২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন সঙ্কট, আন্দোলনের হুমকি


ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন সঙ্কট, আন্দোলনের হুমকি

এম শাহজাহান ॥ নতুন আইন অনুযায়ী সবক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে চান না ব্যবসায়ীরা। বিপরীতে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকে আইনটি কার্যকর করে ভ্যাট আদায় করতে চায় সরকার। এ অবস্থায় ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তাই আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট আইন সংশোধনের ঘোষণা চান তারা। এমনকি আইনটি যাতে কার্যকর না হয় সেলক্ষ্যে রিট করার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। যদিও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে নতুন আইনটি কার্যকরের ব্যাপারে অনড় রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

জানা গেছে, গত ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন পাস হলেও তা চার বছর পর কার্যকর হচ্ছে আগামী ১ জুলাই থেকে। আইনটি কার্যকর করতে এটি আইন মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য পাঠিয়েছে এনবিআর। নতুন আইনে ছোট-বড় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সমান হারে ভ্যাট দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা। নতুন আইনে সব ধরনের ব্যবসা ও সেবার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। থাকছে না প্যাকেজ পদ্ধতি কিংবা ট্র্যাঙ্কেটেড (ট্যারিফ মূল্য) ব্যবস্থাও। যদিও ব্যবসায়ীরা শুরু থেকেই হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট আদায়ের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের তীব্র আপত্তির মুখে দুই বছর আগে সরকার একটি কমিটি গঠন করে দেয়। এনবিআরের সাবেক সদস্য আলী আহমেদকে চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক উর্ধতন সহ-সভাপতি জসীম উদ্দিনকে কো-চেয়ারম্যান করে ওই কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সুপারিশসহ প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। কমিটির সুপারিশে বাংলাদেশের বাস্তবতায় হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট রাখার কথা বলা হয়। সেই সঙ্গে প্যাকেজ প্রথা বহাল রাখার সুপারিশও করা হয়। এফবিসিসিআই ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ভ্যাট আইন সংশোধনের পক্ষে তাদের মত দিয়েছে।

সূত্র মতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও যেসব উৎপাদনকারী বা ব্যবসায়ী উপকরণ রেয়াত নিতে সমর্থ হবেন না তাদের ক্ষেত্রে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট আরোপের দাবি জানানো হয়েছে। আইনটি সংশোধন করে সবক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিলে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি পাঠিয়েছেন এফবিসিসিআয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ। ওই চিঠিতে তিনি বলেন, ৮৫ শতাংশ ব্যবসায়ী উপকরণ রেয়াত নিতে পারবেন না। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই ইস্যুতে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন। একইভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর কাছেও।

এদিকে এফবিসিসিআইয়ের দেয়া সংশোধনী প্রস্তাবে বিশেষ ছাড়ের সুবিধা বহাল রেখে সর্বক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়ার পরিবর্তে বিভিন্ন স্তরে হ্রাসকৃত হারে (বিদ্যমানের চেয়ে কম হার) আদায়ের কথা বলা হয়েছে। সংগঠনটি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা প্রস্তাবনায় বলেছে, ফ্রান্স, জার্মান, যুক্তরাজ্য, ভারত, জাপান, চীনসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে ভ্যাট আদায়ে বিশেষ ছাড়ের নিয়ম চালু আছে। ওই সব দেশে পণ্য ও সেবার যতটুকু মূল্য সংযোজন হয়, তার অংশের ওপর বিভিন্ন স্তরে ভ্যাট আদায় করা হয়। অথচ বাংলাদেশে নতুন ভ্যাট আইনে এসব বিধান রাখা হয়নি। মোট বিক্রি বা প্রকৃত লেনদেনের ওপর একই হারে ভ্যাট আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী। এফবিসিসিআই আরও বলেছে, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নিয়ে সরকার গঠিত যৌথ কমিটি উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ছাড় দিয়ে ভ্যাট আদায় ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছিল। আইনটি চূড়ান্ত করা হলেও যৌথ কমিটির ওই সুপারিশ উপেক্ষিত রয়েছে, যা মোটেই সমীচীন হয়নি।

এদিকে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবসম্মত নয়। এটি কার্যকর হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হবে। কমবে ভ্যাট আদায়। যেসব সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো গ্রহণ করা হলে আদায় সহজ হবে। বাড়বে ভ্যাটের আওতা। তৈরি হবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ।

এফবিসিসিআইয়ের আরও প্রস্তাব ॥ নতুন আইনে যে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ৩০ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এফবিসিসিআইর সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে লেনদেনের সীমা আরও ছাড় দিয়ে বার্ষিক ৩৬ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত ভ্যাটমুক্ত রাখতে বলা হয়েছে। এর বেশি লেনদেন হলে ৩ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। নতুন আইনে ছোট ব্যবসায়ীদের ২ শতাংশ ও ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের নিয়ম বাতিল করা হয়েছে। প্রস্তাবে বার্ষিক লেনদেনের ভিত্তিতে ছোট ব্যবসায়ীদের ২ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের কথা বলা হয়েছে। এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাবে প্যাকেজ ভ্যাটের বিদ্যমান বিধান বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে সব বিভাগীয় শহর জেলায় ভ্যাট দেয়ার পরিমাণ বাড়াতে বলেছে। প্যাকেজ ভ্যাটের পরিমাণ হবে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার এবং সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা।

সবক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ ॥ আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে সবক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, ঘোষণা অনুযায়ী নতুন ভ্যাট আইন জুলাই থেকে কার্যকর হবে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের ইচ্ছা ভিন্ন কাঠামোর ভ্যাট বাস্তবায়ন। তবে আমার নিজের ইচ্ছা হচ্ছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকর রাখার। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে এক স্তর ভ্যাট রেট কার্যকর আছে। আমাদের দেশেও সে রকম ভ্যাটের হার হবে। তবে এ বছর আমরা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কার্যকর করব। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আরও বলেন, আমরা আসলে হিসাব রাখতে পছন্দ করি না। আপনি নিজের হিসাব ঠিকমতো রাখলে ভ্যাট নিয়ে কোন চিন্তার কারণ নেই। হিসাব রাখলে নিজের ও দেশের উভয়ের লাভ। আপনারা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট মেনে নেন।

প্যাকেজ ভ্যাট ॥ নতুন ভ্যাট আইনে প্যাকেজ ভ্যাটের বিধান রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের পক্ষে উপকরণ ক্রয় এবং ওই উপকরণ দিয়ে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির হিসাব রাখা সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে ফিক্সড ভ্যাট বা প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখতে হবে। তা না হলে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে না। প্যাকেজ ভ্যাট বহাল ও আইন সংশোধনের জন্য ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে পুরান ঢাকা ভিত্তিক ‘ঢাকা দক্ষিণ ব্যবসায়ী ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন করেছে। শীঘ্রই এ সংগঠনটির পক্ষ থেকে ভ্যাট ইস্যুতে বিভিন্ন কর্মসূচী ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ও মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ হাফেজ মোঃ এনায়েতুল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীদের বিক্রির ওপর কোন ভ্যাট হয় না। কারণ তারাও আরেকজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করছেন। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কোন ভোক্তা নেই। তাই আইনটি সংশোধন করে প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখতে হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: