মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ আগস্ট ২০১৭, ৮ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সম্প্রীতির বন্ধনে ফাটল

প্রকাশিত : ১২ মে ২০১৬

মোঃ রফিকুল ইসলাম

ঈর্ষণীয় পারিবারিক সম্প্রীতির বন্ধনে সমৃদ্ধ ছিল বাংলাদেশ। প্রপিতামহ, পিতামহ ও পিতা-মাতার সাংসারিক জীবনে যে সম্প্রীতি ও পারিবারিক বন্ধন অটুট ছিল তা আজকাল অনেকাংশেই অনুপস্থিত। মূল ধারার অতীতের বাংলা চলচ্চিত্র ও সমসাময়িক চলচ্চিত্রগুলোর দিকে খেয়াল করলেও তা দৃশ্যমান হয়। বাঙালী সংস্কৃতির আকর্ষণীয় বড় দিকটি ছিল যৌথ পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে পারিবারিক সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের জন্য যখন আমরা মার্কিন সিরিজ নাটক ‘ফ্যামিলি টাইজ’ দেখতাম, ঠিক সে সময়েই আমাদের সমাজের চালচিত্র হিসেবে ‘এইসব দিনরাত্রি’ ও ‘সকাল-সন্ধ্যা’ নাটকগুলোও দেখতাম, যেখানে পারিবারিক সম্প্রীতি দৃশ্যমান ছিল। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে এগুলো ছিল প্রতিটি পরিবারের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আজকাল সেই একই পর্দায় দেখছি মধুর সম্পর্কের এই পরিবারগুলো আর নেই, সেখানে বিভিন্ন কারণে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার, এমনকি একাকী জীবনযাপন পদ্ধতিও গড়ে উঠছে। অবস্থা এমন যে, পরিবারের সদস্যদের ঠাঁইও আর পরিবারে হচ্ছে না। তাই বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে দেখি বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে, অবিবাহিত সদস্যদের দেখি কর্ম বা পড়াশোনার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বে¡ও হোস্টেল, মেস, হল বা ফ্ল্যাটে আশ্রয় নিতে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাত বা একত্রীকরণ আর হচ্ছে না।

সম্প্রীতির এ বন্ধনে ফাটল সৃষ্টির পেছনে অনেক কারণ দায়ী। মূলগুলো হলো- বাঙালী সমাজে ও পরিবারে সর্বত্রই সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক কমন কিছু মূল্যবোধ ও রীতি-নীতি ছিল, যা আজকে বিশ্বায়ন, শিল্পায়ন ও নগরায়নের কারণে ক্রমহ্রাসমান। কোথাওবা দারিদ্র্যের কারণে বা নিজ দায়িত্ব নিজে নিয়ে বা কর্মসূত্রে দূরে বা প্রবাসে গমনের কারণে, কোথাওবা অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসায় নির্ঝঞ্জাট আয়েশী জীবনের জন্য আলাদা ফ্ল্যাট বা বাসায় উঠে যাওয়ায়। গ্রামে দারিদ্র্য ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পারিবারিক ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধির ফলে পরিবারের সদস্যরা চাকরিসূত্রে দূরে বা শহরে অবস্থান করায়ও এ সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। অনেকাংশে বাবা-মা তাদের বাড়ি-ভিটা আঁকড়ে একাকী পড়ে আছে। কথায় আছে ‘চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয়’, ফলে ধীরে ধীরে সম্প্রীতির যে বন্ধন তা শিথিল হতে থাকে। লক্ষণীয় যে, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য বেড়ে যাওয়ায় ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার প্রেক্ষাপটে এ সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ তাদের অবসরের সময়টুকু এখন আর তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না, সে বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের জালকে বিস্তৃত করছে বিশ্বব্যাপী, ফলে আলোর নিচে অন্ধকারের মতো উপেক্ষিত থাকছে তার পরিবারের বাবা-মাসহ অন্যান্য সদস্যবর্গ। কিন্তু যন্ত্র ব্যবহারেই যে শুধু মানুষ আজ যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। মূল বাস্তবতা, মানুষের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধটি প্রচ-ভাবে কমে যাওয়া এবং এর নেতিবাচক অন্যান্য পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব। যেসব কারণে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষয়িষ্ণু তা হলো- অপসংস্কৃতি, অপরাজনীতি, দুর্নীতি, উচ্চাভিলাষ ও ভোগবাদিতা, প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারের মূল্যবোধের ভিন্নতা, প্রেমজনিত বিয়ে ও পরকীয়া, সন্তানের প্রতি অবহেলা এবং মাদকের প্রসার ইত্যাদি।

পরিবার ও সম্প্রীতিকে অটুট রাখতে গেলে উপরোক্ত সমস্যাগুলো দূর করে, বিশ্বায়নের ভালটাকে নিয়ে আমাদের প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বাঙালী সংস্কৃতির মূল ধারায় ফিরে যেতে হবে।

দুর্গাপুর, নেত্রকোনা থেকে

প্রকাশিত : ১২ মে ২০১৬

১২/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: