মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

উদ্ভট উটের পিঠে কি চলেছে স্বদেশ?

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৬
  • মুনতাসীর মামুন

(গতকালের পর)

দীপন কি ধর্ম বিদ্বেষী ছিলেন? মোটেই না। ইসলাম নিয়ে যারা ভাল বই লিখেছেন তাদের বইও ছেপেছেন। তার হত্যার প্রধান কারণ, অভিজিতের বই ছেপেছিলেন। অভিজিত কোন বইয়ে ধর্মের নোংরা সমালোচনা করেছেন? কেউ উদাহরণ দিতে পারেনি। কিন্তু, প্রগতির পক্ষে বই ছেপে অভিজিত পরিচিতি পাচ্ছিলেন সেটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সুন্দরভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেনÑ “ধর্মান্ধদের হাতে ব্লগার হত্যা চলছে, নিহত ব্লগারদের সকলেই কি ধর্ম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন অথবা লিখেছিলেন? আর লিখে থাকলেও তার বিচার দেশের আইন অনুযায়ী করবে রাষ্ট্র। পাইকারিভাবে তাদের ধর্মের অবমাননাকারী আখ্যা দিয়ে ধর্মান্ধ ঘাতকদের হাতে তাদের বিচারের ভার ছেড়ে দেয়া কি যায়? কিন্তু দেখা যাচ্ছে নিহত ব্লগারদের ধর্মের অবমাননাকারী আখ্যা দিয়ে তাদের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ততটা কঠোর অবস্থান রাষ্ট্রের নেই। অথচ যে কোন বিশ্বাসের যে কোন ধর্মের নাগরিকদের রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।” [ইত্তেফাক, ১৪-৪-১৬]

রাষ্ট্রের সুরক্ষা দাবি করলে আইজিপি বলেন, ১৬ কোটি মানুষকে পাহারা দেয়া যায় না। পুলিশ ঘরে ঘরে নিরাপত্তা দিতে পারে না। এ বিষয়টি আমরা বুঝি না তা তো নয়। আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি-অভিজ্ঞতা খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কিন্তু যারা টার্গেট হতে পারে, বা যে সব জায়গায় আক্রমণ হতে পারে সে সব ক্ষেত্রে তো প্রিভেনটিভ ব্যবস্থা নেয়া যায়। ঠিক আছে মানলাম তাও সম্ভবপর নয়। এ কারণেই কি ৩৬টি খুনের কোন বিচার হলো না?

আইজিপি বলেছেন : ‘বেশিরভাগ ঘটনায় আসামিরা ধরা পড়েছে।’ কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে দেখা যায়Ñ ‘ব্লগার লেখক, অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টসহ ১২ খুন : ৪ ঘটনায় আসামি ধরা পড়েছে। বিদেশী হত্যা হামলার তিন ঘটনা: পরিকল্পনাকারী গ্রেফতার হয়নি। ভিন্ন মতাদর্শী হামলা ও খুনের ২০ ঘটনা : ১৫ ঘটনায় পরিকল্পনাকারী ঘটনায় ধরা পড়েনি।’ [২৮.৪.২০১৬] মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বললেন, অভিজিতের খুনীরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। অর্থাৎ, পুলিশ তাদের শনাক্ত করতে পেরেছিল। তা হলে তাদের গ্রেফতার কেন করা হলো না? ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের গ্রেফতার সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়েও এসব ঘটনার বিচার সম্পন্ন না হওয়ার কারণ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের গাফিলতি ও সাক্ষী হাজির করার ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক সদস্য জামিন পেয়ে পুনরায় সংগঠিত করছে ঘাতকদের।’

[সমকাল ২৮.৪.২০১৬] এ বিষয়গুলো কি খুনীদের উৎসাহিত করে না নিরুৎসাহিত করে। তবে, এসব বিষয় এড়িয়ে যাওয়া ভাল। সরকারে পুলিশ এমন শক্তিশালী যে, এসব কথা বললে, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে প্রমাণ করতে তাদের দুই মিনিট সময়ও লাগবে না।

আসা যাক হেফাজতীদের কথায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ‘হেফাজতে ইসলামের নেতাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের যখন প্রয়োজন হয় নিবৃত্ত করার, বললেই তারা কথা শোনে।’ [প্রথম আলো, ৫.৫.২০১৪]

পুলিশ সূত্র জানায়, স্মরণকালের সেই ভয়াবহ তা-ব ও সহিংসতার ঘটনায় সারাদেশে মোট ৬৮টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৩টি মামলা হয় রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, রমনা, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, শেরেবাংলা নগর ও কলাবাগান থানায়। ১৫টির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। বর্তমানে সব মামলারই তদন্ত থেমে আছে। এসব মামলার তদন্ত নিয়ে পুলিশেরও আগ্রহ নেই। কোন আসামিকেও ধরছে না পুলিশ।

জানা গেছে, রাজধানীর ৫৩টি মামলার মধ্যে কেবল কলাবাগান ও রমনা থানার তিনটি এবং শেরেবাংলা নগর থানার একটি মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরের ১৫টি মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। এসব মামলায় মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের জড়ানো হয়নি। ওই সময় হেফাজতের মহাসচিবসহ অন্তত ৭৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে প্রায় সবাই জামিনে ছাড়া পান।

ডিএমপি কমিশনারের মুখপাত্র ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মামলাগুলোয় আসামির সংখ্যা অনেক। হেফাজতে ইসলামের সেই ধ্বংসযজ্ঞে লাখ লাখ লোক অংশ নিয়েছিল। তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে নাম-ঠিকানা যাচাই করতে সময় লাগছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, এখন সরকারের ‘কৌশল’ হচ্ছে কিছু মামলার অভিযোগপত্র দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের চাপে রাখা, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে কোন কর্মসূচী দিতে না পারে সংগঠনটি।’ [ঐ]

আসলে আমরা বিষয়গুলো বুঝি না। লাখ লাখ লোককে খুঁজে বের করতে হবে, শনাক্ত করতে হবে, যাচাই করতে হবে। এ তো না করে হেফাজতী নেতা কয়জনের নামেই তো মামলা করলে চলত। শাহরিয়ার কবির লিখেছেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে নতুন আরও ৫০ হাজার অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছিলেনÑ নতুন নিয়োগের সময় জামায়াত-শিবির বা সন্ত্রাসীরা যাতে পুলিশ বাহিনীতে ঢুকতে না পারে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে। এর পরদিনই পুলিশের আইজি বললেন, জামায়াত-শিবিরের কারও বিরুদ্ধে যদি ক্রিমিনাল রেকর্ড না থাকে তাদের পুলিশে নিতে বাধা নেই।’ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। এ হচ্ছে, আমাদের হাতে একটি করে চকোলেট দেয়ার মতো। শিশু ঘ্যান ঘ্যান করলে চকোলেট ধরিয়ে দেয়া হয় না। তেমন আর কি! দেশের মানুষজনকে বোকা ভাবলে প্রশ্ন তো উঠতেই পারে, উদ্ভট উটের পিঠে কি চলেছে স্বদেশ?

তোষামোদের আরেক ফর্ম আছে। সরকারের বলয়ে থেকে হঠাৎ পয়সাওয়ালা নেতারা শফির পা মাথায় রাখেন। কেন? কারণ, মৌল জঙ্গীবাদ তাদের পয়সাকড়ি যুগিয়েছে। মৌলবাদবিরোধী এক সভায় নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবেই মুক্তচিন্তার নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, জঙ্গীবাদের মূল সূত্র ইসলামের তথাকথিত হেফাজতকারী হাটহাজারীর মাওলানা শফিকে সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মী এবং সংসদ সদস্য পা ছুঁয়ে তাকে সালাম করেন কিভাবে? এতেই প্রমাণিত, শর্ষের মধ্যে ভূত আছে। এই ভূতকে অবশ্যই তাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জঙ্গীবাদীদের উত্থানের পেছনে ইন্ধনদাতা, অর্থ যোগানদাতা, ব্যাংকার, শিল্পপতি, ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। [ভোরের কাগজ, ৭.৫.২০১৬]

অমিয় চক্রবর্ত্তীর কবিতার সুরে বলতে হয় তার বদলে কী পেলে? হেফাজত জানিয়েছে তারা তাদের অন্ধকার দিনের ম্যানিফেস্টো ১৩ দফা দাবি থেকে পেছোনি। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি একজন ব্লগারের মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা যখন সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন তখন জনাব শফি বিবৃতি দিয়ে জানালেন, পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুদের লেখা পড়ানো হচ্ছে। হিন্দু লেখকদের লেখা পড়ালে মুসলমানত্ব কীভাবে থাকবে? ১৯৭১ সালের পাক্কা মুজাহিদের স্থান তিনি ত্যাগ করেননি। প্রস্তরযুগের এই মানুষরা নাকি দলবল নিয়ে নৌকায় চড়বেন। তাদের ভারে নৌকা ভেসে থাকবে না ডুববে?

মাদ্রাসা শিক্ষা আছে, থাকুক। সঙ্কোচন না করুন বৃদ্ধির কেন এত উৎসাহ? এর কারণ কী যারা শিক্ষা সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা চান যেন তাদের সন্তানরা প্রতিযোগিতাহীনভাবে রাষ্ট্রে সব উচ্চপদ দখল করুক। সরকারী মাদ্রাসার পেছনে বছরে ব্যয় হাজার কোটি টাকা। সেখানে সরকার অনুমোদিত বই নয়, তাদের অনুমোদিত বই পড়ানো হয়। এসব বইয়ে শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বিষোদ্গার আছে, ইসলামের ইতিহাসের বিকৃতি আছে। সরকারী রিপোর্টে তার উল্লেখ আছে, আমরাও লিখেছি। ‘মাদ্রাসাভাইরা রাগ করবে দেখে সরকার কোন ব্যবস্থায়ই নেয়নি। যেন মাদ্রাসাভাইরা দু’হাত ভরে তাদের ভোট দেবে ও সমর্থন করবে! শিশুকাল থেকে যখন মগজে এই বিষয়গুলো ঢুকিয়ে দেয়া হয় তখন কী তৈরি হয়? তৈরি হয়, একজন মির্জা ফখরুল, রিজভি বা নজরুল ইসলাম বা নিজামী, মুজাহিদ, মীর কাশেম। মুক্তিযুদ্ধের কথা যখন বলা হয় তাদের স্বরে কম্পন ওঠে। আওয়ামী লীগের আট বছরের শাসনে আমরা ব্যর্থ হয়েছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস/ বা ইতিহাস আদ্যপাঠ্য করতে। কিন্তু দেশবিরোধী এমন কিছু নিয়ে যান বা ক্লাস থ্রিতে পাবলিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তাব নিয়ে যান, এখনই তা লুফে নেয়া হবে। আপনাদের মনে হচ্ছে না নিজেই এক অদ্ভুত উটের ওপর বসে আছেন।

আওয়ামী ওলামা লীগের কা-টা তো শুনেছেন। সেই লীগের নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা যাবে না, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করা যাবে না, প্রধান বিচারপতি হিন্দু হতে পারবেন না।’ [ঐ] কথাগুলো মনে হচ্ছে না হাটহাজারীর জনাব শফির মতো।

(চলবে)

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৬

১১/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: