২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সঞ্চয়ের সুদ পাঁচ বছরে অর্ধেকে নেমেছে


সঞ্চয়ের সুদ পাঁচ বছরে অর্ধেকে নেমেছে

রহিম শেখ ॥ ২০১০ সালে সরকারী চাকরি জীবন থেকে অবসরে যান রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। দীর্ঘ কর্মজীবনে পেনশন পান ২০ লাখ টাকা। তারপর ১২ শতাংশ সুদে সেই টাকা রাখেন বেসরকারী একটি ব্যাংকের মিরপুর শাখায়। তিন মাস মেয়াদী আমানত হিসাবের সুদ থেকে কর বাদ দেয়ার পর প্রথম দুই বছর মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা করে পেতেন তিনি। কিন্তু এখন তার একমাত্র সঞ্চয় থেকে পান মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা। আমানতের সুদহার কমতে কমতে ৫ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। ব্যাংকের টাকায় তার সংসার এখন চলছে না। অবসরপ্রাপ্ত সরকারী এ কর্মকর্তার মতো কোটি কোটি টাকা আমানতকারীর ব্যাংকে রাখা সঞ্চয়ের সুদ গত পাঁচ বছরে অর্ধেকে নেমেছে। ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে যাদের সংসার চলে, তারা আছেন নিদারুণ কষ্টে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, মার্চে ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদহার নেমেছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশে, যা ওই মাসের গড় মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে মার্চ মাস শেষে দেশে এক বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। ফলে প্রকৃত সুদহার ‘মাইনাস’ হয়ে গেছে।

সাধারণ মানুষ সঞ্চয় করেন ভবিষ্যত নিরাপত্তার আশায়। কেউ সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য রাখেন। তেমনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা আমান উদ্দিন। স্বল্পমেয়াদী এফডিআর করেছিলেন ব্যাংকে রাজধানীর মতিঝিলের একটি সরকারী ব্যাংকে। যখন করেছিলেন, তখন সুদহার ছিল ১০ শতাংশের বেশি। সম্প্রতি সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য এফডিআর ভাঙিয়েছেন তিনি। নতুন করে কিছু টাকা এফডিআর করতে গিয়ে দেখেন, ব্যাংকগুলো ৫ শতাংশের বেশি দিতে চাইছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, দেশে মোট ৫৬টি ব্যাংকে আমানত হিসাব রয়েছে প্রায় আট কোটি। ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ প্রায় আট লাখ কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি মেয়াদী আমানত। সঞ্চয়ী আমানত রয়েছে ২০ শতাংশের মতো। মোট আমানতের মধ্যে বেসরকারী খাতের অংশ ৮৩ শতাংশ। বাকিটা সরকার ও সরকারী প্রতিষ্ঠানের। আমানতের সুদহার কমে যাওয়াই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের ওপর প্রভাব পড়েছে। সরকারী অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের বড় অঙ্কের আমানত রয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বিশেষায়িত গ্রামীণ ব্যাংকও সঞ্চয়ী হিসাবের মুনাফা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে গ্রামীণ সঞ্চয়কারীরাও বিপাকে পড়েছেন। কেননা গ্রামে এমনিতেই সঞ্চয়ের নিরাপদ মাধ্যম কম। গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেসরকারী ব্যাংকের সংখ্যা অনেক কম। বেসরকারী ব্যাংকগুলোর যেসব গ্রামীণ শাখা রয়েছে, সেগুলো থানা সদর পর্যায়ে। থানা সদরের বাইরে ডাকঘর সঞ্চয়েরও সুবিধা নেই। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতে এখন বড় অঙ্কের ঋণযোগ্য তহবিল অলস পড়ে আছে। সর্বশেষ তথ্য মতে, ব্যাংক খাতে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। অর্থনীতির চাহিদা ও জোগানের নিয়মে আমানত ও ঋণের সুদহার কমারই কথা। তবে ঋণের সুদহার কমলেও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কিছুতেই বাড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শিল্পের মেয়াদী ঋণ কমেছে ৩ শতাংশ। এদিকে চড়া সুদে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া আমানত বিনিয়োগ করতে না পারায় টাকা অলস রেখে দিয়ে এর বিপরীতে সঞ্চয়কারীকে মুনাফা দিতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ব্যয় কমাতে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে এখন আমানতের সুদ কমিয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর আবু হেনা মোঃ রাজী হাসান জনকণ্ঠকে বলেন, শুধু লাভের জন্য নয়, অনেকে নিরাপত্তার জন্যও ব্যাংকে টাকা রাখেন। বিশ্বের অনেক দেশে আমানতের সুদহার নেগেটিভ। মূল্যস্ফীতি আমানতের সুদহারের তুলনায় বেশি হলে মূল্যস্ফীতিও কমে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আমানতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের বৈঠকে নতুন করে সঞ্চয়ী হিসাব খোলা নিরুৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আলোকে ওই সময়ে ব্যাংক থেকে শাখাগুলোতে এ বিষয়ে চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, আমানতের নতুন হিসাব খোলা সাময়িকভাবে নিরুৎসাহিত করতে। এই চিঠি পাওয়ার পর প্রায় সব শাখাই বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সঞ্চয়ী হিসাব ৭ বছরে দ্বিগুণ বাড়ার প্রকল্পটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের ১০ বছর মেয়াদী সঞ্চয়ী হিসাবের মেয়াদ কমিয়ে করা হয়েছে ৫ বছর। আগে একজন সদস্য এই হিসাব একসঙ্গে ৩/৪টি খুলতে পারতেন। এখন ১টির বেশি খুলতে দেয়া হয় না। সদস্যদের বাইরে এই হিসাব অন্য গ্রাহকদের খুলতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে গ্রামের সঞ্চয়কারীরা গ্রামীণ ব্যাংকে চাহিদা সঞ্চয়ী টাকা রাখতে পারছেন না। সম্প্রতি দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সরকারী খাতের সোনালী ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের মুনাফা কমানো হয়েছে। জনতা ব্যাংকেও আমানতের বিভিন্ন হিসাবে মুনাফার হার এক থেকে দেড় শতাংশ কমিয়েছে। অগ্রণী ব্যাংকও আগের আকর্ষণীয় মুনাফার সঞ্চয়ী প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তারা কম সুদের আমানত নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের ডাবল বেনিফিটসহ অন্যান্য সঞ্চয়ী প্রকল্পগুলোর আওতায় এখন হিসাব খোলা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যমতে, ব্যাংক খাতে গত মার্চে আমানতের গড় সুদহার ৫ দশমিক ৯২ শতাংশে নেমেছে, যা ওই মাসের গড় মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। মূলত গত এক বছর ধরে প্রতি মাসেই এ হার কমছে। আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। জানুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। বেশির ভাগ ব্যাংকে তিন মাস থেকে শুরু করে দুই বছর মেয়াদী এফডিআরের সুদহার ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। কোন কোন ব্যাংক ৩ শতাংশ সুদেও মেয়াদী আমানত নিচ্ছে। সঞ্চয়ী হিসাবে সুদহার আরও কম। একজন গ্রাহক তার জমা রাখা টাকার ওপর ৬ দশমিক ১৫ শতাংশের বেশি যতটুকু সুদ পাবেন, সেটাই এ ক্ষেত্রে তার প্রকৃত আয়। আমানতের সুদের ওপর করও কাটা হয়। সুদের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর রয়েছে। টিআইএন না থাকলে এ হার ১৫ শতাংশ। এ বিবেচনায় অনেকের প্রকৃত সুদহার মাইনাস বা ঋণাত্মক হয়ে গেছে। আমানতের পাশাপাশি ঋণের সুদহারও কমছে। তবে ঋণ ও আমানতের সুদহারের পার্থক্যও অনেক বেশি। গত মার্চে ঋণের গড় সুদহার দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ। আমানতের সঙ্গে পার্থক্য (স্প্রেড) প্রায় ৫ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বিবেচনায় বাংলাদেশে স্প্রেড অনেক বেশি। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘসময় ধরে বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কমে গেছে। অথচ ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করে বাড়তি মুনাফা লাভের আশায় সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে চড়া সুদে আমানত নিয়েছে। কিন্তু ওইসব আমানত নিয়ে এখন আর বিনিয়োগ করতে পারছে না। ফলে সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে নেয়া আমানতের বিপরীতে সুদ দিতে হচ্ছে। কিন্তু ওই টাকা বিনিয়োগ করতে না পেরে কোন মুনাফা ঘরে তুলতে পারছে না। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে গেছে। এখন লোকসান ঠেকাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অচিরেই যদি বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তাহলে আমানতের সুদের হার আরও কমে যাবে। তখন সঞ্চয়কারীরা ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে ব্যাংক আবার টাকা শূন্য হয়ে পড়ে। এটি অর্থনীতির জন্য মোটেও ভাল লক্ষণ নয়। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারী মেঘনা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী নূরুল আমিন মনে করেন, আমানতের সুদহার কমতে কমতে এমন জায়গায় নেমেছে যে এ নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কারণ বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের তুলনায় আমানতকারীর সংখ্যাও কম নয়। লাখ লাখ অবসরভোগী, বয়স্ক মানুষ, গৃহবধূ, বিধবা, রেমিটেন্স গ্রাহক ব্যাংকে টাকা রেখে সংসার চালান। তাদের সুরক্ষার বিষয়টি ভাবতে হবে। এ ছাড়া ঋণের সুদহার কমলেই ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ বাড়বে, এমন কথা নেই। ব্যবসার জন্য পরিবহনসহ নানা খরচ রয়েছে। ওই সব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় কমিয়ে আনা যেতে পারে।