মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

দ্বিতীয় দফায় পানামা পেপার্স ফাঁস করল ২ লক্ষাধিক নাম

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৬
দ্বিতীয় দফায় পানামা পেপার্স ফাঁস করল ২ লক্ষাধিক নাম

রহিম শেখ ॥ আবারও পানামা পেপারস বিস্ফোরণ। প্রথম দফায় তথ্য ফাঁসের ক্ষত শুকানোর আগেই এবার প্রকাশ হলো দ্বিতীয় দফায়। নতুন করে ফাঁস হওয়া দুই লাখের বেশি অফশোর এ্যাকাউন্টের মধ্যে বাংলাদেশের অন্তত ৫০ ব্যক্তি ও পাঁচটি কোম্পানির নাম এসেছে। এতে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ ও নীলুফার জাফরউল্যাহ। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যৌথভাবে তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও দুদক। তবে তার আগে তারা এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সরকারী এ তিন সংস্থা তদন্ত অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছে। এর আগে সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১২টায় কর ফাঁকি দিয়ে বেনামে বিপুল সম্পদ পাচারের নেপথ্যে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন অঙ্গনের দুই লাখের বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করে আইসিআইজে নামে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি সংগঠন।

জানা গেছে, সোমবার বিশ্বের ২১টি অঞ্চলের দুই লাখের বেশি অফশোর কোম্পানির তথ্যের একটি ডাটাবেজ প্রকাশ করে দ্য ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)। যাদের নাম এসেছে, তারা আইন ভেঙ্গে সম্পদ গড়েছেন- এমনটা বলছে না আইসিআইজে। তবে অর্থপাচার করতে কিংবা কর ফাঁকি দিতে আইনের ফাঁক-ফোকর খুঁজেছেন অনেকেই। আইসিআইজে বলছে, জনস্বার্থে এ তালিকা প্রকাশ করেছে তারা। এর আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে আইসিআইজে অফশোর ব্যবসায় যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৫ লাখ নথি প্রকাশ করেছিল ‘অফশোর লিকস’ নামে। পানামা পেপার্স ও অফশোর লিকস মিলিয়ে এসেছে অর্ধশতাধিক বাংলাদেশীর নাম, যাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা কাজী জাফরউল্যাহ ও নীলুফার জাফরউল্যাহও রয়েছেন। পানামার ল’ ফার্ম মোস্যাক ফনসেকার বিপুলসংখ্যক নথি গত মাসে ফাঁসের পর বিশ্বজুড়ে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। এতে অনেক রাষ্ট্রনেতারও অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে অর্থপাচারের চিত্র প্রকাশ পায়। যে কোম্পানিগুলোর নাম এসেছে, সেগুলোর মধ্যে দুই লাখ প্রতিষ্ঠান ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কোন না কোন সময় মোস্যাক ফনসেকার গ্রাহক ছিল। বাকি এক লাখের বেশি কোম্পানি ফনসেকার মতোই সেবাদাতা অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক।

আইসিআইজের প্রকাশ করা তথ্যভা-ারে বাংলাদেশীদের তালিকায় যাদের নাম আছে তাদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য জাফরউল্যাহ ও তার স্ত্রী নীলুফার জাফরউল্যাহর নাম। আইসিআইজের প্রকাশ করা বাংলাদেশীদের তালিকায় জাফরউল্যাহ ও নীলুফারের ঠিকানা দেখানো হয়েছেÑ হাউস নং ৪-এ, রোড-৭৩, গুলশান-২, ঢাকা, বাংলাদেশ। জাফরউল্যাহ ও নীলুফারকে ব্রিটিশ ভার্জিনিয়া আইল্যান্ডে নিবন্ধিত পাথফাইন্ডার ফিন্যান্স এবং হ্যানসিটিক লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়। এছাড়াও ৪২টি ঠিকানাও উল্লেখ করা হয়েছে পানামা পেপারসে। নাম রয়েছে সিটিসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহবুব চৌধুরী, আইজিডব্লিউ অপারেটর সেল টেলিকমের কফিল এইচ এস মুয়ীদ, এক্সেসটেলের মালিক জাইন ওমর, কিউবির অংশীদার আফজালুর রহমান, টেকনোমিডিয়ার সরকার জীবন কুমার, বাংলাট্রাকের আমিনুল হক ও তার ছেলে নাজিম আসাদুল হক এবং তারিক একরামুল হকের। সিটিসেলের সাবেক চেয়ারম্যান আজমাত মঈনও এর মধ্যে রয়েছেন। আব্দুল মোনেম গ্রুপের এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম এবং আসমা মোনেমের নামও রয়েছে। নাম রয়েছে দিলীপ কুমার মোদি, মল্লিক সুধীর, কাজী রায়হান জাফর, মোঃ ইউসুফ রায়হান রেজা, মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী, বেনজির আহমেদ, ইসরাক আহমেদের। নোভেরা চৌধুরী, সৈয়দা সামিনা মির্জা, উম্মে রুবানা, বিলকিস ফাতিমা, সালমা হক নামের নারীরা রয়েছে তালিকায়। এছাড়াও ফরহাদ গনি মোহাম্মদ, মোঃ আবুল বাশার, নিজাম এম সেলিম, মোহাম্মদ মোকসেদুল ইসলাম, মোঃ মোতাজ্জারুল ইসলাম, মোঃ সেলিমুজ্জামান, সৈয়দ সেরাজুল হক, এফএম জুবাইদুল হকÑ এই নামগুলো এসেছে। তথ্যভা-ারে রয়েছে ক্যাপ্টেন এমএম জাউল, মোহাম্মদ শহীদ মাসুদ, খাজা শাহাদত উল্লাহ, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ শহীদ মাসুদ, জুলফিকার হায়দার, মির্জা এম ইয়াহিয়া, নজরুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম, এফএম জুবাইদুল হক, এএফএম রহমাতুল বারী, খাজা শাহাদাত উল্লাহÑ এই নামগুলোও। বাংলাদেশ ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জিএম দেবপ্রসাদ দেবনাথ জনকণ্ঠকে বলেন, পানামা পেপারসে যাদের নাম এসেছে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে, দুদক সচিব মোঃ মোস্তফা কামাল জনকণ্ঠকে বলেন, পানামা পেপারস ঘিরে দুদকের এ তদন্ত প্রক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। প্রয়োজন হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এছাড়া তদন্তের স্বার্থে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তদন্ত কর্মকর্তারা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। যেখানেই তথ্যের প্রয়োজন সেখানেই যাবেন। তবে না গিয়েও দুদক তথ্য আনিয়ে নিতে পারে। এর আগেও পানামা পেপারসের সূত্র ধরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১ জনকে তলব করেছিল দুদক। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের লক্ষ্যে গত ৭ এপ্রিল দুদকের উপ-পরিচালক আখতার হামিদ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে দুদক। দলের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক মজিবুর রহমান ও উপ-সহকারী পরিচালক রাফী মোঃ নাজমুস সায়াদাত। এদিকে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, পানামা পেপারসে বাংলাদেশীদের নাম আসায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, পানামার তথ্য বিশ্লেষণ চলছে। তার পর আমরা তদন্তে নামব। প্রয়োজনে যৌথ তদন্তে যাবে এনবিআর।

দুই অফশোর প্রতিষ্ঠান ॥ বাংলাদেশ ডাটাবেজে ৫৬ ব্যক্তির নাম ছাড়াও রয়েছে দুটি অফশোর প্রতিষ্ঠানের নাম। একটি সোয়েন ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। অপরটি সেভেন সি’জ এ্যাসেটস লিমিটেড। দুটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই গুলশান-২ এর একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। আর প্রতিষ্ঠান দুটিতে সংশ্লিষ্ট দু’জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেনÑ স্টেফান পিরকার ও রুখসানা পিরকার।

তালিকায় থাকা বাংলাদেশের ৫টি কোম্পানি ॥ তালিকায় থাকা বাংলাদেশের পাঁচটি কোম্পানি হলোÑ বাংলাদেশ বিমান ইনকর্পোরেশন, ইসলামিক সলিডারিটি শিপিং কোম্পানি বাংলাদেশ ইনকর্পোরেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল এজেন্সিস লিমিটেড, এসার বাংলাদেশ হোল্ডিং প্রাইভেট লিমিডেট ও টেলিকম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড।

টিআইবির বিবৃতি ॥ সম্ভাব্য কর ফাঁকি ও অর্থপাচারে বাংলাদেশীদের সম্পৃক্ততায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ ঘটনাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ‘প্রকট দুর্নীতি-সহায়ক পরিস্থিতির দৃষ্টান্ত’ উল্লেখ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত এবং আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক ও সংস্থাটি। মঙ্গলবার সংস্থাটির আউটরিচ এ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক রিজওয়ান-উল-আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রকাশিত তালিকায় যেসব বাংলাদেশীর নাম উল্লেখ আছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগজনক হারে টাকা পাচারের প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং এ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের উদ্যোগে এসব টাকা ফিরিয়ে আনা এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের বাইরে নামে-বেনামে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা বা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের মূল লক্ষ্য কর ফাঁকি, যার মূল্য জনগণকেই দিতে হয়। সরকারের উচিত এসব কর ফাঁকি ও অর্থপাচার বন্ধ করা।

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৬

১১/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: