১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘শেখার অভিজ্ঞতাটা কঠিন ছিল’


মাত্র উনিশতম জন্মদিন পালন করেই ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকর। সম্পূর্ণ একা প্রায় সাড়ে ৩ মাসের জন্য! অবশ্য, সেটা ক্রিকেট খেলার জন্যই। ক্রিকেট ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো মর্যাদার ইংলিশ কাউন্টি খেলার সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছিল। ইয়র্কশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব সরাসরি যোগাযোগ করে তরুণ উদীয়মান ভারতীয় ব্যাটসম্যান শচীনের সঙ্গে। দারুণ বিস্মিত হয়েছিলে শচীন। অবশেষে সবধরনের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে খেলতে যান ইংল্যান্ডে! জাতীয় দলের সঙ্গে ততোদিনে বেশ কয়েকটি ট্যুরে গেলেও সেটিই ছিল ক্রিকেট খেলার জন্য শচীনের প্রথম একক বিদেশ ভ্রমণ। ১৯৯২ সালের এপ্রিলে ইংল্যান্ডে কাউন্টি খেলার জন্য গিয়েছিলেন। ইয়র্কশায়ারের পক্ষে শচীন ছিলেন তখন ১২৮ বছরের মধ্যে প্রথম বিদেশী ক্রিকেটার। তাই দারুণ অভিভূত ও উচ্ছ্বসিত ছিলেন তিনি। তবে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর নানাবিধ সমস্যায় পড়েছিলেন। একেতো বয়স কম, তারপর আবার ইংল্যান্ডের আবহাওয়া, পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান কম ছিল। আবার রাস্তা-ঘাটও ভালভাবে চেনা ছিল না। এর সঙ্গে নিজের সবধরনের কাজ, যেমন কাপড় কাচা এবং ইস্ত্রি করা, রান্না করা, গাড়ি চালানো এবং গৃহস্থালী অন্য কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। আর সেই অভিজ্ঞতার কথাই নিজের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’তে বিস্তারিত জানিয়েছেন ‘লিটল মাস্টার’ শচীন।

১৯৯২ মার্চের মাঝামাঝি অস্ট্রেলিয়া সফর ও ওয়ানডে বিশ্বকাপ শেষে দলের সঙ্গে দেশে ফেরেন শচীন। দীর্ঘ সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ব্যস্ততা শেষে কিছুটা বিশ্রাম পেতেই উন্মুখ ছিলেন তিনি। ভারতের পরবর্তী আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছিল বছরের শেষ ভাগে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। আর এর মাঝে বেশ কয়েকটি মাস ছিল একেবারেই ব্যস্ততাহীন। ভাগ্যক্রমে ক্রিকেট থেকে দূরে কিছুদিন ঘরে শুয়ে-বসেই কাটাতে পেরেছেন শচীন। কিন্তু ক্রিকেট তো রক্তে, তাই সেটা ছাড়তে পারেননি। বন্ধুদের সঙ্গে খেলেছেন টেনিস বলের ক্রিকেট! এমনই একদিন বাড়ির নিচে সিঁড়ির কাছে ক্রিকেট খেলছিলেন। সে সময় শচীনের বন্ধু অজিত ঝুল বারান্দা (ব্যালকনি) থেকে শচীনকে ডেকে বলেন, ‘ইয়র্কশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব থেকে ফোন করা হয়েছে এবং তারা চাইছে শচীন যেন তাদের হয়ে ক্রিকেট খেলেন!’ সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু ফেলে ফোন ধরতে ছুটে আসেন শচীন। নিজের মধ্যে অজানা এক আনন্দ এবং উত্তেজনার মিশেলে দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি হচ্ছিল তার। ফোনে সে সময় তিনি চুক্তি নিয়ে কোন কথাই বলেননি। উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করেননি বিস্তারিত কিছুই। কারণ মনে মনে নিজেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন ইংল্যান্ডে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার জন্য। সেজন্য যত ধরনের গৃহস্থালি কাজ করতে হবে সেটার জন্যও ছিলেন এক কথায় রাজি। অথচ যখন নিজ বাড়িতে ছিলেন কোন ধরনের গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে কোন সময় যুক্ত হননি।

ফোনে সেই কথোপকথনের পর অপেক্ষা করছিলেন শচীন এ বিষয়ে ইয়র্কশায়ারের পক্ষ থেকে নিশ্চয়তার। কিছুদিন বাদেই ইয়র্কশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস হ্যাসেল সবধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ভারতে আসেন। মুম্বাইয়ের একটি ছোট শহর থেন। সেখানে ক্রিকেট খেলছিলেন। তখন হ্যাসেল আসেন এবং খেলার ফাঁকে হ্যাসেলের সঙ্গে সব কথা চূড়ান্ত করেন শচীন। মাঠে বসেই চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেন এবং এরপর নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছিল শচীনের। কারণ ১২৮ বছরের মধ্যে তিনিই ছিলেন ইয়র্কশায়ারের পক্ষে তখন প্রথম বিদেশী ক্রিকেটার। এপ্রিলের শেষদিকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান শচীন। সবমিলিয়ে সাড়ে ৩ মাস ইংল্যান্ডে থেকেছেন। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিবেশের একজন হিসেবে সেটা তার জন্য ছিল দারুণ সমস্যা জর্জরিত একটা সময়কাল। তবে ইয়র্কশায়ারের কর্মকর্তারা তাদের সৌজন্যতা, বদান্যতা, শচীনের জন্য দারুণ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তারা। যতদিন ছিলেন সেটা বড় ধরনের শিক্ষা ছিল তার জন্য। তবে সমস্যায় পড়েছেন অনেকভাবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যাটা ছিল রাস্তাঘাট অচেনা এবং তেমন কোন জ্ঞান না থাকা। মাঠে যাওয়ার সময় সতীর্থ রিচার্ড ব্লেকিকেই অনুসরণ করতেন গাড়ি নিয়ে। দ্রুতগতির কিছু রাস্তা ছিল সেসব দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় পেরে উঠতেন না শচীন, হারিয়ে ফেলতেন ব্লেকির গাড়িকে। সেজন্য নিজের ওপরই বিরক্ত হতেন কেন ধীরগতির লেন দিয়ে গাড়ি চালাননি। সে সময় মোবাইল ফোনের ব্যবহার ছিল না, তাই হারিয়ে গেলে পুনরায় সঠিক রাস্তাটা পাওয়া খুব কঠিন ছিল। আর সেটা প্র্যাকটিসে পৌঁছুনোর ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটিয়ে দিত। নিজের ওপর বিরক্তিটা আরও বাড়তো শচীনের। কারণ, কখনও অনুশীলনে পৌঁছুনো দেরি হোক সেটা চাইতেন না তিনি।

১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডের রাস্তায় কিছুদিন গাড়ি চালানোর সুযোগ হয়েছিল অবশ্য শচীনের। লীগ ক্রিকেট খেলার জন্য সে সময় কিছুদিন ছিলেন ইংল্যান্ডে। তবে তখন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার অতুল ওয়াসানের সঙ্গে ছিলেন। অতুল খুব উদার প্রকৃতির ছিলেন এবং শচীনকে নিজের গাড়িটাই চালানোর জন্য দিতেন। সেটার আগেই অবশ্য গাড়ি চালনা শিখেছিলেন শচীন এবং আন্তর্জাতিক লাইসেন্সও পেয়ে গিয়েছিলেন সবগুলো টেস্টে উত্তীর্ণ হয়ে। অতুল বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডে গাড়ি চালানোর আসল উপায় হচ্ছে বেশি বেশি ব্রেক ব্যবহার না করা এবং শুধু লেনগুলোর নির্দেশনা অনুসরণ করা।’ তবু প্রথমদিন গাড়ি চালাতে গিয়ে দারুণ সমস্যার মধ্যে পড়েছিলেন শচীন। প্রথম লেন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, সে সময় গাড়ি থেমে গিয়েছিল হঠাৎ! কোন ধরনের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না এবং গাড়ি স্টার্ট হচ্ছিল না। শচীন যখন সেটা বললেন প্রথমে অতুল ভেবেছিলেন যে ঠাট্টা করছেন তিনি। পরে দেখা গেল আসলে গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেছে! অতুল তখন তাকে ‘বিপদ সঙ্কেত’ জ্বালাতে বলেন। কিন্তু অপরিচিত গাড়িটির সেটা জ্বালিয়ে দেয়ার সুইচটাও খুঁজে পেতে ঘাম ঝরেছে শচীনের। এরপর অবশ্য একটি গাড়ি এসে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিল। ইংল্যান্ডের ভৌগোলিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞানের অভাব ছিল তার। আর সেটা ইয়র্কশায়ারে থাকাকালীন সময়ে বেশ কয়েকবার অযাচিত ঝামেলায় ফেলেছিল শচীনকে। বিভিন্ন সময়ে কাউন্টির বিভিন্ন জায়গায় খেলার জন্য যেতে হতো। যেমন ভারত-পাকিস্তান প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার পরদিনই নিউক্যাসেলে ইংল্যান্ড ও বিশ্ব একাদশের ম্যাচ খেলার সম্মতি দিয়েছিলেন এটা ভেবে যে দূরত্বটা তেমন বেশি নয়। ভেবেছিলেন ২/৩ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়েই যেতে পারবেন। কিন্তু পরে তার সতীর্থরা জানান নিউক্যাসেলে যেতে অন্তত ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালাতে হবে। পরে সারারাত গাড়ি চালিয়ে নিউক্যাসেল যেতে হয়েছিল কথা রক্ষা করার জন্য। ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে সে রাতে গাড়ি চালিয়েছিলেন যতিন পারাঞ্জপে। দু’জনই রাস্তাটা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকায় নির্দেশনা দেখে গাড়ি চালিয়েছেন। এর মাঝেই একবার উত্তরদিকে যাওয়ার পরিবর্তে প্রায় ৩৫ মিনিটের দূরত্ব চলে গিয়েছিলেন দক্ষিণের দিকে। এভাবেই ইয়র্কশায়ারে কেটেছিল শচীনের দিনগুলো।

তথ্যসূত্র: শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’ অবলম্বনে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: