২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অটিস্টিকরা বোঝা নয় সম্পদ হতে পারে


আমেরিকায় ১৯৭০ সালে ১৪ হাজারের মধ্যে একটি শিশু অটিস্টিক বলে ধরা পড়েছিল। বর্তমানে প্রতি ৬৮ শিশুর একজন অটিস্টিক। আর ছেলেদের মধ্যে এই সংখ্যা ৪২ জনে একজন। অন্যান্য ধনী দেশেও অটিস্টিকের সংখ্যা যথেষ্ট বেশি লক্ষ্য করা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি ৩৮ শিশুর একজন অটিজমের শিকার। অটিজম হলো বিকাশঘটিত বৈকল্য সেখানে মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যাবলীর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা থাকে অটিজমে আক্রান্তদের সামাজিক যোগাযোগগত দক্ষতা কম ও সীমিত থাকে এবং আচরণ ও আগ্রহের ক্ষেত্রে পৌনপোনিক ধারা পরিলক্ষিত হয়। যেমন একই কাজ বার বার করা। অটিজমের অসংখ্য ধরনের লক্ষ্মণ আছে। সেটা আচ্ছন্নগত আচরণ থেকে শুরু করে শব্দ, আলো ও অন্যান্য ইন্দ্রিয় উদ্দীপক বস্তু বা বিষয়ের প্রতি অতি সংবেদনশীলতা পর্যন্ত অনেক কিছুই হতে পারে। এর পরিণতিগুলোও অতি ব্যাপক ও বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। একদিকে একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানীর অটিজম চোখে ধরা নাও পড়তে পারে। আবার অন্যদিকে এক-চতুর্থাংশ অটিস্টিক শিশু কথা বলে না।

অটিজম এমন এক অবস্থা যে এর সরল সাধারণীকরণ করা যায় না। অগণিত অটিস্টিক মানুষের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। যদিও অটিস্টিক ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক গড় মাত্রার কি তারও বেশি বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী তথাপি স্কুলে বা কর্মক্ষেত্রে তাদের যেরূপ বা যতটুকু যা করার কথা তার চেয়ে ঢের খারাপ করে থাকে। ফ্রান্সে প্রায় ৯০ শতাংশ অটিস্টিক শিশু প্রাইমারী স্কুলে যায়। কিন্তু তাদের মাত্র ১ শতাংশ সেখান থেকে বেরিয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হতে পারে। আমেরিকায় অর্ধেকের কম অটিস্টিক ছাত্রছাত্রী হাইস্কুল অতিক্রম করতে পারে। ব্রিটেনে মাত্র ১২ শতাংশ পূর্ণবয়স্ক অটিস্টিক ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গকালীন কাজে নিয়োজিত থাকে। জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বব্যাপী অটিজমের শিকার ৮০ শতাংশ নারী-পুরুষ শ্রমশক্তিতে নেই।

তবে তার জন্য অটিজমের প্রথমদিকে স্ক্রিনিং করা একান্তই প্রয়োজন। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোন পরীক্ষা নেই। শুধু আচরণ পর্যবেক্ষণের দ্বারা সমস্যাটা নির্ণয় করা যায়। বেশিরভাগ শিশু বাবা-মায়ের আচরণ যেমন তাদের আলিঙ্গন হাসি, খাওয়া-দাওয়া প্রভৃতি দেখে শেখে। অটিস্টিক শিশুদের দৃষ্টি প্রায়শই অচেতন বস্তুর ওপরই নিবন্ধ থাকে কিংবা তাদের খেলনা নিয়ে বার বার একইভাবে খেলতে থাকে। শুরুর দিকে রোগ নির্ণয় করা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা গেলে অটিস্টিক শিশুর মস্তিষ্ক আরও ভালভাবে বিকশিত হতে পারে। সন্তানরা কি করতে পারে এবং কি করতে পারে না এই সংক্রান্ত বিশদ প্রশ্নমালা বাবা-মায়েরা পূরণ করতে পারলে ডাক্তারদের পক্ষে শিশুর দু’বছর বয়সের মধ্যে সচরাচর এই সমস্যার লক্ষ্মণগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে বের করা সম্ভব। স্পিচ থেরাপি ও অন্যান্য নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুকে শেখার বিষয়টির সঙ্গে ধাতস্থ করে তোলা এবং শিক্ষণ ও মিথস্ক্রিয়াকে উৎসাহিত করার কাজটা এমন একটা বয়সে করা যেতে পারে যখন মস্তিষ্ক সবচেয়ে নমনীয় ও পরিবর্তনযোগ্য অবস্থায় থাকে। দুর্ভাগ্যের বিষয় ধনী বিশ্বেই এই রোগ নির্ণয়ের গড় বয়সটা হলো সাড়ে তিন বছর।

দ্বিতীয় লক্ষ্যটা হওয়া উচিত অটিস্টিক শিশুদের এমন স্কুলে ভর্তি করানো যা তাদের জন্য উপযুক্ত। তবে কখন কিভাবে তাদের আসল ক্লাসগুলোয় আনতে হবে সে ব্যাপারে কোন ধরাবাধা নিয়ম নেই। দেখা গেছে যে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশলে এবং বাড়তি সাহায্য-সহযোগিতা পেলে কেউ কেউ ভাল করে। কাউকে কাউকে আলাদাভাবে শেখানোর প্রয়োজন পড়ে। আবার কারোর কারোর উপরের দু’ধরনের জিনিসই দরকার।

বিশেষজ্ঞরা অটিস্টিক শিশুর শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে থাকেন যাতে করে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে তারা উপযুক্ত কাজ খুঁজে নিতে পারে এবং সমাজের জন্য গলগ্রহ না হয়ে দাঁড়ায়। তবে তাদের মধ্যে যাদের মস্তিষ্কের চর্চা অনেক বেশি তাদের প্রবণতাই থাকে দক্ষ বিশ্লেষক হওয়া। এরা তথ্য-উপাত্তের মধ্যে এমন সব প্যাটার্ন ও ভ্রান্তির সন্ধান খুঁজে পেতে পারে যা অটিস্টিক নয় এমন বেশিরভাগ মানুষের চোখে ধরাই পড়ে না। এতে করে সফটওয়্যার ফার্মগুলোর কাছে কর্মচারী হিসেবে এরা বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এমনকি কম প্রতিভাধর অটিস্টিক ব্যক্তিদেরও কিছু কিছু অসাধারণ ক্ষমতা থাকে যার জন্য দরকারী কর্মী হিসেবে তারা বেশ কদর পায়। এরা রুটিনমাফিক কাজ বেশ পছন্দ করে। পরিবর্তন তাদের পছন্দ নয়। সে জন্য কর্মচারী হিসেবে তারা অনুগত হয়। সেসব বেশ সূক্ষ্ম ও নিখুঁত হওয়া প্রয়োজন এবং সেগুলোতে পুনরাবৃত্তি প্রয়োজন যেমন ডাটাবেস আপডেট করা, শেলফ গোছানো, লাইব্রেরি সংগঠিত করা ইত্যাদি সেসব কাজে তারা অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারে। কাজেই অটিস্টিক মানুষ কখনই সমাজের বোঝা নয়। বরং সমাজকে তারা দিতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের চাইতে বেশিই পারে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট