এক শ্রেণীর উকিল ব্যাংকার, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং খেলাপী ঋণগ্রহীতা এই আইনকে অচল করে রেখেছে। দেশে আছে একটা ব্যাংক্রাপ্টচি আইন (দেউলিয়া আইন)। ব্যাংকগুলো তার ধারে-কাছে যায় না। তারা একটা কাজ ভালভাবে করছেÑ পাঁচ-সাত হাজার টাকা আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করে কৃষকের কোমরে প্রতি বছর দড়ি বাঁধছে। গরিবের কোমরে দড়ি- ভারি আনন্দ। কত টাকার জন্য? পাঁচ, সাত, দশ হাজার টাকা কৃষি ঋণের জন্য। কিন্তু শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণের জন্য কিছুই হয় না। তাদের ঋণ পুনঃ তফসিল হয়। পুনঃ তফসিলে কাজ হয় না। হয় পুনর্গঠন। অদ্ভুত এক দেশ, ‘উঠেছে উটের পিঠে’। মনে হয় রাষ্ট্রের নীতি কিছু লোককে ধনী করা, যারা ‘উন্নয়নের’ কাজ করবে। যদি তা না হয় তা হলে সরকারকে এবারের বাজেটে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে মানুষ মনে করেÑ না, সরকার সিরিয়াস হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের মেয়র সাহেবরা যদি ঢাকার জঞ্জাল পরিষ্কারে কৃতিত্ব দেখাতে পারেন তা হলে ব্যাংকের আবর্জনা পরিষ্কারে সরকার কেন আন্তরিক হতে পারবে না। মাননীয় অর্থমন্ত্রী আপনার বাজেটে প্রথমেই একটা জিনিস চাই। না, ‘ব্যাংকিং’ কমিশন আপনি পরে করবেন, করুন। আপনি উচ্চতর আদালতে যে মামলাগুলো ‘বেঞ্চের’ অভাবে, বিচারকের অভাবে আটকা পড়ে আছে তার একটা বিহিত করুন। হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করতে পারবেন। অর্থঋণ আদালত আইনকে কার্যকর করুন। বড়জোর এক বছরের মধ্যে যাতে ব্যাংক ‘রায়’ পায় তার ব্যবস্থা করুন। ঋণগ্রহীতা ঋণ নিয়েছে। সাক্ষীর কোন অভাব নেই। দলিল-দস্তাবেজের কোন অভাব নেই। আপনি জরুরী ভিত্তিতে এই আইন বদল করুন। আমি খুশি হব এই আইনের মাধ্যমে যদি ঋণ খেলাপীকে ‘ক্রিমিন্যাল অফেন্স’ হিসেবে ট্রিট করা হয়। বর্তমানে তা সিভিল অফেন্স। সিভিল মামলার ভবিষ্যত কী তার কথা সবাই জানে। আরেকটা কাজ। দেউলিয়া আইন শক্ত করুন, তা ব্যবহার করতে শুরু করুন। প্রতিবেশী দেশ ভারত বিজয় মালব্য বলে এক ব্যাংক ডাকাতকে ইংল্যান্ড থেকে ধরে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সে পালিয়েছে। যে সমস্ত কোম্পানির মালিকরা ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয় না তাদের মালিকানায় হস্তক্ষেপ করুন। ব্যাংক হচ্ছে ‘ক্রেডিটর’। তার অধিকার আরও শক্ত করুন। খেলাপী মালিকরা বুঝুক ঋণের টাকা ফেরত না দিলে তার হাতে কোম্পানি থাকবে না। দেখবেন, ফল পাবেন। টাকা-পয়সা নিয়ে নয়-ছয় চলতে দেয়া যায় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘লোন রিস্ট্রাকচার’ করেছে। সাবধান হোন। এই সমস্ত কোম্পানি ওয়াদা মোতাবেক ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারবে বলে আমি মনে করি না। তাদের ‘ক্যাশ ফ্লো’ কম। এই ‘ক্যাশ ফ্লো’ দিয়ে তারা ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। তাদের অনেকেই ব্যাংকের টাকায় জমি কিনেছেন। জমির বাজার নেই। অতএব বড় বিপদ নয় কী? অতএব এখন থেকে সমস্যাটা হিসাবে রাখুন। জলদি অর্থঋণ আদালত আইন বদল করুন, দেউলিয়া আইন শক্তভাবে চালু করুন এবং উচ্চতর আদালতে বেশি বেশি বেঞ্চ খুলে এবং বিচারক দিয়ে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর বিহিত করুন। শক্তিশালী উকিল দিন। কারণ মামলাবাজদের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের মালিকদের বড় নেতাও আছেন যার ছবি প্রায় প্রতিদিন ছাপা হয়। আশা করি আগামী বাজেটে এই সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী মহোদয় আলোকপাত করবেন।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, ঢাবি