১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

আমাদের জীবনে মসলার অবদান


গাছপালার মূল, চামড়া, পাতা, ফুল ও ফল যাহা খাদ্যদ্রব্যের প্রাকৃতিক সুগন্ধ বাড়িয়ে খাদ্যকে উপাদেয় করে তোলে এবং পাকতন্ত্রকে গৃহীত খাদ্য হজমের জন্য উত্তেজিত করে তাকে মসলা বলে। সাধারণভাবে মসলাকে একটি অতিরিক্ত উপাদান মনে হলেও উপরের সংজ্ঞা হতে মসলার কিছু বাহ্যিক গুরুত্ব বোঝা যায়। পতœতত্ত্ববিদদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ সালেই আদি মানুষ আবিষ্কার করে যে, কিছু কিছু সুগন্ধি গাছ খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়।

ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যায় যে, পর্তুগীজরা ১৬ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত মসলার বাণিজ্যে প্রভাবশালী ছিল। তারপর ১৬৫০ সালের দিকে ব্রিটিশ এবং ডাচরা মসলার বাজার দখল করে নেয়। বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসাবে যখনই মসলার দাম কমার সম্ভাবনা দেখা দেয় তখনই তারা অতিরিক্ত মসলা পুড়ে ফেলত। যাই হোক, পরবর্তীতে মসলার গুরুত্বের জন্য প্রায় সব দেশই মসলার চাষ ও বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ শুরু করে। এহেন প্রতিযোগিতা ও মসলার গুরুত্বের কারণ বোঝা যাবে মসলার কার্যকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করলে।

হলুদ : উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঈঁৎপঁসধ ষড়হমধ নামক উষ্ণম-লীয় উদ্ভিদ হতে হলুদ উৎপন্ন হয় যাতে রয়েছে বিভিন্ন কোরোটিনয়েড ছাড়াও এন্টিঅক্সিডেন্ট। হলুদের এই সারায়নিক পদার্থগুলোর কারণে এটা ক্ষত শুকানো ও বাতের পরম উপশম হিসাবে কাজ করে। এটা মলাশয়, ব্রেস্ট ও ফুসফুসের ক্যান্সার রোধেও সহায়তা করে। হলুদের কারকিউমিন নামক এন্টিঅক্সিডেন্টের জন্য এটা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক পদার্থগুলোকে প্রশমিত করে এবং গলব্লাডার (মধষষ নষধফফবৎ রোগে নরষব এর দ্রবনীয়তা বাড়িয়ে পিত্তে পাথর (মধষষ ংঃড়হব) সৃষ্টিতে বাধা প্রদান করে।

মরিচ : ঝাঁঝালো মসলা হিসাবে পরিচিত মরিচ প্রাচীনকালে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হতো। এতে বিদ্যমান পেপারিন, সেভিসিন, কেপসেইসিনয়েড় রাসায়নিক পদার্থগুলোর পাকতন্ত্র ও পরিবহনতন্ত্রের এন্টিসেপটিক গুণাবলী ছাড়াও ক্ষুধাবৃদ্ধি, পেটব্যথা নিরাময় এবং জীবাণুনাশক গুণ রয়েছে।

জিরা : অত্যধিক ঘ্রাণযুক্ত মসলা হিসেবে পরিচিত জিরাতে বিদ্যমান কিউমিনিক (ঈঁসরহরপ) সাইমিন (পুসবহব), ডাইপেনটিন (ফরঢ়বহঃবহব), লিমোনিন (ষরসড়হবহব) ও পিনেন চরহবহব) নামক রাসায়নিক পদার্থের কারণে জিরা জীবাণুনাশক গুণাবলীসহ গুলবেদনা (পড়ষরপ), অজীর্ণতা, পেটফাঁপা, বদহজম, মাথাব্যথা, মাইগ্রেন, মাংসপেশীর ও গেঁটেবাতের উপশম হিসেবে কাজ করে।

ধনিয়া : ধনিয়ার তেল বা ধনিয়া মানসিক ক্লান্তি ও অস্থিরতা দূর করে মনকে সতেজ রাখতে সহায়তা করে। এর মূল সক্রিয় পদার্থগুলো হচ্ছেÑ বর্নিওল (নড়ৎহবড়ষ), লিনালোল (ষরহধষষড়ষ), সিনিওল (পরহবড়ষব), সাইমিন (পুসবহব), টারপিনিওল (ঃবৎঢ়রহবড়ষ) ইত্যাদি যা বাত এবং মাংসপেশীর ব্যথার উপশম হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ও ধনিয়া পাতার উপকারিতার জন্য এটাা প্রাচীনকাল হতেই পেটফাঁপা, খেঁচুনি, ক্ষুধামন্দার জন্য প্রচলিত ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আদা : জিনজেরল (মরহমবৎড়ষ) ও সোগাওল (ংযড়মধড়ষ) এর উপস্থিতির কারণে আদা এবং আদার রস ঠা-া ও মাথাধরা রোগের উপশম হিসেবে কাজ করে। আদার ঘ্রাণের জন্য মসলা হিসেবে এটা শুধু আমাদের দেশেই নয় বিশ্বব্যাপী উৎকৃষ্ট ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অন্ত্রের পরজীবী দমন করা ছাড়াও আদা পাকস্থলীর যন্ত্রণা ও খাদ্য হজমের জন্য যথেষ্ট সহায়তা করে থাকে। আদাতে বিদ্যমান সেসকুইটারপিনের (ংবংয়ঁরঃবৎঢ়বহবং) এন্টিভাইরাল গুণাবলী রয়েছে।

রসুন : রসুনের ঝাঁঝের জন্য দায়ী উপাদান এলিচিন ব্রনকাইটিস ও সাইনোসাইটিস প্রতিকারের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। এটা অন্ত্রের পরজীবী, ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধেও কাজ করে। আধুুনিক গবেষণায় দেখা যায় যে, রসুন ভাইরাস আক্রান্ত রোগের, নাক, গলা ও বুকের বহু রোগের প্রতিকার করে থাকে। রসুন রক্তের কোলেস্টরল ও শর্করা (নষড়ড়ফ ংঁমধৎ) কমিয়ে মানুষকে সুন্থ থাকতে সহায়তা করে।

দারুচিনি : বয়স্ক লোকের ক্ষেত্রে ইনসুলিন অনির্ভরশীল ডায়বেটিসের বেলায় দারুচিনি (পরহহধসড়হ) ফ্যাট সেল (ভধঃ পবষষ) গুলোকে ইনসুলিনের প্রতি উত্তেজিত (ংঃরসঁষধঃব) করে গ্লুকোজ ভাঙ্গনে সহায়তা করে। এছাড়াও দারুচিনিতে বিদ্যমান সিনামিক এলডিহাইড জীবাণুনাশক হিসাবে কাজ করে।

এলাচি : এলাচির (ঈধৎফধসড়স) সুস্বাদু ঘ্রাণের এবং ঔষধি গুণাবলীর জন্য এটা প্রাচীনকাল হতে প্রশংসিত। এতে বিদ্যমান সিনিওল (পরহবড়ষব) বদহজম, অজীর্ণতা, মলাশয়ের খিঁচুনি, এন্টিসেপটিক হিসাবে এবং পেটফাঁপার পরম উপশম হিসাবে কাজ করে।

লবঙ্গ : লবঙ্গে (ঈষড়াব) ইউজিনল (বঁমবহড়ষ) নামক যে রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে তা এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখে যা জৈব রাসায়নিক ক্রিয়ার জীবদেহে প্রতিনিয়ত উৎপাদিত ক্ষতিকর পদার্থগুলোকে (ভৎবব ৎধফরপধষং) প্রশমিত করে। এটা পেটের ব্যথা ও দাঁতের ব্যথার উপশম হিসাবে কাজ করে।

তেজপাতা : বাহ্যিকভাবে ব্যতিক্রমধর্মী ঘ্রাণের জন্য স্যুপ, পায়েশ ও তরকারিতে ব্যবহার করা হলেও তেজপাতা গ্রহণে শরীরে ইনসুলিন নামক হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত করে এটি ডায়াবেটিসের মহৌষধ হিসাবে কাজ করে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় যে, হলুদ, রসুন, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচি অন্ত্রের ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া ঊ.পড়ষর ০১৫৭ র বংশবিস্তার রোধ করে ঊ.পড়ষর ০১৫৭ এর খাদ্য বিষক্রিয়ার মারাত্মক পরিণতির কারণ হিসেবে আক্রান্ত ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর খাদ্য তালিকায় মসলার অনুপস্থিতি বা অপ্রতুলতা একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। কাজেই মসলায় বিদ্যমান রাসায়নিক পদার্থের উল্লেখিত গুণাবলীর জন্য মসলা আমাদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

ড. মোঃ খোরশেদ আলম

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরিচালক,

খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভার ঢাকা।